জুলাই আন্দোলনে রিউমর স্ক্যানারের কার্যক্রম নিয়ে কুবি শিক্ষকের গবেষণা আন্তর্জাতিক জার্নালে

বাংলাদেশের জুলাই ২০২৪-এর কোটা সংস্কার আন্দোলনের সময় অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া তথ্যের বিশৃঙ্খলা বা ভুল তথ্যের প্রবাহ নিয়ে রিউমর স্ক্যানারের ফ্যাক্টচেকিং কার্যক্রমের ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত একটি গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক জার্নাল ইউরেশিয়ান জার্নাল অফ মিডিয়া কমিউনিকেশন এন্ড কালচার স্টাডিজ (ইএমইডিআইএ)-এ প্রকাশিত হয়েছে।

তুরস্কের ইজমির কাতিপ চেলেবি বিশ্ববিদ্যালয় মিডিয়া ও যোগাযোগ অধ্যয়ন প্রয়োগ ও গবেষণা কেন্দ্র পরিচালিত জার্নালটিতে প্রকাশিত গবেষণাপত্রটির শিরোনাম “Analysing Information Disorder During Bangladesh’s July 2024 Quota Reform Movement: Evidence from Rumor Scanner”। বাংলায়, “বাংলাদেশের জুলাই ২০২৪ কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালীন তথ্য বিশৃঙ্খলার বিশ্লেষণ: রিউমর স্ক্যানার থেকে প্রাপ্ত প্রমাণ”।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের প্রভাষক মশিউর রহমানের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণায় আরো যুক্ত ছিলেন বিশ্ববিদ্যালয়ের একই বিভাগের দুই শিক্ষার্থী মোহাম্মদ আবদুল্লাহ ও জামাল হোসেন রাজু। গত ২৪ জুন গবেষণাপত্রটি প্রকাশিত হয়।

গবেষণায় ২০২৪ সালের ১০ জুলাই থেকে ১০ আগস্ট পর্যন্ত রিউমর স্ক্যানারে প্রকাশিত ২১৩টি ফ্যাক্টচেক রিপোর্ট পর্যালোচনা করা হয়। এর মধ্যে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত ১৩৪টি রিপোর্টকে কোয়ালিটিভ কনটেন্ট এনালাইসিস পদ্ধতিতে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। গবেষণার উদ্দেশ্য ছিল আন্দোলনকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়া ভুল তথ্য, বিভ্রান্তিকর তথ্য এবং অপতথ্যের ধরণ, বিস্তারের মাধ্যম এবং প্রচারে ব্যবহৃত কৌশলগুলো শনাক্ত করা।

গবেষণায় দেখা যায়, কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালীন সময়ে ডিজিটাল মাধ্যমে এক নজিরবিহীন ‘তথ্য বিশৃঙ্খলা’ বা ভুল তথ্যের প্রবাহ দেখা গিয়েছিল, যেখানে তথ্যভিত্তিক পোস্টের চেয়ে ছবি এবং ভিডিওর মতো ভিজ্যুয়াল কন্টেন্ট সবচেয়ে বেশি ভূমিকা রেখেছে। এতে বোঝা যায়, রাজনৈতিক অস্থিরতার সময় ছবি ও ভিডিও অনেক ক্ষেত্রে ভুল দাবিকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে। বিশ্লেষণে দেখা যায়, আন্দোলন সংশ্লিষ্ট তথ্য বিশৃঙ্খলার প্রধান উৎস ছিল ফেসবুক। ফলে, রাজনৈতিক সংকটের সময় বাংলাদেশে ফেসবুক যে শুধু যোগাযোগের জায়গা নয়, বরং রাজনৈতিক বয়ান, আবেগ, পক্ষ-বিপক্ষ অবস্থান এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোরও গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে ওঠে তা ওঠে এসেছে গবেষণায়।

