বাংলাদেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা দীর্ঘদিন ধরেই জনআলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। বিশেষ করে কোনো আলোচিত ধর্ষণ, নির্যাতন বা হত্যাকাণ্ড সামনে এলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া তৈরি হয়, শুরু হয় বিচার দাবির আন্দোলন এবং বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনা। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এসব ঘটনার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ হিসেবে সামনে এসেছে অপতথ্যের বিস্তার। বাস্তব ঘটনার পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে ভুয়া ছবি, পুরোনো ভিডিও, মনগড়া দাবি, বিভ্রান্তিকর বক্তব্য এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত প্রচারণা, যা অনেক ক্ষেত্রে মূল ঘটনাকে ঘিরে জনমত ও আলোচনার গতিপথকেও প্রভাবিত করছে।
এই বাস্তবতায় ২০২৪ সালের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্ষণকাণ্ড, ২০২৫ সালের মাগুরার শিশু নির্যাতন ও মৃত্যু এবং ২০২৬ সালের পল্লবীর শিশু হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়া অপতথ্যের ধরণ, পরিমাণ এবং প্রচারকারীদের ভূমিকা বিশ্লেষণ করেছে রিউমর স্ক্যানার। একই সঙ্গে ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার ঘটনার পরিসংখ্যানের সঙ্গে অপতথ্যের বিস্তারের সম্পর্ক পর্যালোচনা করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই প্রবণতার পরিবর্তন ও বিবর্তনের একটি চিত্র তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
২০২৪ জাবি ধর্ষণকাণ্ড: বাড়ছিল ধর্ষণের ঘটনা, সীমিত ছিল অপতথ্য
২০২৪ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক নারীকে ধর্ষণের ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। অভিযোগ ছিল, ভুক্তভোগী ওই নারীর স্বামীকে একটি আবাসিক হলে আটকে রেখে তাকে সংঘবদ্ধভাবে ধর্ষণ করা হয়। ঘটনাটি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপকভাবে আলোচিত হলেও তখন ধর্ষণ-সংক্রান্ত অপতথ্যের উপস্থিতি তুলনামূলকভাবে সীমিত ছিল। সে বছরের শুরুটা ছিল নারী নির্যাতনের ঊর্ধ্বমুখী গ্রাফ দিয়ে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) হিসাব মতে, জানুয়ারিতে ৩৮টি ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ঘটে, যা ফেব্রুয়ারিতে অর্থাৎ জাবির আলোচিত ঘটনার মাসে বেড়ে দাঁড়ায় ৪৬টিতে এবং মার্চ মাসে তা আরও লাফিয়ে ৬১টিতে পৌঁছায়। পরবর্তীতে এপ্রিল ও মে মাসে এই সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৪৩ ও ৫৭টি।
তবে সে সময় ধর্ষণের ঘটনাগুলো নিয়ে ‘অপতথ্য’ ছড়ানোর হার তুলনামূলকভাবে বেশ কম ছিল। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে কোনো অপতথ্য রেকর্ড করা হয়নি এবং মার্চ, এপ্রিল ও মে মাসে কেবল একটি করে অপতথ্যের ঘটনা ঘটেছিল।
২০২৫ মাগুরায় শিশু নির্যাতনকাণ্ড: ভুক্তভোগীকেও ছাড়েনি অপপ্রচার
জাবির ঘটনাটির ঠিক এক বছর পর, ২০২৫ সালের ৬ মার্চ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে মাগুরায় আট বছর বয়সী এক শিশু নির্যাতনের শিকার হলে পরিস্থিতি ভিন্ন চিত্র ধারণ করে। ঘটনাটি দেশজুড়ে তীব্র আবেগ ও ক্ষোভের জন্ম দেয়। কিন্তু একই সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় ভুয়া তথ্যের বন্যা। শুধু মার্চ মাসেই ভুক্তভোগীকে নিয়ে অন্তত ৮টি এবং ধর্ষণ-সংক্রান্ত ১৫টি অপতথ্য শনাক্ত হয়। অর্থাৎ এক মাসে ২৩টি অপতথ্য ছড়িয়ে পড়ে। একই সময়ে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ছিল ২৫২টি, যা আগের মাস ফেব্রুয়ারির ৫৪টি ঘটনার তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। পরের মাসগুলোয় এই পরিমাণ কমে আসতে থাকে।
