সীমান্ত উত্তেজনার আবহে ভুয়া দাবি: ভারতীয় সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়াল বিএসএফের মারধরে বিজিবি সদস্য আহত হওয়ার গুজব

গত মাসে অনুষ্ঠিত ভারতের বিধানসভা নির্বাচনের পর প্রথমবার পশ্চিমবঙ্গে রাজ্য ক্ষমতায় আসে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পায় তৃণমূল কংগ্রেসের একসময়ের নেতা ও বর্তমান বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী। নির্বাচিত হয়েই তিনি পশ্চিমবঙ্গের সীমান্ত সুরক্ষা জোরদার করা এবং রাজ্য থেকে ‘অবৈধ অনুপ্রবেশকারী’দের ‘ডিটেক্ট, ডিলিট, ডিপোর্ট’ করার প্রক্রিয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা জানান। ভারতের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (সিএএ) নিয়ে আগে থেকেই পশ্চিমবঙ্গসহ দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে উত্তেজনা বিরাজ করছিল। পশ্চিমবঙ্গে বিজেপির ক্ষমতায়নের পর থেকে এরই অংশ হিসেবে কথিত অবৈধ অভিবাসীদের চিহ্নিত করতে রাজ্যজুড়ে শুরু হয় ব্যাপক অভিযান। আটক করা হয় কয়েক হাজার নারী-পুরুষ ও শিশুদের।

সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্টে ভারত থেকে বেশ কয়েকজনকে পুশ-ইন করার চেষ্টা করা হয়। তবে বিজিবি ও স্থানীয়দের তৎপরতায় এমন একাধিক চেষ্টা প্রতিহত করা হয়েছে। ফলে কিছু সীমান্ত এলাকায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের শূন্যরেখা বা নো-ম্যানস-ল্যান্ডে অবস্থান করতে দেখা যায়।

সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ এবং পুশ-ইন ইস্যু নিয়ে একাধিকবার ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের ভিন্ন ভিন্ন স্থানে বিজিবি এবং বিএসএফের মাঝে উত্তেজনা বিরাজ করে। যার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়তেও দেখা যায়। তবে এখনো পর্যন্ত উভয় দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে কোনো সংঘর্ষের তথ্য পাওয়া না গেলেও গত ১১ জুন ঈশান বাংলা নামের ভারতীয় একটি সংবাদভিত্তিক ফেসবুক পেজে একজন আহত বিজিবি সদস্যকে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান ও হেলিকপ্টারে করে নিয়ে যাওয়ার একটি ভিডিও ফুটেজ প্রচার করে দাবি করা হয়, ভিডিওতে দেখতে পাওয়া ওই বিজিবি সদস্য বিএসএফের হাতে মারধরের শিকার হয়ে আহত হয়েছেন।

ঈশান বাংলা নামের ভারতীয় পেজটি থেকে এমন দাবিতে ভিডিওটি প্রচারের পরপরই তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পরতে দেখা যায়। একাধিক ভারতীয় ফেসবুক ব্যবহারকারীদের বাংলাদেশকে ও বিজিবিকে হেয় করে ভিডিওটি রিপোস্ট করতে দেখা যায়। ভিডিওটি পোস্ট করেছে এমন একাধিক ফেসবুক, ইউটিউব এবং ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যালোচনা করে দেখে রিউমর স্ক্যানার। পর্যালোচনায় দেখা যায়, ভিডিওটি প্রচারকারী প্রতিটি অ্যাকাউন্ট ভারতীয় বা ভারত থেকে পরিচালিত। 

পরবর্তীতে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত এই ভিডিওটির বিষয়ে অনুসন্ধানে জানা যায়, ভিডিওটির সঙ্গে সাম্প্রতিক ভারত-বাংলাদেশ সীমান্ত ইস্যু বা পুশ-ইন ইস্যুর কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। মূলত, ভিডিওতে দেখতে পাওয়া বিজিবি সদস্য রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ি উপজেলার দুর্গম চিম্বুলুই সীমান্তে দায়িত্ব পালনকালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পরলে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে হেলিকপ্টারযোগে চট্টগ্রাম সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) নেওয়া হয়। 

এ ঘটনায় গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, বিজিবি সদর দপ্তরের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. শরীফুল ইসলামের জানিয়েছেন ওই বিজিবি সদস্যের নাম হাবিলদার মো. এলাহান মিয়া। বাঘাইহাট ব্যাটালিয়নের (৫৪ বিজিবি) সদস্য। গত ৬ জুন তিনি কান্তালং বিওপি থেকে লিংক টহলের মাধ্যমে দায়িত্ব পালন করছিলেন। এসময় চিম্বুলুই বিওপির নিকটবর্তী এলাকায় পৌঁছালে হঠাৎ তার বাম হাত ও বাম পায়ে তীব্র ব্যথা এবং অবশভাব অনুভূত হয়। ঘটনার পরপরই ব্যাটালিয়নের মেডিকেল অফিসার তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করেন। অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় পরে ঢাকার পিলখানাস্থ বিজিবি হাসপাতালের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শক্রমে তার মধ্যে লেফট-সাইডেড হেমিপারেসিস জনিত উপসর্গ পরিলক্ষিত হওয়ায় উন্নত চিকিৎসার জন্য জরুরি ভিত্তিতে চট্টগ্রাম সিএমএইচে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এঘটনায় একাধিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে

এছাড়াও সাম্প্রতিক সময়ে ভারত কিংবা বাংলাদেশ, কোনো দেশের গণমাধ্যমেই রাঙামাটিতে উভয় দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর মধ্যে সংঘর্ষের কোনো ঘটনার তথ্য বা দাবি পাওয়া যায়নি। তাই প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে, আলোচিত ভিডিওটিতে দেখতে পাওয়া বিজিবি সদস্য বিএসএফের হাতে হওয়ার আহত হওয়ার দাবিটি মিথ্যা।

রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশকে ঘিরে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে দেওয়ার ক্ষেত্রে ভারতীয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম অ্যাকাউন্ট ও পেজের একটি পুনরাবৃত্ত ধারা লক্ষ্য করা যায়। বিশেষ করে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের পরিস্থিতি, দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক এবং সীমান্ত-সংশ্লিষ্ট ইস্যুগুলোকে কেন্দ্র করে পুরোনো, ভিন্ন প্রসঙ্গের বা ভুলভাবে উপস্থাপিত ছবি-ভিডিও ব্যবহার করে বাংলাদেশ সম্পর্কে নেতিবাচক বর্ণনা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা প্রায়ই দেখা যায়। আলোচিত ঘটনাটিও সেই ধারারই একটি উদাহরণ, যেখানে অসুস্থ হয়ে পড়া একজন বিজিবি সদস্যের ভিডিওকে বিএসএফের হামলার ঘটনা হিসেবে প্রচার করে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে। অথচ অনুসন্ধানে ভিডিওটির প্রকৃত প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ ভিন্ন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

Share: