সম্প্রতি, ভারতে বিধানসভা নির্বাচন পরবর্তী সময়ে সহিংসতায় চার শতাধিক মুসলিমকে হত্যা করা হয়েছে শীর্ষক একটি দাবি ভাইরাল হয়েছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে।
উক্ত দাবির ফেসবুক পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে।
ফ্যাক্টচেক
রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, ভারতে বিধানসভা নির্বাচন পরবর্তী সময়ে সহিংসতায় চার শতাধিক মুসলিমকে হত্যা করা হয়েছে শীর্ষক দাবিটি সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে, ০৪ থেকে ১৩ মে পর্যন্ত সহিংস ঘটনায় অন্তত ১৩ জনের মৃত্যুর খবর এসেছে। এদের মধ্যে শুধু একজন মুসলিম।
ভারতে গত এপ্রিল-মে মাসে পাঁচটি রাজ্য/কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে বিধানসভা নির্বাচন হয়েছে। ভোটগ্রহণ শেষ হয় ২৯ এপ্রিল। ভোট গণনা ও ফল ঘোষণা করা হয় ৪ মে। পশ্চিমবঙ্গে বড় জয় পেয়েছে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি)। ভোটের ফলপ্রকাশের পর পশ্চিমবঙ্গের একাধিক জেলায় ছড়িয়ে পড়ে রাজনৈতিক সহিংসতা। রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে খুন, হামলা, ভাঙচুর এবং দলীয় কার্যালয় দখলের অভিযোগে উত্তপ্ত হয়ে উঠে পরিস্থিতি। এসব ঘটনায় তৃণমূল কংগ্রেস এবং বিজেপি উভয় পক্ষই পরস্পরকে দোষারোপ করেছে৷ এসবের প্রেক্ষিতেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে অন্তত ৬ মে থেকে সাম্প্রদায়িক হত্যা সংক্রান্ত দাবিটি ছড়াতে দেখে রিউমর স্ক্যানার৷ এই দাবির দুইটি আলাদা সংস্করণ ছড়ায় সেদিন।
দুপুরে ছড়াতে শুরু করা কিছু পোস্টে বলা হয়, “ভারতে চলমান রাজনৈতিক সহিংসতাই ৪৮ ঘণ্টায় বিজিবির হাতে মুসলমানদের ৪৩১ জন নিহত হয়েছে।” আবার রাতে কিছু পোস্টের (ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম) ক্যাপশন ছিল এমন, “ভারতে নির্বাচনের পরেই ৭২ ঘন্টার মধ্যে ৩১ জন মুসলমান কে….See more।”

৪৩১ জন হত্যা সংক্রান্ত দাবিতে বিজিবির নাম উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ বা বিজিবি ভারতের অভ্যন্তরীণ কোনো ইস্যুতে যুক্ত থাকে না। সীমান্তের নিরাপত্তা দেখভাল করাই বাংলাদেশি এই বাহিনীর মূল কাজ। রিউমর স্ক্যানারের বিশ্লেষণ বলছে, বিজেপি’র নাম লিখতে গিয়ে ভুলবশত ‘বিজিবি’ লিখে পোস্টটি করা হয়েছে বাংলাদেশ থেকে পরিচালিত ‘New Bangla’ নামের প্রোফাইলটি থেকে।
০৯ মে সময় এবং মৃতের সংখ্যা বাড়িয়ে আরো কিছু পোস্ট করা হয় ফেসবুকে। সেদিন রাত ৮ টা ১৫ মিনিটে ‘Shala Uddin’ নামের একটি ব্যক্তিগত প্রোফাইলের পোস্টে দাবি করা হয়, “ভারতে পশ্চিমবঙ্গে চলমান সহিংসতায় হিন্দুত্ববাদী সন্ত্রাসীদের হাতে ৭২ ঘন্টায় ৪৮৭ জন মুসলিম কে হত্যা করেছে।”

পরবর্তী সময়ে এই দাবিটিই ছড়াতে শুরু করে বিভিন্ন প্রোফাইল-পেজ থেকে।
নির্বাচনের ফলাফল পরবর্তী সহিংসতায় ঠিক কতজন মারা গেছে তা জানতে কিওয়ার্ড সার্চ করলে ভারতীয় গণমাধ্যমে ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের ওয়েবসাইটে গত ১০ মে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন সামনে আসে। প্রতিবেদনে বলা হয়, তৃণমূলের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, এখন পর্যন্ত তাদের ছয়জন কর্মী নিহত হয়েছেন। মৃতদের তালিকায় রয়েছেন এনটালির তাপস নস্কর, নানুরের আবির শেখ, বেলেঘাটার বিশ্বজিৎ পট্টনায়েক, পূর্ব বর্ধমানের পিঙ্কু দেবনাথ, কুলপির মিঠুন সামন্ত, হুগলির সহদেব বাগ। তবে তৃণমূলের সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায় এক্সে এক পোস্টে দাবি করেন, সোমনাথ আচার্য ও তপন শিকদার নামে তাদের আরো দুই কর্মীও নিহত হয়েছেন। অর্থাৎ, সংখ্যাটা অন্তত আটজন।
এছাড়া, বিজেপি সংশ্লিষ্ট পাঁচজনের নিহতের খবর পাওয়া যাচ্ছে। এদের মধ্যে একজন বিজেপি নেতা (নবনির্বাচিত মুখ্যমন্ত্রী) শুভেন্দু অধিকারীর সহকারী চন্দ্রনাথ রথ এবং অন্যরা বিজেপী সমর্থক-কর্মী। এরা হলেন মধু মন্ডল, জগদীশ বসাক, হাবুলাল গোপ, যাদব বর।
অর্থাৎ, সবমিলিয়ে সহিংস ঘটনায় মৃতের সংখ্যা অন্তত ১৩ জন। এদের মধ্যে মুসলিম শুধু একজন, আবির শেখ।
পশ্চিমবঙ্গের বাইরে অন্য কোনো প্রদেশে নির্বাচন পরবর্তী সহিংসতায় মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়নি৷
সুতরাং, বিধানসভা ভোট-পরবর্তী সহিংসতায় ৪৮৭ মুসলিম নিহতের দাবিটি মিথ্যা।


