বাংলাদেশের রাজনীতিতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী আজ। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর ক্ষমতা হারানো দলটি এখনও প্রকাশ্যে রাজনীতিতে সক্রিয় হতে পারেনি। বিচ্ছিন্ন ঝটিকা মিছিল ও অনলাইন তৎপরতা দেখা গেলেও, এসবে জড়িয়ে বাড়ছে নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে আইনগত পদক্ষেপের পরিমাণও। এ অবস্থায় প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সতর্কতাও জোরদারের তথ্য দিয়েছে সরকার। এমন পরিস্থিতিতে অনলাইনে বাংলাদেশ পুলিশ ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনীকে নিয়ে কিছু কনটেন্ট রিউমর স্ক্যানারের নজরে এসেছে যেখানে মূল কনটেন্টের প্রেক্ষাপট এবং কনটেন্টের উপাদান বিকৃত করে রীতিমতো ব্যঙ্গ করা হচ্ছে সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে।
মাঠে পুলিশ, সেনা ও বিজিবি
আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে সম্ভাব্য কর্মসূচি মোকাবিলায় দেশজুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। পুলিশ সদর দপ্তরের এক গোপনীয় চিঠিতে দলটির সম্ভাব্য কর্মকাণ্ড মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। রাজধানীতে ২০০টির বেশি কৌশলগত স্থানে বিশেষ পিকেট ও চেকপোস্ট বসিয়েছে ডিএমপি, যেখানে দায়িত্ব পালন করছেন ১৮ হাজারের বেশি সদস্য। একইসঙ্গে ঢাকা, চট্টগ্রাম, গাজীপুর, নারায়ণগঞ্জ, গোপালগঞ্জ ও ফরিদপুরে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত হয়েছে এবং কয়েকটি জেলায় বিজিবিও মাঠে নেমেছে।
লক্ষ্যবস্তু সেনা-পুলিশ, উদ্দেশ্য ব্যঙ্গ করা
টিকটকে একটি পোস্টে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে উদ্ধৃত করে “ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের মিছিল ঠেকাতে পুলিশ, র্যাব, বিজিবি যথেষ্ট নয়। তাই আর্মি মোতায়েন করা হয়েছে। তবুও মিছিল না থামলে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর সহায়তা নেওয়া হবে।” শীর্ষক বক্তব্যের একটি ফটোকার্ড প্রচার করা হয়েছে। যাচাই করে দেখা যাচ্ছে, সালাহউদ্দিন আহমদ আলোচিত মন্তব্যটি করেননি। ফটোকার্ডটি প্রথম ‘দৈনিক মোল্লার দেশ’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে প্রচার করা হয়েছে; যা পরবর্তীতে আসল দাবিতে ছড়িয়ে পড়ে।

সাম্প্রতিক মাসগুলোয় বাংলাদেশে রাজনৈতিক, সামাজিক কিংবা সমসাময়িক নানা ইস্যুকে কেন্দ্র করে সার্কাজম ও ট্রল পেজগুলোর তৈরি কনটেন্ট প্রায়ই প্রসঙ্গহীনভাবে বা উৎস উল্লেখ ছাড়া শেয়ার করা হচ্ছে। ফলে ব্যঙ্গাত্মক বা কাল্পনিক বক্তব্য অনেক ক্ষেত্রে সত্য ঘটনা হিসেবে প্রচারিত হয়ে বিভ্রান্তি ও অপতথ্য ছড়ানোর কারণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের নামে ভুয়া উদ্ধৃতি ও নকল ফটোকার্ড প্রচারের ঘটনা ক্রমেই বাড়ছে।
তবে এবার আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী বিশেষ করে পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে লক্ষ্য করে ব্যঙ্গাত্মক ও বিভ্রান্তিকর কনটেন্টের বিস্তার আলাদাভাবে নজরে এসেছে। গতকাল সন্ধ্যা থেকে রিউমর স্ক্যানার অন্তত পাঁচটি এমন কনটেন্ট শনাক্ত করেছে, যেগুলোর কোনোটি পুরোনো ঘটনার সঙ্গে বর্তমান পরিস্থিতিকে জুড়ে প্রচার করা হয়েছে, কোনো ভিডিও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে বিকৃত করা হয়েছে, আবার কোনো ক্ষেত্রে গণমাধ্যমের ফটোকার্ড সম্পাদনা করে শিরোনাম ও ছবি পরিবর্তন করা হয়েছে। এসব কনটেন্টের মূল উদ্দেশ্য ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে উপহাস, বিদ্রুপ বা কটাক্ষের মাধ্যমে উপস্থাপন করা এবং তা সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে দেওয়া।
প্রবাসী অনলাইন এক্টিভিস্ট কাজী মামুন তার ফেসবুক ব্যক্তিগত প্রোফাইলে জাতীয় দৈনিক কালবেলার একটি ফটোকার্ড প্রকাশ করেছেন। শিরোনামে “নিষিদ্ধ আ.লীগের কর্মসূচি ঠেকাতে রাজধানীতে ১৮ হাজার কুকুর।” থাকা ফটোকার্ডে পুলিশের পোশাক পরা কুকুরদের একটি ছবি যুক্ত করা হয়েছে। রিউমর স্ক্যানার যাচাইয়ে দেখেছে, গতকাল কালবেলার এ সংক্রান্ত মূল ফটোকার্ডের শিরোনাম ছিল, “নিষিদ্ধ আ.লীগের কর্মসূচি ঠেকাতে রাজধানীতে ১৮ হাজার পুলিশ” এবং তাতে পুলিশেরই ছবি ছিল। মূলত, গুগলের জেমিনি এআই টুল ব্যবহার করে ফটোকার্ডটি সম্পাদনা করা হয়েছে। অর্থাৎ, পুলিশকে কুকুর হিসেবে অভিহিত করে ব্যঙ্গ করা হয়েছে এই ফটোকার্ডের মাধ্যমে।

