দিল্লি বিমানবন্দর থেকে দেশে ফেরা: ডা. জাহেদকে নিয়ে যেভাবে ছড়াল একের পর এক অপতথ্য

গত ১৫ ও ১৬ জুন ভারতের নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত হয় ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশন (আইওআরএ)-এর ২৮তম সিনিয়র কর্মকর্তা কমিটির বৈঠক। এ বৈঠকে অংশ নিতে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমানের নেতৃত্বে তিন সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল ১৪ জুন বাংলাদেশ থেকে দিল্লি যান। তবে দিল্লি বিমানবন্দরে কর্তৃপক্ষের ‘অসৌজন্যমূলক’ আচরণের অভিযোগ তুলে ডা. জাহেদ বৈঠকে অংশ না নিয়ে সেদিনই দেশে ফিরে আসেন। ঘটনাটি ঘিরে দুই দেশের গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয়। এরই মধ্যে ডা. জাহেদ উর রহমানকে কেন্দ্র করে একাধিক বিভ্রান্তিকর ও মিথ্যা তথ্য ছড়িয়ে পড়ে, যার অন্তত একটি প্রচার করেছে ভারতীয় গণমাধ্যমও।
কী ঘটেছে আসলে?
ভারতীয় গণমাধ্যম নিউজ১৮ এর ১৪ জুন রাতের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যাচ্ছে, একটি নিরাপত্তা-সংক্রান্ত নজরদারি তালিকায় নাম থাকায় দিল্লি বিমানবন্দরে ভারতীয় অভিবাসন কর্তৃপক্ষ ডা. জাহেদ উর রহমানকে কিছুক্ষণের জন্য আটকে রাখে। সমস্যাটি একটি আপাত প্রশাসনিক ত্রুটি থেকে ঘটেছে। ডা. জাহেদের নাম আগে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম-সংক্রান্ত একটি কালো তালিকা থেকে সরানো হয়েছিল। বিবিসি বাংলার এক খবরে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশে ২০২৪ সালের আগস্টে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগেই জাহেদ উর রহমানের ইউটিউব চ্যানেল ‘Zahed’s Take’ ভারতে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এখনও তা নিষিদ্ধই রয়েছে। রিউমর স্ক্যানার আজ সকালে ভারত থেকে জাহেদ উর রহমানের ইউটিউব চ্যানেলটিতে ঢোকার চেষ্টা করলে প্রবেশে বাধা পায়। চ্যানেলটির লিংকে ক্লিক করার পর স্ক্রিনে ভেসে উঠেছে, ‘জাতীয় নিরাপত্তা বা জনশৃঙ্খলা সম্পর্কিত সরকারি আদেশের কারণে এই দেশে এই বিষয়বস্তুটি বর্তমানে অনুপলব্ধ (unavailable)।’

