ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই বাংলাদেশের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যেন আরেকটি লড়াইও শুরু হয়ে যায়। মাঠের লড়াই শুরুর আগেই শুরু হয়ে যায় সমর্থকদের তর্ক-বিতর্ক, পতাকা যুদ্ধ এবং নানা ধরনের কনটেন্টের বন্যা। তবে এবারের বিশ্বকাপে উৎসবের এই আবহের পাশাপাশি ছড়িয়ে পড়েছে পুরোনো গুজব, ভুয়া দাবি, এআই দিয়ে তৈরি বিভ্রান্তিকর ছবি এবং সার্কাজম থেকে জন্ম নেওয়া অপতথ্যও।
২০২৬ বিশ্বকাপের উদ্বোধনের আগ থেকেই সামাজিক মাধ্যমে ফিরে আসছে বহু বছর ধরে প্রচলিত গুজব। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করেও ছড়ানো হয় একাধিক ভুয়া দাবি ও বিভ্রান্তিকর ছবি। একই সময়ে সমর্থন প্রকাশের নামে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি করা বিভিন্ন ছবিও ব্যাপকভাবে ভাইরাল হয়।
ব্রাজিল আর্জেন্টিনা নিয়ে ফিরে আসা গুজব
“ব্রাজিল এমন একটি দেশ যে দেশে আজান নিষিদ্ধ আর আর্জেন্টিনা এমন একটি দেশ যে দেশে প্রকাশ্যে কেউ আল্লাহর নাম নিতে পারে না” শীর্ষক একটি দাবি অন্তত এক যুগ ধরে প্রচার হয়ে আসছে৷ এবারও বিশ্বকাপ শুরুর আগ থেকেই দাবিটি ফের প্রচার হতে দেখা যায়। এমন পোস্ট দেখুন ফেসবুকে।

এ বিষয়ে ২০২২ সালেই রিউমর স্ক্যানার প্রকাশিত ফ্যাক্টচেক থেকে জানা যায়, প্রচারিত দুই দাবির কোনোটিই সঠিক নয়৷ ব্রাজিলের মসজিদে প্রকাশ্যেই আজান দেওয়ার প্রমাণ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমেই পাওয়া যায় এবং আর্জেন্টিনায় ইসলামী অনুষ্ঠান দেশটির টেলিভিশনেই সম্প্রচার হয়।
ফুটবল উন্মাদনায় এআই এর ব্যবহার
ফুটবল বিশ্বকাপের আসরকে ঘিরে বরাবরই বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে উৎসাহ-উদ্দীপনা বেড়ে যায় কয়েক গুণ। শহর থেকে গ্রামে, পাড়া মহল্লা সমর্থনকারী দেশের পতাকায় যেমন ছেয়ে যায়, তেমনি সামাজিক মাধ্যমেও সংশ্লিষ্ট দেশের প্রতি সমর্থনে নানা কনটেন্ট প্রচার করেন নেটিজেনরা। চার বছর আগে, কাতারের ২০২২ বিশ্বকাপের সময়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই এর ব্যবহার দেখা না গেলেও এবারের আসরে সমর্থকরা নিজেদের সমর্থন জানান দিতে এআই কনটেন্ট ছড়াচ্ছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেট বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে। এসব কনটেন্টের সিংহভাগই কোনো ডিসক্লেইমার বা এআই লেবেল ছাড়া প্রচার হওয়ায় অনেকে কনটেন্টগুলো সত্য ধরে নিয়ে বিভ্রান্ত হচ্ছেন৷ যেমন, জাতীয় নাগরিক পার্টির চার শীর্ষ নেতা ইরানের জার্সি পরে ছবি তুলেছেন এমন দাবির একটি ছবি বেশ ভাইরাল হয় ফেসবুকে। গত বৃহস্পতিবার Maminul Sir নামের একটি পেজ থেকে প্রচার হওয়া এমন দাবির ছবিতে আজ রবিবার সকাল পর্যন্ত ৬২ হাজারের বেশি রিয়েকশন পড়েছে। যাচাই করে দেখা যায়, হাসনাত আবদুল্লাহর প্রকাশ করা পুরোনো দুইটি ছবি (১, ২) এআই দিয়ে সম্পাদনা করে পাঞ্জাবির স্থলে ইরানের জার্সি বসিয়ে দিয়ে প্রচার করা হয়েছে।

টাওয়ারে আর্জেন্টিনার পতাকা লাগাচ্ছেন এক ব্যক্তি এমন একটি ছবি প্রচার করা হয়েছে বাংলাদেশ থেকে পরিচালিত ‘Argentine Football Association – AFA’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে। ছবিটি Md. Elahi Box নামে এক ব্যক্তি পেজটিতে মেইল করেছেন দাবি করা হয়৷ তবে যাচাইয়ে দেখা যাচ্ছে, ছবিটি এআই জেনারেটেড।

কক্সবাজার রেলওয়ে স্টেশন ইরানের পতাকার সাজে সেজেছে এমন একটি ছবি প্রচার করা হয়েছে ‘Shakib Official’ নামের একটি পেজ থেকে, যা আজ সকাল পর্যন্ত ৬৭ হাজারের বেশি রিয়েকশন পেয়েছে। তবে যাচাইয়ে দেখা যাচ্ছে, এই ছবিটিও এআই জেনারেটেড, যা গুগলের টুল ব্যবহার করে বানানো হয়েছে।