অপতথ্য ছড়ানোর ক্ষেত্রে ‘রাগ’ ও ‘আনন্দ’ ধরনের আবেগ সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়েছে, যা জনমতকে প্রভাবিত ও মেরুকৃত করতে সহায়তা করেছে। তথ্য বিশৃঙ্খলার মধ্যে ডিসইনফরমেশন বা ইচ্ছাকৃতভাবে ছড়ানো অপতথ্যের হার সবচেয়ে বেশি, যা নির্দেশ করে যে আন্দোলন ঘিরে বিভ্রান্তিকর বর্ণনা তৈরির একটি সুসংগঠিত প্রবণতা ছিল। একইসঙ্গে ম্যালইনফরমেশন ও মিসইনফরমেশনও শনাক্ত হয়েছে, তবে তুলনামূলকভাবে কম মাত্রায়।

গবেষকরা বলছেন, এই গবেষণায় ‘ক্ষোভ’ সবচেয়ে বেশি প্রভাবশালী আবেগ হিসেবে চিহ্নিত হলেও ‘আনন্দ’, ‘বিদ্রূপ’ এবং ‘প্রতীকী উদযাপন’-ও তথ্য বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে।

মশিউর রহমান বলছেন, ভুল তথ্য কখনও ক্ষোভ তৈরি করে, কখনও বিদ্রূপের মাধ্যমে প্রতিপক্ষকে ছোট করে, আবার কখনও কোনো পক্ষের প্রতীকী বিজয়ের অনুভূতি তৈরি করে ছড়িয়েছে।

গবেষণায় বলা হয়েছে, রিউমর স্ক্যানারের আর্কাইভ থেকে স্পষ্ট যে, বাংলাদেশের ফ্যাক্টচেকাররা কেবল বিচ্ছিন্নভাবে কোনো দাবির সত্যতা যাচাই করার চেয়েও বেশি কিছু করে থাকেন। রাজনৈতিক অস্থিরতার সময়ে তারা বিভ্রান্তিকর তথ্যের ধরণ বা প্যাটার্ন ট্র্যাক করেন, ঘটনার সঠিক কালানুক্রম পুনরুদ্ধার করেন, প্রেক্ষাপটহীন দৃশ্যপটকে তার মূল প্রেক্ষাপটের সাথে পুনরায় জুড়ে দেন এবং বিভ্রান্তিকর উপস্থাপনার মাধ্যমে তৈরি হওয়া তথাকথিত ‘বিশ্বাসযোগ্য’ প্রভাবকে ক্ষুণ্ন করেন। গবেষকরা মনে করছেন, এক্ষেত্রে, রিউমর স্ক্যানার একটি ‘interpretive institution’ হিসেবে কাজ করেছে। প্রতিষ্ঠানটি কেবল কোনো দাবি সত্য নাকি মিথ্যা তা জানানোতেই সীমাবদ্ধ থাকতে চায়নি, বরং একটি বিভ্রান্তিকর আখ্যান বা ন্যারেটিভ কীভাবে ধাপে ধাপে গড়ে উঠেছে, তাও পুনর্নির্মাণ করতে চেয়েছে।

গবেষকরা মনে করেন, এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ সংকটের সময়কার ভুল তথ্যগুলো প্রায়শই পুঞ্জীভূত আকারে আসে। কেবল একটিমাত্র মিথ্যা পোস্ট জনমানুষের ধারণাকে পুরোপুরি প্রভাবিত করতে পারে না, তবে বারবার মিথ্যার প্রলেপ দিয়ে এমন একটি পরিপার্শ্বিক আখ্যান তৈরি করা সম্ভব, যা মন থেকে মুছে ফেলা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। ফ্যাক্টচেকিং এই মিথ্যা খণ্ডনের রেকর্ড তৈরি করে সেই বিভ্রান্তি ছড়ানোর প্রক্রিয়াটিকে বাধাগ্রস্ত করে। ফলে, এখানে বিশ্লেষণ করা আর্কাইভটি কেবল ‘raw data’ হিসেবেই মূল্যবান নয়, বরং এটি পরিবর্তিত পরিস্থিতির মধ্যে গণতান্ত্রিক শ্রম বা প্রচেষ্টার প্রমাণ হিসেবে কাজ করে।

গবেষণাপত্রটি দেখুন এখানে

Share: