ফিটনেসের কারণে ৫৫% মা বুকের দুধ খাওয়ান না- এমন দাবির প্রমাণ মেলেনি

গত ১৩ মে বিকেলে হাম নিয়ে ইনকিলাব মঞ্চের সংবাদ সম্মেলনে এসে সংগঠনটির সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের দাবি করেন, ফিটনেস হারানোর ভয়ে সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না ৫৫% শতাংশ মা।

দৈনিক আমার দেশ পত্রিকার ফেসবুক পেজে এই বক্তব্যের একটি সরাসরি সম্প্রচারিত ভিডিও পাওয়া যাচ্ছে। ভিডিওর ৪:১৫ মিনিট সময় থেকে জাবেরের বক্তব্য ছিল এমন, “সবথেকে ভয়াবহ ব্যাপার যেটা, আমাদের মায়েরা তাদের ফিটনেস ধরে রাখবার জন্য তারা সন্তানদের বুকের দুধ পান করান না। একটা প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে, ৫৫% মা.. তার এই যে পাশ্চাত্য যে সংস্কৃতি..এই অপসংস্কৃতি, যে তার সন্তানকে দুধ খাওয়ালে তার ফিটনেস নষ্ট হয়ে যাবে। এই কারণে ৫৫% মা তার সন্তানকে দুধ খাওয়ায় না।”

কোন প্রতিবেদনে এমন তথ্য এসেছে তা কিছুটা স্পষ্ট হয় পরদিন তারই দেওয়া এক ফেসবুক পোস্ট থেকে। বিযয়টি নিয়ে সমালোচনার প্রেক্ষিতে জাবের তার পোস্টে জানান, “ডয়চে ভেলের একটা গবেষণায় দেখা গেছে, প্রায় ৫৫% মা শিশুদের বুকের দুধ পান করাচ্ছেন না, ফলে এই শিশুদের ইমিউনিটি তৈরি হচ্ছে না।”

জাবেরের দাবি, “এইটা নানাবিধ সমস্যার কারনে হতে পারে, তবে অনেকেই ফিটনেস ধরে রাখার জন্য এমনটা করেন। এইটা আমাদের এক ধরনের মূল্যবোধের অবক্ষয়ও বটে।”

“বক্তব্যে “অনেকেই” শব্দটা মিসিং হওয়ার কারণে দু’একজনের কাছে হলেও একটা ভুল মেসেজ যেতে পারে। ৫৫% এর মধ্যে অনেকেই রয়েছেন যারা নানাবিধ সমস্যায় সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াতে পারেন না। তাই অগ্রীম ব্যাখ্যাপূর্বক ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। এবং পরবর্তী সময়ে শব্দচয়নের ক্ষেত্রে আরও অধিকতর সতর্ক থাকার চেষ্টা করবো, ইনশাআল্লাহ।”

খেয়াল করুন, জাবের সংবাদ সম্মেলনে একটি প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে দাবি করছেন যে ফিটনেস হারানোর ভয়ে ৫৫ শতাংশ মা সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না। একদিন পরই সেই বক্তব্যের ব্যাখ্যায় দাবি করছেন, ডয়চে ভেলের একটা গবেষণায় তিনি জেনেছেন যে প্রায় ৫৫% মা শিশুদের বুকের দুধ পান করাচ্ছেন না। এও দাবি করলেন, অনেকেই ফিটনেস ধরে রাখার জন্য এমনটা করেন।

তার সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্য শুনলে মনে হবে, প্রতিবেদনটিতেই ফিটনেস সংক্রান্ত বিষয়টি উল্লেখ আছে৷ আবার পরদিনের বক্তব্য পড়লে মনে হবে, ফিটনেসের বিষয়টি তার নিজস্ব ভাবনাপ্রসূত আলাপ।

বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানে শুরুতে ডয়চে ভেলের আলোচিত প্রতিবেদনটি খুঁজে বের করে রিউমর স্ক্যানার৷ গত ১৮ এপ্রিল ডয়চে ভেলের বাংলা সংস্করণের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনটিতে জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. লেলিন চৌধুরীর একটি বক্তব্য পাওয়া যায়। সেখানে তিনি হামে বাংলাদেশে মৃত্যু বেশি হওয়ার কারণের বিষয়ে বলেন, ‘‘আগে বুঝতে হবে, কেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা শিশুদের হামের টিকার প্রথম ডোজ ৯ মাস বয়সে দেওয়ার পরামর্শ দিয়েছিল৷ গবেষণায় দেখা গেছে, একটি শিশু যদি মায়ের বুকের দুধ খায়, তাহলে ৬ মাস পর্যন্ত তার যে ইমিউনিটি তৈরি হবে তাতে টিকার প্রয়োজন নেই। এরপর থেকে ইমিউনিটি কমতে শুরু করে। সে হিসেবে, ৯ মাস নির্ধারণ করা হয়েছিল। এখন গবেষণায় দেখা গেছে, ৫৫ শতাংশ মা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না। ফলে এই শিশুদের ইমিউনিটি তৈরি হচ্ছে না। আবার মারা যাওয়া শিশুদের ৬৬ শতাংশ টিকার কোনো ডোজই নেয়নি। ১৭ শতাংশ একটি ডোজ নিয়েছে। আবার করোনার পর আমাদের মতো দেশগুলোতে মায়েদের পুষ্টির স্বল্পতা রয়েছে। তারা পর্যাপ্ত পুষ্টিযুক্ত খাবার পাচ্ছেন না। এতে শিশু মৃত্যু বেড়ে যাচ্ছে।”

