সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দাবি প্রচার করা হয়েছে, ‘সাইপ্রাসে এসআলমের ৯৮ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা জব্দ করা হয়েছে’।
এরূপ দাবিতে ফেসবুকে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ) এবং এখানে (আর্কাইভ)।
এরূপ দাবিতে ইনস্টাগ্রামে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।
ফ্যাক্টচেক
রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, সাইপ্রাসে এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলমের ৯৮ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা (প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার) জব্দ করার দাবিটি সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে ৮ বিলিয়ন ইউরো পাচারের অভিযোগে এস আলমের বিরুদ্ধে চলমান তদন্ত ও সরকারের অনুরোধের প্রেক্ষিতে সাইপ্রাসে এস আলম ও তার স্ত্রীর একটি দোতলা বাড়ি জব্দের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। এতে কোনো অর্থ জব্দ করা হয়নি।
আলোচিত দাবির বিষয়ে অনুসন্ধানে সাইপ্রাস ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘সাইপ্রাস মেইল’ এর ওয়েবসাইটে ‘৮ বিলিয়ন ইউরো পাচারের তদন্তের মুখে বাংলাদেশি পুঁজিপতির সম্পত্তি জব্দ করলো সাইপ্রাস’ (অনূদিত) শীর্ষক শিরোনামে গত ২৮ মে তারিখে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের অনুরোধের প্রেক্ষিতে নিকোশিয়ার একটি জেলা আদালত বাংলাদেশি ব্যবসায়ী মোহাম্মদ সাইফুল আলম এবং তার স্ত্রীর মালিকানাধীন পারেকলিসিয়ায় অবস্থিত দোতলা আবাসিক ভবনের একটি সম্পত্তি জব্দ করার নির্দেশ দিয়েছেন। কথিত ব্যাংক জালিয়াতি এবং অর্থ পাচারের চলমান ফৌজদারি তদন্তের অংশ হিসেবে এই অনুরোধ জানানো হয়েছিল। অর্থ পাচার প্রতিরোধ ইউনিট (Mokas)-এর একটি আবেদনের পর গত ১৯ মে এই আদেশ জারি করা হয়। বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে ‘পারস্পরিক আইনি সহায়তা প্রক্রিয়া’র মাধ্যমে এই অনুরোধ করা হয়েছিল। অবশ্য এস আলম তার বিরুদ্ধে আনা সমস্ত অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর প্রকাশ্যেই এই মামলাটিকে দেশ থেকে প্রায় ৮ বিলিয়ন ইউরোরও বেশি অর্থ পাচারের ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন। বাংলাদেশি কর্তৃপক্ষের ধারণা, এই তদন্তের সাথে সংশ্লিষ্ট সম্পদ সাইপ্রাস, সিঙ্গাপুর এবং অন্যান্য দেশের বিচারিক আওতাধীন এলাকায় (অন্যান্য দেশে) থাকতে পারে।
পাশাপাশি, সাইপ্রাস মেইলের প্রতিবেদনটিতে গত ২১ মে তারিখে ইসলামী ব্যাংকের পাওনা ৮৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকার ঋণ পরিশোধ না করায় এস আলম গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ সাইফুল আলমসহ ১১ জনকে চট্টগ্রাম অর্থঋণ আদালতের পাঁচ মাসের কারাদণ্ড দেওয়ার বিষয়েও উল্লেখ করা হয়েছে।
সাইপ্রাস মেইলের উক্ত প্রতিবেদনের প্রেক্ষিতে দেশিয় নানা মূলধারার গণমাধ্যমেও সংবাদ প্রকাশ হতে দেখা যায়। তবে কোথাও উক্ত দোতলা বাড়ির পাশাপাশি কোনো অর্থ জব্দের আদেশের উল্লেখ পাওয়া যায়নি। পাশাপাশি, প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চ করলেও আলোচিত দাবির সপক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি।
উল্লেখ্য যে, কথিত ৯৮ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা প্রায় ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের সমান। অর্থাৎ, উপরোক্ত তথ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট যে সাইপ্রাস মেইলের প্রতিবেদনের শিরোনাম ‘৮ বিলিয়ন ইউরো পাচারের তদন্তের মুখে বাংলাদেশি পুঁজিপতির সম্পত্তি জব্দ করলো সাইপ্রাস’ এর ৮ বিলিয়নকে ভুলভাবে অনূদিত করে ৮ বিলিয়ন ডলার জব্দ দাবি করা হয়েছে।
প্রসঙ্গত, ২০২৪ সালের আগস্টে গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, সংবাদমাধ্যমে পাঠানো সিআইডির এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে যে এস আলম গ্রুপের কর্ণধার সাইফুল ইসলাম (এস আলম) ও তার সহযোগী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ১ লাখ ১৩ হাজার ২৪৫ কোটি টাকা বিদেশে পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান শুরু হয়েছে। পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এই তদন্ত শুরু করেছে। পরবর্তীতে গত বছরের ২৪ জুন ঢাকা একটি আদালত সাইপ্রাসে এস আলমের একটি দোতলা আবাসিক ভবন বাজেয়াপ্ত করার এবং সাইপ্রাস ও ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ডসে তার ও তার স্ত্রীর নামে নিবন্ধিত কোম্পানির শেয়ার জব্দ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এদিকে গত ২১ এপ্রিলে সংসদে এক প্রশ্নের উত্তরে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন এস আলম গ্রুপের বিষয়ে ব্রিটিশ ভার্জিন আইল্যান্ড, সাইপ্রাস, জার্সি ও সিঙ্গাপুর এবং বেক্সিমকো গ্রুপের বিষয়ে যুক্তরাজ্য ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে এমএলএআর (মিউচুয়াল লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্স রিকোয়েস্ট) পাঠানো হয়েছে। এই দুটি গ্রুপের পাচারকৃত অর্থ পুনরুদ্ধারে ফৌজদারি কার্যক্রমের পাশাপাশি দেওয়ানি পদ্ধতিও অনুসরণ করা হচ্ছে। চারটি স্বনামধন্য বিদেশি আইনি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে বিদেশে তাদের সম্পদ অনুসন্ধানের কার্যক্রম গ্রহণ করা হয়েছে।
সুতরাং, সাইপ্রাসে এসআলমের ৯৮ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা জব্দ করা হয়েছে শীর্ষক দাবিটি বিভ্রান্তিকর।
তথ্যসূত্র
- Cyprus Mail – Cyprus freezes property of Bangladeshi tycoon facing €8bn laundering probe
- The Financial Express – Cyprus freezes S Alam’s property
- Prothom Alo – এস আলম ও তাঁর সহযোগীদের বিরুদ্ধে ১ লাখ ১৩ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধান করছে সিআইডি
- Daily Sun – Court freezes foreign company shares, seizes residence of S Alam, wife in Cyprus
- Prothom Alo – এস আলম গ্রুপকে নিয়ে হাসনাতের প্রশ্নে অর্থমন্ত্রী বললেন, সমঝোতার সুযোগ নেই


