মাটি কাটার ঘটনায় সমালোচনার মধ্যে পদ্মা সেতুর ক্ষতির দাবিতে এআই কনটেন্টের ছড়াছড়ি

নারায়ণগঞ্জের আলীগঞ্জে পদ্মা রেল ভায়াডাক্টের পিলারের নিচ থেকে মাটি কাটার ভিডিও ভাইরাল হয়ে সমালোচনা তৈরি করেছে। তবে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জলাশয়ের মধ্যে নির্মাণকাজের জন্য অস্থায়ীভাবে ফেলা মাটি চুক্তি অনুযায়ী অপসারণ করা হচ্ছিল। এ ঘটনায় পদ্মা সেতুর কোনো ক্ষতি হয়নি। এদিকে মাটি কাটা, পিলারে ফাটল বা পিলার বাঁকা হওয়ার দাবিতে ছড়ানো অন্তত সাতটি ছবি যাচাই করে রিউমর স্ক্যানার দেখেছে, সেগুলো এআই দিয়ে তৈরি।
কী ঘটেছে আসলে?
ঘটনার শুরু গত সপ্তাহে। ১৩ জুন নারায়ণগঞ্জ ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘Newsnarayanganj Digital’ এর ফেসবুক পেজে প্রচারিত একটি ভিডিও ভাইরাল হয়। গণমাধ্যমটি জানায়, নারায়ণগঞ্জের উপর দিয়ে যাওয়া পদ্মা সেতুর রেললাইনের পিলারে মাটি কেটে নেওয়া হচ্ছে। প্রথম আলোর এক প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, মাটি কাটার ফলে সেতুর তিনটি পিলারের নিচে ও আশপাশে ৮ থেকে ১০ ফুট গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। এক সপ্তাহ ধরে দিনে-রাতে মাটি কেটে ড্রাম ট্রাকে করে আশপাশের ইটভাটায় মাটি সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। মাটি কাটার খবর পেয়ে ফতুল্লার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মোহাম্মদ আসাদুজ্জামান নূর ঘটনাস্থলে গিয়ে কাজ বন্ধ করে দেন। এই ঘটনার পর বাংলাদেশ রেলওয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, মাটিকাটার স্থানটি রেলওয়ের অধিগ্রহণ করা জমি। ঠিকাদার প্রকল্পের আওতায় ভায়াডাক্ট নির্মাণের সময় একটি অস্থায়ী রাস্তা নির্মাণ করেছিলেন। ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী, প্রকল্পের কাজ শেষে পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় স্থানটিকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে হবে। প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ায় ভরাট করা সেই মাটি অপসারণ করে স্থানটি আগের অবস্থায় ফিরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে। বিষয়টি পদ্মা রেলসেতু সংযোগ প্রকল্পের পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ‘কনস্ট্রাকশন সুপারভিশন কনসালট্যান্ট বাংলাদেশ আর্মির’ মাধ্যমে তদারকি করা হচ্ছিল এবং নারায়ণগঞ্জের জেলা প্রশাসককে এ বিষয়ে জানানো হয়েছে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, মাটি অপসারণের কারণে রেল সংযোগ প্রকল্পের আওতায় নির্মিত অবকাঠামোর কোনো ক্ষতি হয়নি বা হবে না। সার্বিক বিষয় বিবেচনা করে ওই স্থান থেকে মাটি অপসারণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ওই স্থানে সরকারের কর্মপরিকল্পনা অনুযায়ী বৃক্ষরোপণের জন্য সংরক্ষণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এআই কনটেন্টে সয়লাব সামাজিক মাধ্যম
পদ্মা সেতুর আলোচিত এই ঘটনাটি সমালোচনামুখর হয়ে ওঠার পর এক্সকাভেটর দিয়ে মাটা কাটা হচ্ছে এমন দাবিতে অন্তত তিনটি ছবি (ফেসবুকে ১, ২, ৩, টিকটকে) ছড়িয়েছে। ছবিগুলোতে দেখা যাচ্ছে, মাটি কাটার ফলে সেতুর পাশেই গভীর গর্ত তৈরি হয়েছে। কাজী মামুন নামে একজন এক্টিভিস্ট এ সংক্রান্ত একটি ছবি পোস্ট করে কমেন্টে দাবি করেছেন, ছবিটি জাতীয় দৈনিক সমকালও পোস্ট করেছিল। পরে সরিয়ে নিয়েছে। তবে অনুসন্ধানে সমকালে এমন ছবির পোস্ট প্রকাশের কোনো ফুটপ্রিন্ট মেলেনি৷ তবে পত্রিকাটি মাটি কাটার একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করেছে, যেখানে যুক্ত ছবিতে সেতুর পাশে এত গভীর গর্ত দেখা যায়নি। মামুন মূলত এই ছবিটির বিষয়ে কমেন্টে আলোচনা করেছেন।
রিউমর স্ক্যানার যাচাই করে দেখেছে, এগুলো এআই নির্মিত ছবি। চ্যাটজিপিটির মূল প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই-এর নিজস্ব এআই ডিটেকশন টুল ব্যবহার করে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। ওপেনএআই তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি ছবিতে বিশেষ কিছু সিগন্যাল যুক্ত করে দেয়। পরবর্তীতে এই সিগন্যালগুলো বিশ্লেষণের মাধ্যমেই তাদের নিজস্ব শনাক্তকারী টুলটি এআই-জেনারেটেড ছবি চিহ্নিত করতে পারে।

