ফিলিস্তিনের ওপর ইজরায়েলের সাম্প্রতিক হামলা ও গণহত্যার ঘটনার প্রেক্ষিতে সম্প্রতি ব্রেকিং নিউজ আকারে জাতিসংঘের ১৩৮টি দেশ ফিলিস্তিনকে স্বাধীন রাষ্ট্র বলে স্বীকৃতি দিয়েছে শীর্ষক তথ্য প্রচার হচ্ছে। অনুসন্ধানে দেখা গিয়েছে যে, তথ্যটি সত্য তবে ফিলিস্তিনের পক্ষে স্বীকৃতি ও জাতিসংঘে তাদের পক্ষে ভোটের এ ঘটনাটি সাম্প্রতিক সময়ের নয়। প্রকৃতপক্ষে ২০১২ সালে “জাতিসংঘে প্যালেস্টাইনের স্টাটাস” শিরোনামের একটি প্রস্তাবে ফিলিস্তিনের পক্ষে ১৩৮ টি দেশ ভোট দেওয়ার মাধ্যমে ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়।
১৫ নভেম্বর ১৯৮৮ সালে আলজেরিয়ায় প্যালেস্টাইন জাতীয় কাউন্সিল কর্তৃক স্বাধীনতার ঘোষণার পর অনেক রাষ্ট্র ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি দেয়। বিস্তৃত দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পর সাম্প্রতিক সময়ে আরও বেশকিছু রাষ্ট্র ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ফিলিস্তিনকে রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতিদানকারী দেশের সংখ্যা বর্তমানে ১৩৯টি। ফিলিস্তিন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতি প্রদানকারী দেশ এবং তাদের স্বীকৃতির সংশ্লিষ্ট তারিখ দেখা যাবে এখানে।
ফিলিস্তিন একটি আংশিকভাবে স্বীকৃত সার্বভৌম রাষ্ট্র, যা বর্তমানে জাতিসংঘ কর্তৃক ‘অ-সদস্য পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র’ হিসাবে শ্রেণীবদ্ধ। ২০২২ সালের এপ্রিল পর্যন্ত জাতিসংঘের ১৯৩ সদস্যের মধ্যে ১৩৮ টি সদস্য দেশ এবং একটি পর্যবেক্ষক দেশ ফিলিস্তিনকে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
১৯৮৮ সালের ১৫ নভেম্বর ফিলিস্তিন নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র হিসেবে ঘোষণা করে। আর এই ঘোষণার এক মাসের মধ্যে ৭৫টির বেশি রাষ্ট্র ফিলিস্তিনকে স্বীকৃতি দেয়। ১৯৮৯ সালের মে মাসের মধ্যে ফিলিস্তিনের পিএলও সরকার এবং ‘স্টেট অব প্যালেস্টাইন’ কে স্বীকৃতি দেয় ১০৬টি সার্বভৌম রাষ্ট্র।
২০১১ সালে জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের সরকারী মর্যাদা ছিল ‘স্থায়ী পর্যবেক্ষক সত্তা’। পরবর্তীতে ২০১১ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পক্ষে ফিলিস্তিনের রাষ্ট্রপতি মাহমুদ আব্বাস জাতিসংঘের তৎকালীন মহাসচিব বান কি-মুনের কাছে জাতিসংঘের পূর্ণ সদস্যপদের জন্য একটি আবেদন জমা দেন। জাতিসংঘের সনদ অনুযায়ী, মহাসচিব তখন আবেদনটি তৎকালীন নিরাপত্তা পরিষদের (লেবানন) প্রেসিডেন্টের কাছে পাঠান। নিরাপত্তা পরিষদে নতুন সদস্যপদ দেওয়ার বিষয়ে স্থায়ী কমিটিতে অনেক আলোচনার পর ২০১১ সালের ১১ নভেম্বর কাউন্সিলে রিপোর্ট গৃহীত হয়, যাতে অনেক কাউন্সিল সদস্য সমর্থন প্রকাশ করেন, পাশাপাশি দুটি সদস্য দেশ ফিলিস্তিনের আবেদন সমর্থন করেনি, যার মধ্যে ভেটো ক্ষমতা সম্পন্ন স্থায়ী সদস্য দেশ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র রয়েছে। তাই কমিটি আর ফিলিস্তিনের সদস্যপদের আবেদন নিরাপত্তা পরিষদে সর্বসম্মতভাবে সুপারিশ করতে পারেনি। ফিলিস্তিনের সেই আবেদন ইতিবাচক সুপারিশের অপেক্ষায় এখনও নিরাপত্তা পরিষদের সামনে রয়ে গেছে।