এই সময়ের একটি উল্লেখযোগ্য দিক ছিল, শুধু ঘটনাকে ঘিরে নয়, সরাসরি ভুক্তভোগী শিশুকে কেন্দ্র করেও বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর দাবি ছড়িয়ে পড়া, যা আগের বছরের তুলনায় নতুন ও উদ্বেগজনক প্রবণতা হিসেবে সামনে আসে।
২০২৬ পল্লবী হত্যাকাণ্ড: বাস্তব ঘটনার পাশাপাশি বেড়েছে অপতথ্যও
চলতি বছরের ১৯ মে বিএনপি সরকারের সময়ে রাজধানীর পল্লবীতে এক শিশুকে পাশের ফ্ল্যাটে নিয়ে হত্যার ঘটনা দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ঘটনার তদন্ত চলমান থাকতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ঘটনাকে ঘিরে অসংখ্য বিভ্রান্তিকর দাবি ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, শুধু মে মাসেই ভুক্তভোগীকে নিয়ে ১৫টি এবং ধর্ষণ-সংক্রান্ত ১৯টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। অর্থাৎ এক মাসে অন্তত ৩৪টি অপতথ্য ছড়িয়েছে, যা আগের দুই বছরের আলোচিত ঘটনাগুলোর তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, শিশুটির মৃত্যুর ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর ২০ মে থেকে ৬ জুন পর্যন্ত মাত্র তিন সপ্তাহে ধর্ষণের ভুয়া দাবি সংক্রান্ত ২১টি পৃথক অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে জাতীয় দৈনিক কালবেলা ও অনলাইন সংবাদমাধ্যম ঢাকা পোস্টে প্রকাশিত প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে রিউমর স্ক্যানার অন্তত ৩৯টি ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার ঘটনার তথ্য পেয়েছে। অন্যদিকে, আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে মে মাসে ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ছিল ১০৮টি, আর বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের হিসাবে ছিল ৯৮টি। এর আগের মাস এপ্রিলে আসকের নথিভুক্ত ঘটনা ছিল ৬৪টি। ফলে দেখা যাচ্ছে, বাস্তব ঘটনার পাশাপাশি ধর্ষণ ইস্যুকে ঘিরে অপতথ্যের বিস্তারও এই সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিন আমলের তিন ঘটনার তুলনামূলক বিশ্লেষণ
২০২৪, ২০২৫ ও ২০২৬ সালের তিনটি আলোচিত ঘটনাকে কেন্দ্র করে ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার ঘটনার পরিসংখ্যান এবং একই সময়ে শনাক্ত হওয়া অপতথ্যের তথ্য পর্যালোচনা করলে একটি স্পষ্ট প্রবণতা সামনে আসে। সময়ের সাথে ধর্ষণের আলোচিত ঘটনাগুলোর সাথে জড়িয়েছে এ সংক্রান্ত এবং সমজাতীয় নানা অপতথ্য।
২০২৪ সালে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্ষণকাণ্ডের আগে ও পরে পাঁচ মাসে (জানুয়ারি-মে) আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে মোট ২৪৫টি ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ঘটে। একই সময়ে ধর্ষণ-সংক্রান্ত অপতথ্য শনাক্ত হয় অন্তত ৩টি। অর্থাৎ প্রতি ৮১টিরও বেশি ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার ঘটনার বিপরীতে একটি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে কোনো অপতথ্য রেকর্ড না হওয়ায় বোঝা যায়, তখনো ধর্ষণের ঘটনাগুলোকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠিতভাবে ভুয়া তথ্য ছড়ানোর প্রবণতা সীমিত ছিল।
