ফেসবুকের ব্যক্তিগত প্রোফাইলটির নাম ‘AB Sajjad Ador’। ২০১৪ সালে খোলা প্রোফাইলটিতে কোনো ছবি নেই। নিজেকে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের গুপ্ত সদস্য বলে পরিচয় দেওয়া প্রোফাইলটি থেকে গত কয়েকদিনে অন্তত ছয়টি ফটোকার্ড প্রচার করা হয়েছে, যেগুলোর পাঁচটিতে স্টার নিউজের লোগো এবং একটিতে ফেস দ্য পিপল এর নাম উল্লেখ রয়েছে। এসব ফটোকার্ডে তার নিজের বক্তব্য রয়েছে। এগুলোতে বিভিন্ন রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও ধর্মীয় বিষয়ে ব্যক্তিটির নিজস্ব মতামত তুলে ধরা হয়েছে। রিউমর স্ক্যানার যাচাই করে দেখেছে, স্টার নিউজ বা ফেস দ্য পিপল এসব ফটোকার্ড প্রকাশ করেনি। মূলত, ওপেন এআই এর টুল ব্যবহার করে এসব ভুয়া ফটোকার্ড বানানো হয়েছে।

গত ০৮ জুন প্রোফাইলটি থেকে স্টার নিউজের একটি ফটোকার্ডের আদলে তৈরি একটি ছবি প্রচার করা হয়। সেখানে সাজ্জাদ আদরের বক্তব্য হিসেবে লেখা হয়, “কট্টর বিএনপিপন্থী যারা ইসলামি ব্যাংক বিএনপির দখলের পক্ষে ফেসবুকে এক্টিভিজম করতেছে তারাও গণহারে ইসলামি ব্যাংক থেকে টাকা উত্তোলন করে ফেলতেছে। টাকার মায়া কোনো দল মানে না! এখন দেখার পালা বিএনপি সরকার এই ঠেলা কিভাবে সামাল দেয়!”

এর চার দিন পর, ১২ জুন স্টার নিউজের লোগো ব্যবহার করে তৈরি আরেকটি ফটোকার্ডে প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে নিয়ে মন্তব্য প্রচার করা হয়। সেখানে লেখা হয়, “তারেককে এক সময় খেয়েছিল খাম্বা মামুন, এখন খাবে শিলং সালাহউদ্দিন। তারেকের উচিত নিজের ব্রেইন দিয়ে প্রধানমন্ত্রীত্ব করা, নয়তো এবার সাদা কাগজে নয়, মুচলেকা দিতে হতে পারে স্টাম্পে।”

পরদিন ১৩ জুন একই নকশার আরেকটি ফটোকার্ডে ধর্মীয় বিষয়ক একটি বক্তব্য প্রচার করা হয়। ওই ফটোকার্ডে লেখা হয়, “ইস্রাফিলের শিঙ্গায় ফুঁ দেয়া পর্যন্ত নবী রাসূল ব্যতীত যে কোনো আদম সন্তান যে কোনো ভুল ও গুণাহতে লিপ্ত হইতে পারে-এই আক্বীদাই হইলো সঠিক আক্বীদা।”

১৪ জুন প্রোফাইলটি থেকে ফেস দ্য পিপল-এর নামে তৈরি একটি ফটোকার্ড প্রচার করা হয়। সেখানে বিএনপি সরকারের অধীন পুলিশ প্রশাসন নিয়ে মন্তব্য করে লেখা হয়, “বিএনপি সরকারের পুলিশ সুপারদেরকে লীগের মনিরুল হারুনদের থেকে ৬ মাসের ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করা জরুরী। বিএনপির পুলিশ স্ক্রিপ্ট বানাতে একেবারেই অপরিপক্ক। মিডিয়া ফেইস করতে গেলে এরা মুখ দিয়ে পায়খানা করার অবস্থা হয়ে যাচ্ছে।”