ভারতের আরেক গণমাধ্যম দ্য প্রিন্ট বলছে, সংবাদপত্রের কলাম, টেলিভিশনে উপস্থিতি এবং তার ইউটিউব চ্যানেল ‘জাহেদ’স টেক’-এর মাধ্যমে ডা. জাহেদ এই যুক্তি দিয়ে বিপুল সংখ্যক অনুসারী তৈরি করেন যে, ভারত দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশকে একটি সার্বভৌম সমকক্ষ হিসেবে না দেখে অধীনস্থ অংশীদার হিসেবে গণ্য করেছে।
নিউজ১৮ জানাচ্ছে, অভিযোগ রয়েছে যে তা একটি অভিবাসন নজরদারি তালিকায় থেকে যায়, যার ফলে তার আগমনের পর সতর্কতা জারি হয়। পরে এই অসঙ্গতি শনাক্ত ও সমাধান করার পর কর্মকর্তারা তাকে প্রবেশের ছাড়পত্র দেন।
দ্য প্রিন্ট কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ডা. জাহেদের ভারতে যাওয়ার ৬০ ঘণ্টারও বেশি আগে বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে ভারতীয় কর্তৃপক্ষকে তার সফরের বিষয়ে অবহিত করেছিল এবং ঢাকায় অবস্থিত ভারতীয় হাইকমিশন ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় উভয়কেই একটি লিখিত নোট পাঠানো হয়েছিল। তাকে অভ্যর্থনা জানাতে বিমানবন্দরে উপস্থিত ছিলেন ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার এম. রিয়াজ হামিদুল্লাহ।
বিবিসি বাংলা জানিয়েছে, দিল্লি বিমানবন্দরে ডা. জাহেদকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয় এবং তাকে বসে থাকতে হয়। যদিও বাংলাদেশ হাইকমিশনসহ নানা পক্ষের তৎপরতায় তাকে শেষ পর্যন্ত দিল্লিতে প্রবেশের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল, তবে পর শেষ পর্যন্ত ফিরে আসার সিদ্ধান্ত নেন। সেদিন রাতেই তিনি শ্রীলঙ্কার কলম্বো যান এবং পরদিন (১৫ জুন) দুপুর নাগাদ ঢাকায় পৌঁছান
১৬ জুন একটি নিয়মিত সংবাদ সম্মেলনে এসে ডা. জাহেদ জানান, “যখন অ্যাক্টিভিস্ট হিসেবে কথা বলতাম, তখন আমি একটা কথা খুব বলতাম। যে, আমরা যেহেতু শক্তিতে-সাইজে তুলনামূলকভাবে ছোট দেশ। বন্ধু পাল্টানো যায়, প্রতিবেশী পাল্টানো যায় না। এটা সত্য কথা। এই কথাটা ভারতের ক্ষেত্রেও সত্য। তারা চাইলেই আমাদেরকে পাল্টাতে পারছেন না। আমরা তার প্রতিবেশী হিসেবে থেকেই যাচ্ছি। আমি বিশ্বাস করি, তাদের সরকার এটা বুঝবেন যে অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ঘটেছে।”
ঘটনার কোনো ছবিই নেই, এআই দিয়ে বিভ্রান্তি
দিল্লীর বিমানবন্দরে ডা. জাহেদ উর রহমানের ঘটনাটির কোনো ছবি বা ফুটেজ দায়িত্বশীল কোনো মাধ্যম প্রকাশ করেনি। অথচ, ভারতের গণমাধ্যম (Bharat Tak) থেকে শুরু করে ফেসবুকের অসংখ্য নেটিজেনের পোস্টে ডা. জাহেদের একটি ছবি ছড়িয়েছে যাতে দেখা যায়, ভারতের পুলিশ জাহেদকে দুই পাশ থেকে ধরে নিয়ে যাচ্ছে। রিউমর স্ক্যানার গুগলের বিশেষ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ‘SynthID’ দিয়ে বিশ্লেষণ করে দেখেছে, এটি গুগলের এআই প্রযুক্তির সহায়তায় তৈরি ছবি৷

‘Gupto Tv’ নামের সার্কাজম পেজ থেকে ১৫ জুন একটি পোস্টে দাবি করা হয়, দিল্লি বিমানবন্দরে নারীসহ আটক হয়েছেন ডা. জাহেদ। পোস্টের ফটোকার্ডে এ সংক্রান্ত একটি ছবিও যুক্ত করা হয়। এই ফটোকার্ডটি পরবর্তীতে বাস্তব ভেবে নিয়ে অনেক নেটিজেনকে সমালোচনা করতে দেখা যায়। যাচাই করে দেখা যায়, এটিও গুগলের এআই প্রযুক্তির সহায়তায় তৈরি ছবি৷