২০২৫ সালে এসে এই চিত্র পাল্টে যায়। সে বছরের মার্চে মাগুরায় আট বছরের শিশুকে নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। ওই বছর ফেব্রুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার অন্তত ৫২৩টি ঘটনার তথ্য পাওয়া যায়। একই সময়ে ভুক্তভোগীকে নিয়ে ৮টি এবং ধর্ষণ-সংক্রান্ত অন্তত ৩১টি অপতথ্য শনাক্ত হয়। অর্থাৎ মোট অপতথ্যের সংখ্যা দাঁড়ায় ৩৯টি। আগের বছরের তুলনায় ধর্ষণ-সংক্রান্ত অপতথ্যের সংখ্যা ১০ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পায়। শুধু মার্চ মাসেই ২৩টি অপতথ্য শনাক্ত হওয়া দেখায় যে, একটি আলোচিত ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তথ্যবিকৃতির মাত্রা কতটা দ্রুত বাড়তে পারে। বিশেষ করে এ সময়ে ভুক্তভোগী শিশুকে ঘিরে ব্যাপক অপপ্রচার, ভিন্ন ঘটনা এবং মনগড়া তথ্য ছড়িয়ে পড়ার প্রবণতাও ছিল লক্ষণীয়।
২০২৬ সালে পল্লবীর আলোচিত হত্যাকাণ্ডের পর পরিস্থিতি আরও তীব্র আকার ধারণ করে। এপ্রিল ও মে মাসে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের হিসাবে ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ছিল ১৭২টি। একই সময়ে ভুক্তভোগীকে নিয়ে ১৫টি এবং ধর্ষণ-সংক্রান্ত ১৯টি অপতথ্য শনাক্ত হয়। অর্থাৎ মাত্র দুই মাসে ৩৪টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে। শুধু ২০ মে থেকে ৬ জুন পর্যন্ত প্রায় তিন সপ্তাহে ধর্ষণ ইস্যুকে কেন্দ্র করে ২১টি পৃথক অপতথ্য শনাক্ত হওয়া দেখায় যে, এখন একটি আলোচিত ঘটনার পর অপতথ্য ছড়ানোর গতি আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি।
তিনটি সময়কালকে পাশাপাশি রাখলে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রবণতা দেখা যায়। ২০২৪ সালে ভুক্তভোগীকে নিয়ে কোনো উল্লেখযোগ্য অপপ্রচার শনাক্ত হয়নি। ২০২৫ সালে ভুক্তভোগীকে ঘিরে ৮টি অপতথ্য শনাক্ত হয়। আর ২০২৬ সালে সেই সংখ্যা প্রায় দ্বিগুণ হয়ে ১৫-এ পৌঁছায়। অর্থাৎ অপতথ্যের কেন্দ্রবিন্দু ধীরে ধীরে শুধু ঘটনাকে ঘিরে বিভ্রান্তিকর দাবি থেকে সরে এসে সরাসরি ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক প্রচারণায় রূপ নিয়েছে।
ধর্ষণ-সংক্রান্ত অপতথ্যের সংখ্যাও ধারাবাহিকভাবে ঊর্ধ্বমুখী। ২০২৪ সালের আলোচিত ঘটনার পরবর্তী সময়ে যেখানে মাত্র ৩টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছিল, সেখানে ২০২৫ সালে তা বেড়ে ৩১টিতে পৌঁছায়। ২০২৬ সালে মাত্র দেড় মাসের ব্যবধানে ১৯টি ধর্ষণ-সংক্রান্ত অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে।
রিউমর স্ক্যানারের বিশ্লেষণ বলছে, অপতথ্যের বিস্তার ও বাস্তব ঘটনার সংখ্যা সবসময় সমানুপাতিক নয়। উদাহরণস্বরূপ, ২০২৫ সালের মার্চ মাসে ধর্ষণ ও ধর্ষণচেষ্টার ঘটনা ছিল ২৫২টি, যা আলোচ্য সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। কিন্তু ২০২৬ সালে মে মাসে ঘটনাসংখ্যা তুলনামূলক কম হলেও অপতথ্যের বিস্তার ছিল অনেক বেশি। অর্থাৎ অপতথ্যের পরিমাণ শুধু অপরাধের প্রকৃত সংখ্যার ওপর নির্ভর করছে না; বরং কোনো ঘটনার সামাজিক আলোড়ন, রাজনৈতিক বিতর্ক, গণমাধ্যমে প্রচারের মাত্রা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জনসম্পৃক্ততার সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে।