অনুসন্ধানে ছবিগুলোর নির্মাতা হিসেবে ‘Tarik Mc 0.1’ নামের একটি ফেসবুক পেজকে চিহ্নিত করেছে রিউমর স্ক্যানার৷ এই পেজে তিনটি ছবি (এখানে, এখানে, এখানে) ‘AI Info’ ট্যাগ যুক্ত রেখে পোস্ট করা হয়। পেজটিতে নিয়মিতই এমন এআই কনটেন্ট প্রকাশ করা হচ্ছে।
“হাজারো বাধা উপেক্ষা করে অনবরত মাটি কেটেই চলেছে পদ্মা সেতুর নিচে” ক্যাপশনে প্রচার হওয়া আরেকটি ছবিতে দেখা যাচ্ছে, পদ্মা সেতুর নদীর ওপরের কাঠামোর নিচে এক্সকাভেটর দিয়ে মাটি তোলা হচ্ছে পানির নিচ থেকে। যাচাইয়ে দেখা যাচ্ছে, এই ছবিও এআই নির্মিত, যা তৈরি করা হয়েছে ক্লিং এআই (Kling AI) নামের একটি আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পন্ন টুল দিয়ে। তাছাড়া, ছবিতে পদ্মা সেতুর যে অংশ দেখানো হয়েছে সেখানে মাটি উত্তোলনের কোনো ঘটনা ঘটেনি।

অনলাইনে ছড়ানো (ফেসবুক, টিকটক) একটি ছবিতে দেখা যায়, পদ্মা সেতুর একটি পিলারের ভেতরের লোহার কাঠামো বেরিয়ে এসেছে। দাবি করা হচ্ছে, পদ্মা সেতুর নিচের মাটিতে হালকা ফাটল দেখা দিয়েছে। এই ছবিটি ব্যবহার করে একাত্তর টিভির আদলে তৈরি ‘পদ্মা সেতু সেটা কারো ব্যক্তিগত সম্পদ নয়, এটা জাতীয় সম্পদা’ শিরোনামে একটি ফটোকার্ডও প্রচার হচ্ছে।

তবে অনুসন্ধানে গণমাধ্যমটির সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের প্ল্যাটফর্মগুলোয় এমন কোনো ফটোকার্ড পাওয়া যায়নি।
আরেকটি ছবি প্রচার করে (টিকটক) দাবি করা হচ্ছে, সেতুর পিলারের পাশ থেকে মাটি সরানোর ফলে পিলার বাঁকা হয়ে গেছে। রিউমর স্ক্যানার যাচাই করে দেখেছে, এই দুইটি ছবিই এআই প্রযুক্তির সহায়তায় তৈরি ছবি৷ তাছাড়া, একাধিক গণমাধ্যমের (ডিবিসি নিউজ, News বাংলা) এ সংক্রান্ত সরেজমিন ভিডিও প্রতিবেদনে সেতুর ক্ষতি হওয়ার কোনো দৃশ্য লক্ষ্য করা যায়নি।

অনলাইনে ব্যাপকভাবে প্রচার হওয়া আরেকটি ছবিতে দেখা যায়, সেতুর পিলারের নিচের অংশে মাটি ও কংক্রিট ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে। সামনে কয়েকজন সাংবাদিক ও ক্যামেরাপার্সন দাঁড়িয়ে ঘটনাস্থল পর্যবেক্ষণ করছেন। ছবির ওপর লাল অক্ষরে “পদ্মা বহুমুখী সেতু- পিলারের ক্ষতি” লেখা যুক্ত করা হয়েছে। পোস্টের ক্যাপশনে দাবি করা হয়েছে, “ঝুঁকিপূর্ণ পদ্মা সেতু দক্ষিণ অঞ্চলের মানুষের জন্য কী অপেক্ষা করছে…”
আরেকটি ছবিতে (ফেসবুক, টিকটক) একই সেতুর পিলারের পাশে একটি এক্সকাভেটর দিয়ে মাটি কাটার দৃশ্য দেখা যায়। সেখানে কয়েকজন শ্রমিক ও সাংবাদিক উপস্থিত রয়েছেন। ক্যাপশনে বলা হচ্ছে, সাংবাদিকেরা ছবি তুলতে গেলে তাদের তাড়িয়ে দেওয়ার দৃশ্য এটি।

যাচাইয়ে দেখা যাচ্ছে, এই দুই ছবিও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার টুল ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে।