তবে সবচেয়ে বেশি ব্যঙ্গাত্মক কনটেন্টের শিকার হতে হচ্ছে সেনাবাহিনীকে। বাহিনীটির প্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের ২০২৫ সালের জুলাইয়ের একটি বক্তব্যের ভিডিও বিকৃত করে প্রচার করা হচ্ছে “মাঠে থাকবে ৯৫ হাজার ছ্যাইয়া বাহিনী সেই খুশিতে ছ্যাইয়া প্রধান।” ক্যাপশনে। ভিডিওটি বিকৃত করতে ব্যবহার হয়েছে ‘PixVerse AI’ নামের এআই-ভিত্তিক ভিডিও জেনারেশন প্ল্যাটফর্ম, যেখানে টেক্সট, ছবি বা নির্দেশনা (প্রম্পট) ব্যবহার করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে ভিডিও তৈরি বা সম্পাদনা করা যায়।

চট্টগ্রাম মহানগর ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক নুরুল আজিম রনি একটি ভিডিও শেয়ার করে সেটিকে বর্তমান সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামানের ধর্মীয় অনুশাসনবিষয়ক বক্তব্যের সঙ্গে যুক্ত করার চেষ্টা করেছেন। ক্যাপশনে তিনি ব্যঙ্গাত্মক ভাষায় দাবি করেন, সেনাপ্রধানের ‘স্বপ্নের প্রতিফলন’ হিসেবে সেনাসদস্যরা নৃত্য পরিবেশন করছেন। রিভার্স সার্চ করে ভিডিওটি ইউটিউবের একটি চ্যানেলে পাওয়া যাচ্ছে, যা ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশ করা হয়৷ একই চ্যানেলে এই অনুষ্ঠানের আরো ভিডিও রয়েছে। অর্থাৎ, এই ভিডিওটি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলের এবং এর সঙ্গে বর্তমান সেনাপ্রধান বা সাম্প্রতিক কোনো নীতিগত অবস্থানের সম্পর্ক নেই। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ২০২৩ সালে সেনাপ্রধান ছিলেন জেনারেল এস এম শফিউদ্দিন আহমেদ; জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এ দায়িত্ব গ্রহণ করেন ২০২৪ সালের জুনে। ফলে পুরোনো একটি ভিডিওকে বর্তমান সেনাপ্রধানের বক্তব্য বা দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন হিসেবে উপস্থাপন করা বাস্তবতার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।

আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে সেনা মোতায়েন সংক্রান্ত একটি খবর গতকাল জাতীয় দৈনিক ইত্তেফাক তাদের ফেসবুক পেজে প্রকাশ করে। পোস্টে যুক্ত ফটোকার্ডে মূল শিরোনাম ছিল “ঢাকাসহ ৬ জেলায় সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্ত”। তবে পরবর্তীতে একই ফটোকার্ডের একটি বিকৃত সংস্করণ সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে শিরোনাম পরিবর্তন করে “আওয়ামী লীগের তৎপরতা ঠেকাতে ঢাকাসহ ৬ জেলায় ছাইয়্য বাহিনী মোতায়েনের সিদ্ধান্ত” লেখা যুক্ত করা হয় এবং সেনাসদস্যদের ছবিও ডিজিটালভাবে বিকৃত করা হয়েছে।
সম্পাদিত ফটোকার্ডটিতে “ছাইয়্য বাহিনী” শব্দটি ব্যবহার করে সেনাবাহিনীকে ব্যঙ্গ ও অবমাননাকরভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা মূল সংবাদে অনুপস্থিত এবং সম্পূর্ণভাবে বিকৃত একটি সংযোজন।

একই বিকৃত ছবিকে ভিডিও আকারেও প্রচার করতে দেখা গেছে। ‘The Crack Team’ নামের একটি ফেসবুক পেজে বিকৃত ভিডিওটি প্রচার করে ক্যাপশনে বলা হয়, “আওয়ামী লীগের তৎপরতা ঠেকাতে ০৬ জেলায় ছাইয়্য বাহিনী মোতায়েন করলো সরকার!”

চট্টগ্রাম মহানগর যুবলীগ নেতা মাহফুজুর রহমান ফরহাদের ফেসবুক পেজে প্রকাশিত একই ভিডিওটি প্রায় লক্ষাধিক বার দেখা হয়েছে।
সার্বিক পর্যালোচনায় এটি স্পষ্ট যে, নিষিদ্ধ ঘোষিত দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, বিশেষ করে পুলিশ ও সেনাবাহিনীকে লক্ষ্য করে যে বিভ্রান্তিকর, অবমাননাকর ও ব্যঙ্গাত্মক কনটেন্টগুলো ছড়ানো হয়েছে, তার পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট মহলের সম্পৃক্ততা রয়েছে।অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এ ধরনের অপপ্রচার ও তথ্য বিকৃতির সঙ্গে জড়িত মূল প্রচারকারীরা সকলেই আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী এবং সমর্থক। দলের দায়িত্বশীল নেতাদের ফেসবুক পেজ ও প্রোফাইল থেকে এসব বিকৃত কনটেন্ট এবং ভিডিও শেয়ার করা হয়েছে। এআই প্রযুক্তির অপব্যবহার এবং মূল ধারার গণমাধ্যমের ফটোকার্ড সম্পাদনা করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে প্রশ্নবিদ্ধ ও উপহাস করার এই সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা মূলত ক্ষমতা হারানোর পর দলটির নেতা-কর্মীদের অনলাইন তৎপরতারই অংশ।


