দুর্নীতির অভিযোগে দেশ ছেড়ে যাওয়া সাবেক পুলিশ মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদের নাম আবারও আলোচনায় আসে গত ১৪ জুন। সেদিন খবর ছড়িয়ে পড়ে, ইন্টারপোলের সহযোগিতায় সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে তাকে গ্রেপ্তার করেছে দেশটির পুলিশ। তবে গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে শুরু হয় বিভ্রান্তির নতুন অধ্যায়। কেউ বলছিলেন, গ্রেপ্তারের খবরই মিথ্যা। কেউ দাবি করছিলেন, আটক হওয়া ব্যক্তি আসলে বেনজীর নন। আবার কেউ বলছিলেন, তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়েও দেওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে তার গ্রেপ্তারের দাবিতে তৈরি একাধিক ছবিও।
বাংলাদেশ পুলিশের শীর্ষ পদে দায়িত্ব পালন করা এবং বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগে আলোচিত বেনজীর আহমেদকে ঘিরে এমন পরস্পরবিরোধী দাবিগুলো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে হাজারো নেটিজেনের কাছে। গ্রেপ্তারের ঘটনা, ইন্টারপোলের রেড নোটিশ, দুবাই কর্তৃপক্ষের ভূমিকা এবং ভাইরাল ছবিগুলোর সত্যতা নিয়ে অনুসন্ধান চালিয়েছে রিউমর স্ক্যানার।
গত ১৪ জুন দুপুরে খবর আসে, বেনজীর আহমেদ সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গ্রেপ্তার হয়েছেন। বাংলাদেশের ইংরেজি দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের এক খবরে বলা হয়, দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় ইন্টারপোলের সহযোগিতায় তাকে গ্রেপ্তার করেছে দুবাই পুলিশ। পুলিশ সদরদপ্তরের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে খবরটি জানায় পত্রিকাটি।
এই খবরের পর বিকেলেই ফেসবুকের একাধিক পেজ থেকে প্রচার চালানো হয়, বেনজীর আহমেদ গ্রেপ্তারের বিষয়টি ভুয়া। এসব পোস্টে এটিকে গুজব হিসেবে দাবি করে তাতে কান না দেওয়ারও পরামর্শ ছিল। ‘Team Ekattor’ নামের একটি পেজে এমন একটি পোস্ট করার ১৫ জুন রাত ১২ টার পর আরেক পোস্ট দিয়ে দাবি করা হয়, এআই এর মাধ্যমে বেনজির সন্দেহে যাদেরকে যাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে তিনি আসলে বেনজির নন। এই পোস্টের আধ ঘণ্টা পরই একই পেজে আরেক পোস্টে দাবি করা হয়, জিজ্ঞাসাবাদ শেষে বেনজীরকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

অর্থাৎ, একই পেজ প্রথমে গ্রেপ্তারের দাবি ‘ভুয়া বলে’ পরে ‘গ্রেপ্তারকৃত ব্যক্তি বেনজীর নন’ বলে শেষে দাবি করেছে ‘বেনজীর গ্রেপ্তার হয়েছিল কিন্তু পরে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে’।
এই তিন দাবির শেষেরটি ১৫ জুন রাতভর প্রচার করা হয় অসংখ্য পেজ-প্রোফাইল থেকে। The Crack Team, Daily Ajker Kantho, Lekhak Bhattacharjee, Nucleus 71, Al Amin Rahman, Bangladesh Insiders এর এ সংক্রান্ত পোস্টগুলোর মাধ্যমে দাবিটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে যায়।
এমনও দাবি করা হয়, সাবেক আইজিপি বেনজীরকে ভিসা সংক্রান্ত ইস্যুতে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়েছিলো বলে জানিয়েছে আমিরাত প্রশাসন।
কিছু পোস্টের দাবি ছিল, বেনজিরের নামে যে ইন্টারপোলের রেড নোটিশ প্রচার করা হয়েছে, সেটি ভুয়া। ইন্টারপোলে ৫৯ বাংলাদেশির নামে রেড নোটিশ আছে, তাদের মধ্যে বেনজীরের নাম নেই। মূলত, প্রবাসী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের এক ফেসবুক পোস্টে আলোচিত নোটিশটির একটি ছবি যুক্ত করেন। সেটিকেই ভুয়া বলে দাবি করা হচ্ছিল। রিউমর স্ক্যানার যাচাই করে দেখেছে, ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটের প্রকাশিত তালিকায় নাম না থাকা রেড নোটিশ জারি না হওয়ার প্রমাণ নয়। কারণ, ইন্টারপোল অধিকাংশ নোটিশই জনসাধারণের জন্য ওয়েবসাইটে প্রকাশ করে না। ইন্টারপোল তাদের ওয়েবসাইটে বিষয়টি স্পষ্ট করেছে।
ইন্টারপোলের ওয়েবসাইটে বলা হয়েছে, “অধিকাংশ রেড নোটিশ শুধু আইন প্রয়োগকারী সংস্থার ব্যবহারের জন্য সীমাবদ্ধ। সংশ্লিষ্ট সদস্য দেশের অনুরোধে এবং যখন কোনো ব্যক্তিকে খুঁজে বের করতে জনসাধারণের সাহায্যের প্রয়োজন হতে পারে অথবা যদি ওই ব্যক্তি জননিরাপত্তার জন্য হুমকি সৃষ্টি করতে পারে, তখন রেড নোটিশের অংশবিশেষ প্রকাশ করা হয়।”

পরবর্তীতে, বেনজীরের গ্রেপ্তারের বিষয়টি অনুসন্ধান করতে গিয়ে জাতীয় সংসদের চলতি অধিবেশনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের একটি বক্তব্য খুঁজে পাওয়া যায়। ১৪ জুন দুপুরেই তিনি সংসদকে জানান, ১২ জুন সংযুক্ত আরব আমিরাতের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ডাইরেক্টরেট জেনারেল অব ফেডারেল ক্রিমিনাল পুলিশ ন্যাশনাল সেন্ট্রাল ব্যুরো (এনসিবি) আবুধাবি থেকে পাঠানো একটি ই–মেইলের মাধ্যমে বাংলাদেশ সরকারকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি জানানো হয়।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরও বলেন, গ্রেপ্তারের তারিখ থেকে ৩০ দিনের মধ্যে কূটনৈতিক চ্যানেলের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ (এক্সট্রাডিশন রিকোয়েস্ট) পাঠাতে হবে।
অর্থাৎ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই বক্তব্য অনুযায়ী অন্তত পরবর্তী ৩০ দিন বেনজীর আহমেদ দুবাই কর্তৃপক্ষের হেফাজতেই থাকবেন।
সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রত্যর্পণ প্রস্তাব প্রস্তুত ও অনুমোদন এবং পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে আমিরাত কর্তৃপক্ষের কাছে কূটনৈতিক চ্যানেলে আনুষ্ঠানিক প্রত্যর্পণ অনুরোধ পাঠাবে। এনসিবি (পুলিশ সদর দপ্তরের একটি শাখা যারা ইন্টারপোলের সঙ্গে যোগাযোগ করে) আমিরাতের রাজধানী আবুধাবি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করবে। অতি দ্রুতই বেনজীর আহমেদকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হবে বলেও জানান মন্ত্রী।
এই ইমেইলটির একটি কপি রিউমর স্ক্যানারের হাতেও এসেছে। ঢাকা ও দুবাইয়ে অবস্থানরত একাধিক সাংবাদিক যারা কূটনীতিক চ্যানেলের যোগাযোগ বিষয়ে অবগত রয়েছেন তারা রিউমর স্ক্যানারকে এই চিঠির সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। পুলিশ সদর দপ্তরও বেনজীরকে গ্রেপ্তারের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। তবে দুবাই বা সংযুক্ত আরব আমিরাতের কোনো গণমাধ্যমে বিষয়টি নিয়ে স্বতন্ত্র প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি। আবুধাবি ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘24.ae’ এর সাংবাদিক ও ফ্যাক্টচেকার মাহমুদ গাজায়েল রিউমর স্ক্যানারকে জানান, সংযুক্ত আরব আমিরাতের নিজস্ব সরকারি সূত্র, যেমন পুলিশ, মন্ত্রণালয় বা অনুরূপ কোনো সূত্র থেকে নিশ্চিতকরণ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের গণমাধ্যম সাধারণত এ ধরনের বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে না।
মাহমুদ মনে করেন, দেশটির সংবাদমাধ্যমগুলো সংযুক্ত আরব আমিরাতের একটি আনুষ্ঠানিক ঘোষণার জন্য অপেক্ষা করছে।
রিউমর স্ক্যানারের পক্ষ থেকে আবুধাবী পুলিশ হেডকোয়ার্টার এবং ইন্টারপোলের প্রেস অফিসেও যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। আবুধাবি পুলিশের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়ে বাংলাদেশের দূতাবাসের সাথে যোগাযোগের পরামর্শ দেওয়া হয়। ইন্টারপোল জানিয়েছে, ইন্টারপোলের ১৯৬টি সদস্য দেশের কোনোটির পুলিশ যদি তদন্ত এবং ব্যক্তিবিশেষ সম্পর্কিত কোনো তথ্য লিয়নে অবস্থিত সাধারণ সচিবালয়ের সাথে আদান-প্রদান করে, তবে সেই তথ্য সেই সদস্য দেশের মালিকানাধীন থাকে। সাধারণ সচিবালয় শুধুমাত্র বিশেষ পরিস্থিতিতে এবং/অথবা সংশ্লিষ্ট দেশের অনুমোদন সাপেক্ষে তথ্য সরবরাহ করতে পারে। ইন্টারপোলের পক্ষ থেকে এ সংক্রান্ত তথ্যের জন্য সংযুক্ত আরব আমিরাতের কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হয়।