তাছাড়া, ডা. জাহেদের সফরসঙ্গী কোনো নারী ছিলেন না। প্রতিনিধি দলের অন্য দুই সদস্য হলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামুদ্রিক বিষয়ক ইউনিটের প্রধান ও অতিরিক্ত সচিব কমোডর শেখ মাহমুদুল হাসান এবং একই ইউনিটের সহকারী সচিব আবুলাইচ সম্রাট। এই দুইজন ভারতে প্রবেশের অনুমতি পাওয়ার পর দুইদিনের বৈঠকটিতে অংশ নেন।
জাহেদের নামে একাধিক ভুয়া উক্তি, নেপথ্যে সার্কাজম পেজ
ডা. জাহেদকে বিমানবন্দরে জিজ্ঞাসাবাদকালে ভারতীয় কর্তৃপক্ষের সাথে তার আলাপের অন্তত দুইটি বক্তব্য ঘুরে বেড়াচ্ছে সামাজিক মাধ্যমে। একটি বক্তব্যে বলা হচ্ছে, “ডা. জাহেদ জানিয়েছেন যে, বিমানবন্দরে যখন নিজের পরিচয় দিলাম তখন উলটো আমার সাথে খারাপ ব্যবহার শুরু করে। পিছন থেকে এক পুলিশ বলে উঠে “ইয়ে নশেইড়ি ক্যায়সে উপদেষ্টা বান গয়া”?” অন্য আরেক বক্তব্যে দাবি করা হচ্ছে, ডা. জাহেদ বলেছেন, “আমি দিল্লি বিমানবন্দরে বারবার পরিচয় দিলাম যে, আমি বাংলাদেশ সরকারের একজন উপদেষ্টা। তারা এমন ভাব করলো যে, বাংলাদেশকেই চিনে না। এমন অপমানিত আমি জীবনে হই নাই!” প্রকৃতপক্ষে, এই দুই বক্তব্যের কোনোটিই ডা. জাহেদ দেননি। ভুয়া এই বক্তব্য দুইটির (প্রথম, দ্বিতীয়) সূত্রপাত ‘Bengali Steam’ নামের সার্কাজম পেজ, যাদের তৈরি ভুয়া বক্তব্যের ফটোকার্ড দুইটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়েছে ফেসবুকে।
একইভাবে বাংলাদেশসহ ভারতীয় কিছু প্রোফাইল থেকে ডা. জাহেদের বক্তব্য দাবিতে বলা হচ্ছে, ডা. জাহেদ বলেছেন, “যে দেশ আমার মতো মানি লোককে চিনতে না পেরে অপদস্থ করে, সে দেশে আমি আর কখনও যেতে চাই না।” এই ভুয়া বক্তব্যটিরও সূত্রপাত ‘Daily Mollar Desh’ নামের একটি সার্কাজম পেজ।

“ভারত একটি ছেছড়া দেশ। ছেছড়া বলাই ভালো। ওরা সুপার পাওয়ার হতে চায় কিন্তু সবার সাথে চাকর-বাকরের মতো আচরণ করে।” শীর্ষক আরেকটি মন্তব্য ডা. জাহেদের নামে ছড়িয়েছে। ‘Voice Bangla’ নামে সিনিয়র সাংবাদিক মোস্তফা ফিরোজের একটি ফেসবুক পেজ থেকে দাবিটি প্রচার করা হয় অনলাইন সংবাদমাধ্যম এশিয়া পোস্টকে সূত্র দেখিয়ে।

কিওয়ার্ড সার্চ করে এশিয়া পোস্টে এমন কোনো মন্তব্যের সংবাদ পাওয়া যায়নি। ডা. জাহেদ রিউমর স্ক্যানারকে জানিয়েছেন, “কোনোভাবেই এটা সাম্প্রতিক মন্তব্য না। এটা আপনি নিশ্চিত করতে পারেন। আমি সেদিন উইকলি প্রেস ব্রিফিং এর সময় যা বলেছি, তার বাইরে কোনো কথা বলিনি ভারতের ঘটনা নিয়ে।” যাচাই করে দেখা যাচ্ছে, কয়েক মাস পূর্বে নিজের ইউটিউব চ্যানেলে এমন একটি মন্তব্য করেছিলেন ডা. জাহেদ উর রহমান।