ভুক্তভোগীর ছবি থেকে রাজনৈতিক বয়ান: অপতথ্যের বিবর্তন
২০২৪ সালের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় (জাবি) সংশ্লিষ্ট ঘটনাকে ঘিরে উল্লেখযোগ্য অপতথ্যের বিস্তার দেখা না গেলেও, ২০২৫ সালের মাগুরার শিশু ধর্ষণ ও মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে অপতথ্য ছড়ানোর প্রবণতা স্পষ্টভাবে লক্ষ করা যায়। মাগুরার শিশুটি বড় বোনের শ্বশুরবাড়িতে বেড়াতে গিয়ে নির্যাতনের শিকার হয়। ২০২৫ সালের ৬ মার্চ তাকে অচেতন অবস্থায় মাগুরা ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে নেওয়া হয় এবং ১৩ মার্চ ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়। ঘটনাটি কেন্দ্র করে ৮ থেকে ১৮ মার্চের মধ্যে রিউমর স্ক্যানার আটটি অপতথ্য শনাক্ত করে। এসব অপতথ্যের মধ্যে পাঁচটিতেই ভিন্ন শিশুর ছবি বা ভিডিওকে ওই শিশুর বলে প্রচার করা হয়। এর মধ্যে ছিল সাজানো কনটেন্টের দৃশ্য, ভারতীয় শিশুর ছবি, সড়ক দুর্ঘটনায় আহত শিশুর ছবি এবং পারিবারিক নির্যাতনের শিকার এক শিশুর ভিডিও।
অন্যদিকে, সম্প্রতি পল্লবীর শিশুহত্যার ঘটনাকে ঘিরে ছড়ানো অপতথ্যে ভিন্ন ধরনের প্রবণতা দেখা গেছে। গত ১৯ মে রাজধানীর পল্লবীতে আট বছর বয়সী এক শিশু নিখোঁজের এক ঘণ্টার মধ্যেই পাশের ফ্ল্যাট থেকে তার লাশ উদ্ধার করা হয়। শিশুটিকে ধর্ষণের পর হত্যা করে লাশ খন্ডিত করা হয়। মাগুরার ঘটনায় অপতথ্যগুলো মূলত ভুক্তভোগী দাবিতে ভিন্ন শিশুর ফুটেজ ব্যবহার করে প্রচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, পল্লবীর এই ঘটনায় অপতথ্যগুলো উল্লেখযোগ্যভাবে রাজনৈতিক চরিত্র ধারণ করে। রিউমর স্ক্যানারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এ ঘটনায় শনাক্ত হওয়া অপতথ্যের প্রায় ৬০ শতাংশই ছিল রাজনৈতিক। শিশুটিকে হত্যার সাথে অভিযুক্ত ব্যক্তিকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যুক্ত দাবি, রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে সম্পাদিত ছবি প্রচার, কিংবা শীর্ষ রাজনৈতিক নেতাদের নামে ভুয়া অর্থসহায়তার তথ্য ছড়িয়ে দেওয়া হয়েছে। যেমন—অভিযুক্ত সোহেলের সঙ্গে প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের ছবিযুক্ত সম্পাদিত ফেস্টুন, তাকে স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতা হিসেবে দাবি, জামায়াতের কর্মশালায় তার উপস্থিতি দেখিয়ে সম্পাদিত ছবি এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের পক্ষ থেকে আর্থিক সহায়তার দাবিতে এআই-নির্মিত ছবি প্রচারের ঘটনা দেখা গেছে।
দুই ঘটনার তুলনামূলক বিশ্লেষণে দেখা যায়, মাগুরার ঘটনায় অপতথ্যের প্রধান লক্ষ্য ছিল আবেগ উসকে দিতে ভুক্তভোগীর পরিচয় ও দৃশ্যগত উপাদান বিকৃত করা। বিপরীতে, পল্লবীর ঘটনায় একই ধরনের অপরাধকে রাজনৈতিক বয়ান তৈরির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়া মাগুরার ঘটনায় ভুয়া ছবি ও ভিডিও ছিল অপতথ্যের প্রধান মাধ্যম, আর পল্লবীর ঘটনায় ভুয়া বক্তব্য, রাজনৈতিক দাবি এবং এআই-নির্মিত কনটেন্টের ব্যবহার বেশি দেখা গেছে। উল্লেখযোগ্যভাবে, পল্লবীর ঘটনায় ছড়ানো অপতথ্যের প্রায় ৫৩ শতাংশই ছিল ভুয়া বক্তব্যনির্ভর, এবং এসব ভুয়া তথ্যের ভিত্তিতে মূলধারার গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের ঘটনাও ঘটেছে।
একটি বাস্তব ঘটনার সমান্তরালে আরো ভুয়া ঘটনার উৎপাদনে কারা?