অনলাইন সংবাদমাধ্যম এশিয়া পোস্টের এক প্রতিবেদনে বেনজীর আহমদের স্ত্রীর বরাত দিয়ে তার একসময়ের স্টাফ অফিসার জানান, বেনজীর আহমেদ দীর্ঘদিন ধরে পরিবারের সঙ্গে দুবাইয়ে বসবাস করছেন। প্রতিদিনের মতো গত ১২ জুন দুবাইয়ের বাসায় পরিবারের সঙ্গে সময় কাটান। এ সময় তার বন্ধু চট্টগ্রামের এক সংসদ সদস্য মোবাইল ফোনে কল করে বাসার পাশের একটি শপিং মলে দেখা করার কথা বলেন। তিনি বন্ধুর ডাকে সাড়া দিয়ে শপিং মলে গেলে আগে থেকেই অবস্থান নেওয়া দুবাই পুলিশের সদস্যরা তাকে আটক করে থানায় নিয়ে যান। এ সময় পুলিশের সঙ্গে ওই সংসদ সদস্যের লোকজন উপস্থিত ছিল বলে আমরা জানতে পারি।
বেনজীর আহমেদের বিরুদ্ধে ঢাকায় চলমান একটি মামলার এক আইনজীবী নাম প্রকাশ না করার শর্তে এশিয়া পোস্টকে বলেন, বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারের খবর পেয়ে আমরা দুবাইয়ে তার পক্ষে একজন আইনজীবী নিয়োগ দিই। ওই আইনজীবীর পরামর্শে এরই মধ্যে তার বিরুদ্ধে চলমান সব মামলার নথিপত্র ঢাকা থেকে দুবাইয়ে পাঠানো হয়েছে।
বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারের বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো তথ্য যেমন আরব আমিরাত কর্তৃপক্ষ জানায়নি, তেমনি এ সংক্রান্ত কোনো ছবিও বিশ্বস্ত সূত্রগুলো প্রকাশ করেনি। তবে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দুইটি ছবি (১, ২) ভাইরাল হয়েছে যাতে দেখা যাচ্ছে, বেনজীরকে হাতকড়া পরিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।

যাচাই করে দেখা গেছে, ছবি দুইটি এআই দিয়ে তৈরি।
এছাড়া, জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় কর্মপরিষদ সদস্য ও সুপ্রিম কোর্টের সিনিয়র আইনজীবী শিশির মনিরের ছবি যুক্ত করে ‘বেনজীর আহমেদ কে আইনি সহায়তা দিতে চাই শিশির মনির’ শীর্ষক শিরোনামে জাতীয় দৈনিক আমার দেশের আদলে তৈরি একটি ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে। যাচাইয়ে দেখা যায়, আমার দেশের ভিন্ন একটি ফটোকার্ড ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় সম্পাদনার মাধ্যমে আলোচিত ফটোকার্ডটি তৈরি করা হয়েছে।
বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারকে ঘিরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরস্পরবিরোধী একাধিক দাবি ছড়িয়ে পড়ে—কখনও বলা হয়েছে গ্রেপ্তারের খবরই ভুয়া, কখনও দাবি করা হয়েছে গ্রেপ্তার হওয়া ব্যক্তি বেনজীর নন, আবার কখনও বলা হয়েছে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে। একইসঙ্গে তার নামে জারি হওয়া রেড নোটিশ এবং গ্রেপ্তারের কথিত ছবিও নিয়ে বিভ্রান্তি তৈরি করা হয়। তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, এসব দাবির পক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। বরং বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, পুলিশ সদরদপ্তর এবং সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক যোগাযোগের তথ্য বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারের বিষয়টিকে সমর্থন করে। অন্যদিকে ভাইরাল হওয়া গ্রেপ্তারের ছবিগুলো এআই প্রযুক্তিতে তৈরি। ফলে বেনজীর আহমেদের গ্রেপ্তারকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন দাবি, ছবি ও ব্যাখ্যার বড় একটি অংশই যাচাইহীন তথ্য ও অপতথ্যের মাধ্যমে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরির উদাহরণ হয়ে উঠেছে।