আরো পড়ুনঃ জাতিসংঘে ফিলিস্তিনের পক্ষে ভুলবশত ভোট দেয়নি ইসরায়েল
সাধারণত জাতিসংঘের সদস্যপদ পাওয়ার জন্য নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ দেশের মধ্যে সকল বা ৫ টি স্থায়ী রাষ্ট্রের সমর্থনসহ কমপক্ষে ৯ টি দেশের সমর্থন প্রয়োজন। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য দেশ যুক্তরাষ্ট্রের বিরোধীতায় ফিলিস্তিনের পূর্ণ সদস্যপদের আবেদনটি জাতিসংঘ এবং নিরাপত্তা পরিষদের কাউন্সিলের পক্ষে সাধারণ পরিষদে সুপারিশ করা সম্ভব হয়নি। উল্লেখ্য, একই বছরে ইউনেস্কো ফিলিস্তিনকে সদস্যপদ দেওয়ায় যুক্তরাষ্ট্র সেসময় ইউনেস্কোতে তাদের তহবিল প্রত্যাহার করেছিল।

২০১২ সালে ফিলিস্তিন তার জাতিসংঘের মর্যাদা উন্নীত করে ‘অ-সদস্য পর্যবেক্ষক রাষ্ট্র’ এর মর্যাদা পেতে আরও একটি বিড করে। এই মর্যাদা পেতে জাতিসংঘের সদস্যপদের মতো নিরাপত্তা পরিষদের ইতিবাচক সুপারিশের প্রয়োজন জরুরী নয়। ফলে এই মর্যাদা সাধারণ পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের মাধ্যমে অনুমোদিত হতে পারে।
২০১২ সালের ২৯ নভেম্বর জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদ “জাতিসংঘে প্যালেস্টাইনের স্টাটাস” শিরোনামে রেজুলেশনটি গৃহীত হয়, যেখানে ফিলিস্তিনের পক্ষে ১৩৮টি দেশ, বিপক্ষে ৯টি এবং ৪১টি দেশ কোনো পক্ষেই ভোট প্রদান করা থেকে বিরত থাকে। প্রয়োজনের চেয়ে অধিকসংখ্যক ভোট পাওয়ায় প্রস্তাবটি জাতিসংঘে ফিলিস্তিনকে অ-সদস্য পর্যবেক্ষক রাষ্ট্রের মর্যাদা প্রদান করে এবং এর মাধ্যমে প্রথমবারের মতো সাধারণ পরিষদ ফিলিস্তিনকে একটি রাষ্ট্র হিসাবে বিবেচনা করে।
ফিলিস্তিনের এই মর্যাদা লাভের ওপর ২০১২ সালের ২৯ নভেম্বর রয়টার্সে “ফিলিস্তিনিরা জাতিসংঘের সার্বভৌম রাষ্ট্রের অন্তর্নিহিত স্বীকৃতি জিতেছে” (অনূদিত) শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ১৯৩ জাতির জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদ একটি সার্বভৌম ফিলিস্তিনি রাষ্ট্রের ডি ফ্যাক্টো স্বীকৃতির অনুমোদন দিয়েছে। জাতিসংঘে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের পর্যবেক্ষকের মর্যাদাকে “সত্তা” থেকে “সদস্যহীন রাষ্ট্র” এ উন্নীত করার পক্ষে ভোট দিয়েছে ১৩৮টি দেশ, বিপক্ষে ৯টি দেশ এবং ৪১ টি অনুপস্থিত ভোট পড়ে।
পরবর্তীতে ২০১৫ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সদর দফপ্তরের বাইরে ফিলিস্তিনি জাতীয় পতাকা উত্তোলনেরও স্বীকৃতি মিলে।
সুতরাং, ফিলিস্তিনকে জাতিসংঘের ১৩৮টি সদস্য দেশ রাষ্ট্র হিসেবে বিবেচনা করে ভোট দেওয়ার মাধ্যমে স্বীকৃতি দিয়েছে।