২০২৪ থেকে ২০২৬ সালের আলোচিত তিন ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পরের তিন সপ্তাহে ধর্ষণ সংক্রান্ত অপতথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে দেখেছে রিউমর স্ক্যানার৷ ২০২৪ সালের ওই সময়সীমায় এমন কোনো অপতথ্য পাওয়া না গেলেও পরের দুই বছরের ঘটনা দুটিতে যথাক্রমে ৮ ও ২১টি অপতথ্য শনাক্ত করে রিউমর স্ক্যানার৷
মাগুরার আলোচিত ধর্ষণকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ৭ থেকে ২৪ মার্চের মধ্যে ছড়িয়ে পড়া অপতথ্যগুলোর বড় অংশে পুরোনো, ভিন্ন প্রেক্ষাপটের কিংবা ভারতের ঘটনার ছবি ও ভিডিও ব্যবহার করা হয়েছে। এসব অপতথ্যের মধ্যে ছিল ধর্ষণের জেরে মেয়েকে নিয়ে বাবার আত্মহত্যার পুরোনো ঘটনাকে সাম্প্রতিক হিসেবে উপস্থাপন, মামাবাড়িতে নির্যাতনের শিকার এক কিশোরীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের শিকার তরুণী দাবি করা, পতেঙ্গায় ধর্ষণ ও জিহ্বা কেটে ফেলার ঘটনা দাবিতে ভারতের ভিডিও প্রচার, সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালের মর্গে লাশ ধর্ষণের ২০২০ সালের ঘটনাকে নতুন ঘটনা হিসেবে ছড়িয়ে দেওয়া এবং ভারতের বিভিন্ন হত্যাকাণ্ড ও দুর্ঘটনার ভিডিওকে বাংলাদেশে ধর্ষণের পর হত্যা বলে প্রচার করা। এছাড়া, ২০২২ সালে বস্তাবন্দি অবস্থায় জীবিত উদ্ধার হওয়া এক কিশোরীর ঘটনাকে ধর্ষণের পর হত্যা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। এমনকি একটি অপতথ্যে জামায়াত-শিবির কর্মীরা এক তরুণীকে ধর্ষণের পর চলন্ত ট্রেনের নিচে ফেলে গেছে বলে দাবি করা হলেও অনুসন্ধানে সেটি ভারতের একটি সাজানো ভিডিও বলে প্রমাণিত হয়। বিশ্লেষণে দেখা যায়, এসব অপতথ্য প্রচারকারী প্রোফাইলের প্রায় ৬৩.৫ শতাংশ আওয়ামী লীগ-সমর্থক এবং প্রায় ১২.৫ শতাংশ ছাত্রদল-সমর্থক পরিচয়ের ছিল।
পল্লবীর সাম্প্রতিক ঘটনাকে কেন্দ্র করে ২০ মে থেকে ৬ জুন পর্যন্ত শনাক্ত হওয়া ২১টি অপতথ্যের প্রতিটিতেই আওয়ামী লীগ-সমর্থক প্রোফাইল বা পেজের সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এসব অপতথ্যের বড় অংশে পুরোনো, ভিন্ন প্রেক্ষাপটের কিংবা বিদেশের ছবি ও ভিডিওকে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ধর্ষণ, গণধর্ষণ বা ধর্ষণের পর হত্যার ঘটনা হিসেবে প্রচার করা হয়েছে। ভারতের বিহার, ফিলিপাইন ও মিয়ানমারের ভিডিওকে বাংলাদেশের ঘটনা দাবি করা হয়েছে; আবার ২০২১, ২০২৪ ও ২০২৫ সালের বিভিন্ন পুরোনো অপরাধ, লাশ উদ্ধার, নির্যাতন বা দুর্ঘটনার দৃশ্যকে নতুন করে ধর্ষণ-সংক্রান্ত ঘটনা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। পাশাপাশি খুলনা আদালত প্রাঙ্গণে ধর্ষণকারীকে গুলি করে হত্যা, কিশোরগঞ্জে কিশোরীকে ধর্ষণ করে নদীতে ফেলে দেওয়া কিংবা নারায়ণগঞ্জে জামায়াত নেতার বাড়িতে যুবতীর লাশ পাওয়ার মতো একাধিক সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন দাবিও ছড়ানো হয়েছে।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, অপতথ্যগুলো ছড়িয়ে দিতে সবচেয়ে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে ‘গুরুদাসপুর উপজেলা যুবলীগ’ নামের একটি ফেসবুক পেজ। শনাক্ত হওয়া ২১টি অপতথ্যের মধ্যে ১৬টিই এই পেজ থেকে প্রচার করা হয়েছে। পেজটি ৩ জুন বন্ধ হয়ে যায়।