উদ্বোধন ঘিরে অপতথ্য
গত ১১ জুন মেক্সিকোতে বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের পর সেই অনুষ্ঠানের দুইটি দৃশ্য দাবিতে দুইটি আলাদা ছবি ছড়ায় ফেসবুকে। একটি ছবিতে দাবি করা হয়, উদ্বোধনে শহীদ ওসমান হাদির ছবি ভেসে ওঠে লেজার শোতে। তবে যাচাই করে দেখা যায়, ‘GojobVision’ নামের একটি সার্কাজম পেজে দাবিটির সূত্রপাত ঘটে, যা মূলত ব্যঙ্গাত্মক উদ্দেশ্যে প্রচারের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল।

আরেকটি ছবিতে দাবি করা হয়, উদ্বোধনে ইরানের সাবেক সর্বোচ্চ নেতা প্রয়াত আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ছবি লেজার শোতে দেখানো হয়েছে। তবে যাচাই করে দেখা যায়, ‘Sesh Tv’ নামের একটি এআই নির্ভর সার্কাজম পেজে দাবিটির সূত্রপাত ঘটে, যা মূলত ব্যাঙ্গাত্মক উদ্দেশ্যে প্রচারের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল। আদতে, মেক্সিকোতে বিশ্বকাপের উদ্বোধন হয়েছে দিনের বেলায়, সেখানে এমন কোনো লেজার শোও হয়নি।
সার্কাজম পেজের এসব কনটেন্ট ছাপিয়ে সবচেয়ে আলোচনায় ছিল উদ্বোধনী অনুষ্ঠান বিষয়ক আরেকটি ভিডিও। স্টেডিয়ামে বসে কোরআন তেলাওয়াত হচ্ছে এমন একটি ভিডিও দিয়ে দাবি করা হচ্ছিল, এটি ২০২২ সালের কাতার বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানের দৃশ্য। তবে যাচাই করে দেখা যায়, এটি তারও এক বছরের বেশি সময় পূর্বের ভিডিও। ২০২১ সালের অক্টোবরে বিশ্বকাপের জন্য নির্মাণ করা কাতারের আল থুমামা স্টেডিয়াম উদ্বোধনের সময়কার ভিডিও এটি।

তবে এই ভিডিওটি কাতারের বিশ্বকাপের না হলেও সেবার বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কোরআন তেলাওয়াত হয়েছিল। ২০ নভেম্বর কাতারের আল বায়াত স্টেডিয়ামে ফুটবল বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কোরআন তেলাওয়াত করেন ঘানিম আল মুফতি। বিশেষ চাহিদা সম্পন্ন এই তরুণ বিশ্বকাপে ফিফার অ্যাম্বাসেডর হিসেবে নিযুক্ত ছিলেন।
বরাবরের মতো ভুয়া মন্তব্যের উৎস সার্কাজম পেজ
বাইট সাইজ গণমাধ্যম ‘Bongo Wiki’ এর ফটোকার্ডের আদলে তৈরি একটি ফটোকার্ডের মাধ্যমে দাবি (ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম) করা হচ্ছে, শহীদ ওসমান হাদির বোন মাসুমা হাদি বলেছেন, “ফিফার উচিত প্রতি ম্যাচ শুরুর আগে ওসমান হাদির সম্মানে এক মিনিট নিরবতা পালন করা। তা না হলে আমাদের উচিত বিশ্বকাপ বয়কট করা।” আদতে এমন কিছুই বলেননি তিনি। গণমাধ্যমটির গত ডিসেম্বরে প্রকাশিত ভিন্ন একটি ফটোকার্ড সম্পাদনা করে ভুয়া এই মন্তব্য প্রচার করা হচ্ছে।

একই ভুয়া মন্তব্য ছড়িয়েছে জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ডা. মাহমুদা মিতুর নামেও। অনুসন্ধানে জানা যাচ্ছে, ভুয়া মন্তব্য সংবলিত দাবিটির সূত্রপাত মূলত ‘Bengali Steam’ নামের একটি সার্কাজম পেজে, যা মূলত ব্যাঙ্গাত্মক উদ্দেশ্যে প্রচারের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়েছিল।

বাংলাদেশে যেকোনো আলোচিত ইস্যু বা ইভেন্টকে কেন্দ্র করে সুপরিচিত ব্যক্তিদের নামে ভুয়া মন্তব্যের প্রচার এখন নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়েছে। বিশ্বকাপ ইস্যুতে এর ব্যতিক্রম ঘটেনি দেখা যাচ্ছে। ডাকসু নেত্রী ফাতিমা তাসনিম জুমাকে জড়িয়ে তিনি “এই বিশ্বকাপ হলো হাদি ভাইকে ভুলিয়ে দেওয়ার প্রজেক্ট। সরকারের উচিত বাংলাদেশে বিশ্বকাপ সম্প্রচার বন্ধ।” শীর্ষক মন্তব্য করেছেন বলে দাবি (ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম) ছড়িয়েছে সামাজিক মাধ্যমে।

যাচাই করে দেখা যাচ্ছে, ভুয়া মন্তব্য সংবলিত দাবিটিরও সূত্রপাত মূলত ‘Bengali Steam’ সার্কাজম পেজে।