পরদিন ১৫ জুন স্টার নিউজের নামে প্রচারিত আরেকটি ফটোকার্ডে সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদকে ঘিরে আলোচিত একটি দাবির প্রসঙ্গ টেনে লেখা হয়, “গত বছর এপ্রিলে বেনজির-হাসিনাসহ ১২ জনের বিরুদ্ধে ইন্টারপোলে রেড নোটিশ জারি করেছিল প্রফেসর ইউনুস নেতৃত্বাধীন সরকার। যার ফলাফল আজকে দুবাইতে সাবেক আইজি বেনজির এরেস্ট। আর এদিকে একদিন আগে কক্সবাজার যাইয়া বেনজির এর হোটেলে রাত্রিযাপন করা তারেক সালাহউদ্দিন ক্রেডিট নিতে আসছে বেনজিরকে বিএনপি সরকারের সহযোগিতায় এরেস্ট করা হয়েছে। সালাহউদ্দিন কি দেশের সব মানুষকে আচুদা মনে করে নাকি!”

সর্বশেষ ১৮ জুন স্টার নিউজের আরেকটি ফটোকার্ডে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও চাকসু-সংশ্লিষ্ট একটি বিষয় নিয়ে বক্তব্য প্রচার করা হয়। সেখানে লেখা হয়, “ডাকসু জিএস ফরহাদ নিজেই চাকসু নেত্রী সানজিদাকে বিয়ে করার আগে ঢাবির উত্তরবঙ্গের এক মেয়েকে পছন্দ করতো। সম্ভবত প্রেমও করতো। সেই ফরহাদ এখন আসছে প্রেম করার অভিযোগ দিয়ে জিসানকে বহিষ্কার করতে! পদ পাইলে সব চুদনার ভাব বাইড়া যায়।”

রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে দেখা যায়, উল্লিখিত ছয়টি ফটোকার্ডের পাঁচটিতে স্টার নিউজের লোগো এবং একটিতে ফেস দ্য পিপলের নাম ব্যবহার করা হলেও সংশ্লিষ্ট গণমাধ্যমগুলোর ওয়েবসাইট, ফেসবুক পেজ কিংবা অন্য কোনো অফিসিয়াল প্ল্যাটফর্মে এসব ফটোকার্ডের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। বরং একই ব্যক্তির ব্যক্তিগত মতামত ও রাজনৈতিক মন্তব্য ধারাবাহিকভাবে সংবাদমাধ্যমের ব্র্যান্ড পরিচয় ব্যবহার করে প্রচার করা হয়েছে। ফলে এসব বক্তব্যকে সাধারণ ব্যবহারকারীদের কাছে সংশ্লিষ্ট সংবাদমাধ্যমের প্রকাশিত কনটেন্ট বলে মনে হওয়ার সুযোগ তৈরি করে দিয়েছে।
স্টার নিউজের পক্ষ থেকে এক ফেসবুক পোস্টে জানানো হয়েছে, তাদের লোগো ব্যবহার করে এই ভুয়া কার্ড বানানো হচ্ছে।
তাছাড়া, ফটোকার্ডগুলোর নকশা, লেখার বিন্যাস, ফন্টের অসামঞ্জস্য এবং কৃত্রিম গ্রাফিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণে প্রতীয়মান হয় যে এগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক ডিজাইন টুল ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। ওপেন এআই টুলসের মাধ্যমেও ছবিগুলো যাচাই করে দেখা যায়, এগুলো এআই দিয়ে তৈরি এবং এগুলোতে ওপেন এআই থেকে জেনারেট হওয়া সিন্থআইডির ওয়াটারমার্কেরও অস্তিত্ব রয়েছে।
অর্থাৎ, স্টার নিউজ বা ফেস দ্য পিপল এসব ফটোকার্ড প্রকাশ করেনি; সংবাদমাধ্যমগুলোর পরিচয় ব্যবহার করে তৈরি ভুয়া ফটোকার্ড হিসেবে এগুলো সামাজিক মাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে।