এছাড়া, কয়েকটি অপতথ্যে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে দায়ী করার চেষ্টাও দেখা গেছে। যেমন, যশোরে বিএনপির চাঁদাবাজির কারণে প্রবাসীর শিশুকে নির্যাতনের দাবিতে ফিলিপাইনের একটি ভিডিও প্রচার করা হয় এবং নারায়ণগঞ্জে জামায়াত নেতার বাড়িতে লাশ উদ্ধারের দাবিতে ভিন্ন ঘটনার ভিডিও ব্যবহার করা হয়। অপতথ্য প্রচারকারী অন্যান্য অ্যাকাউন্ট ও পেজের মধ্যে প্রায় ৯.৫ শতাংশ ক্ষেত্রে জামায়াত-সংশ্লিষ্ট এবং প্রায় ৫ শতাংশ করে বিএনপি, শিবির, এনসিপি, ইসলামী আন্দোলন ও খেলাফত মজলিশ-সংশ্লিষ্ট প্রোফাইলের উপস্থিতি পাওয়া গেলেও, শনাক্ত হওয়া সবগুলো অপতথ্যের প্রচারেই আওয়ামী লীগ-সমর্থক নেটওয়ার্কের সম্পৃক্ততা ছিল।
আলোচিত নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনাগুলোকে ঘিরে গত তিন বছরের তথ্য বিশ্লেষণ একটি স্পষ্ট বাস্তবতা সামনে আনে—বাংলাদেশে এখন শুধু অপরাধই নয়, অপরাধ-পরবর্তী অপতথ্যও একটি সমান্তরাল সংকটে পরিণত হয়েছে। ২০২৪ সালের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ধর্ষণকাণ্ডের সময় যেখানে অপতথ্যের উপস্থিতি ছিল সীমিত, সেখানে ২০২৫ সালের মাগুরা এবং ২০২৬ সালের পল্লবী ঘটনার পর তা দ্রুত এবং বহুমাত্রিক আকার ধারণ করেছে। বিশেষ করে ভুক্তভোগীকেন্দ্রিক অপপ্রচার, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বয়ান, ভুয়া ছবি-ভিডিও এবং এআই-নির্মিত কনটেন্টের ব্যবহার উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। বিশ্লেষণ আরও দেখায়, অপতথ্যের বিস্তার বাস্তব অপরাধের সংখ্যার সঙ্গে সবসময় সরাসরি সম্পর্কযুক্ত নয়; বরং কোনো ঘটনার সামাজিক আলোড়ন, রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা এবং অনলাইন সম্পৃক্ততার মাত্রা অপতথ্য তৈরির ক্ষেত্রকে আরও উর্বর করে তোলে। আলোচিত অপরাধকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক বয়ান নির্মাণ ও জনমত প্রভাবিত করার হাতিয়ার হিসেবে অপতথ্যের ব্যবহারও ক্রমশ দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। ফলে নারী ও শিশু নির্যাতনের মতো সংবেদনশীল ঘটনায় ন্যায়বিচারের দাবির পাশাপাশি তথ্যের সত্যতা যাচাই এবং অপতথ্য প্রতিরোধকেও সমান গুরুত্ব দেওয়ার প্রয়োজনীয়তা আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেড়েছে।
কাজের পদ্ধতি
এই গবেষণায় ২০২৪ সালের জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ধর্ষণকাণ্ড, ২০২৫ সালের মাগুরার শিশু নির্যাতন ও মৃত্যু এবং ২০২৬ সালের পল্লবীর শিশু হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়া অপতথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে। তথ্যের জন্য রিউমর স্ক্যানারের ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন, আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক), বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমের প্রকাশিত তথ্য ব্যবহার করা হয়েছে। আলোচিত ঘটনাগুলোর আগে ও পরে শনাক্ত হওয়া অপতথ্যের সংখ্যা, ধরন ও প্রচারের প্রবণতা পর্যালোচনা করা হয়েছে। তবে বিশ্লেষণটি রিউমর স্ক্যানারের শনাক্ত অপতথ্যের ওপর ভিত্তি করে হওয়ায় সব অপতথ্য এতে অন্তর্ভুক্ত নাও হতে পারে। এছাড়া রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার মূল্যায়ন সংশ্লিষ্ট অ্যাকাউন্ট ও পেজগুলোর প্রকাশ্য তথ্যের ভিত্তিতে করা হয়েছে।