এই প্রতিবেদনের কোথাও মায়েদের ফিটনেস সংক্রান্ত কোনো তথ্য উল্লেখ পাওয়া যায়নি৷

জাবের এই প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে দুইটি ভুল তথ্য দিয়েছেন। প্রথমত, তিনি এই প্রতিবেদনকে ডয়চে ভেলের গবেষণা হিসেবে উল্লেখ করেছেন। অথচ, এটি কয়েকজন জনস্বাস্থ্যবিদের সঙ্গে কথা বলে তৈরি করা একটি প্রতিবেদন মাত্র। দ্বিতীয়ত, তার সংবাদ সম্মেলনে দেওয়া বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিবেদনে ফিটনেস সংক্রান্ত তথ্যও ছিল। আদতে এই প্রতিবেদনে এমন কোনো তথ্যই নেই।

রিউমর স্ক্যানারের পক্ষ থেকে জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. লেলিন চৌধুরীর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ডয়চে ভেলের প্রতিবেদনটির বিষয়ে জানান, “৫৫% মা প্রথম ৬ মাস শিশুকে পুরোপুরি বুকের দুধ খাওয়ান। রিপোর্টার সম্ভবত ভুল করে অথবা শোনার ভুলে “খাওয়ান না” লিখেছেন। আমি দুঃখ প্রকাশ করছি।”

ডয়চে ভেলের প্রতিবেদনে ডা. লেলিন চৌধুরীর ইন্টারভিউর একটি অডিও-ও রয়েছে। সেখানে তাকে বলতে শোনা যায়, “অন্যদিকে এক সময় আমাদের দেশে মা জন্মের পর শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর হার অনেক বেড়ে গিয়েছিল। কিন্তু এখন এটি ৫৫ বা ৫৬ শতাংশে নেমে এসেছে। ফলে অনেক শিশু জন্মের পর মায়ের দুধ না খাওয়ানোর কারণে তাদের শরীরেও প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকছে।”

ডয়চে ভেলে এক্ষেত্রে দুইটি ভুল তথ্য দিয়েছে। প্রথমত, ডা. লেনিন তার বক্তব্যে গবেষণা শব্দটি উল্লেখ না করলেও ডয়চে ভেলে গবেষণা বলে উল্লেখ করেছে। দ্বিতীয়ত, ডা. লেনিন বলেছেন শিশুকে জন্মের পর বুকের দুধ খাওয়ানোর হার ৫৫ বা ৫৬ শতাংশ। অন্যদিকে ডয়চে ভেলে লিখেছে, তিনি বলেছেন, “গবেষণায় দেখা গেছে, ৫৫ শতাংশ মা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না।”

অর্থাৎ, ফিটনেসের কারণে ৫৫ শতাংশ মা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়াচ্ছেন না – আবদুল্লাহ আল জাবেরের এই দাবি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে, জাবের নিজে যেমন ভুল তথ্য দিয়েছেন তেমনি জাবেরের উল্লেখ করা সূত্র ডয়চে ভেলেও একজন জনস্বাস্থ্যবিদের বক্তব্যকে বিকৃত করেছে।

কিন্তু ঘটনা আসলে কী? শতাংশের হিসাবের প্রকৃত সূত্র কী?

কিওয়ার্ড সার্চ করে জাতীয় দৈনিক কালবেলার ওয়েবসাইটে ২০২৫ সালের ০১ আগস্ট প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়, যাতে বলা হচ্ছে, দেশের ৪৫ শতাংশ মা তাদের সন্তানদের বুকের দুধ থেকে বঞ্চিত রাখেন। এই তথ্যের সূত্র হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয় পুষ্টি পরিষদ বিডিএইচএসের জরিপের ফলাফলের বিষয়ে উল্লেখ পাওয়া যায়। কালবেলা বলছে, বিডিএইচএসের তথ্যমতে, ২০১৭-১৮ সালে ৬৫ শতাংশ শিশু মায়ের বুকের দুধ পেলেও, বর্তমানে এ হার কমে হয়েছে ৫৫ শতাংশ। একই তথ্য পাওয়া যায়, আরেক জাতীয় দৈনিক দ্য ডেইলি স্টারের গত বছরের ১৮ আগস্টের এক প্রতিবেদনে

অনুসন্ধানে ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত বিডিএইচএসের ২০২২ সালের এ সংক্রান্ত পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদনটি খুঁজে বের করেছে রিউমর স্ক্যানার৷ সেখানে (১৮৮ নং পাতায়) অবশ্য ২০২২ সালের হার হিসেবে ৫৩ শতাংশ উল্লেখ পাওয়া গেলেও এর আগের বারের (২০১৭-১৮) হার একই দেখা যায়।

বিডিএইচএসের এই প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০০৪ সালে ৩৬% থেকে ২০১১ সালে ৬৪% পর্যন্ত স্থিতিশীল বৃদ্ধির পর, ০-৫ মাস বয়সী শিশুদের মধ্যে শুধু বুকের দুধ খাওয়ানোর হার ২০১৪ সালে ৫৫%-এ নেমে আসে, ২০১৭-১৮ সালে তা বেড়ে ৬৫% হয় এবং ২০২২ সালে ৫৩%-এ হ্রাস পায়।

কালবেলা বিশেষজ্ঞদের বরাত দিয়ে বলছে, নগরায়ণ ও কর্মজীবী নারীর হার বেড়ে যাওয়া এবং কর্মজীবী মায়েদের জন্য সুষ্ঠু পরিবেশসহ বুকের দুধ পান করানোর পর্যাপ্ত কর্নার না থাকা। সেইসঙ্গে ফর্মুলা দুধ উৎপাদক ও বাজারজাতকারীদের বিজ্ঞাপনের কারণে দিনদিন সন্তানকে মাতৃদুগ্ধ পানের হার কমছে।

জাতীয় দৈনিক প্রথম আলোতে ২০২৩ সালের আগস্টে এ বিষয় নিয়ে একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। সেখানে শিশুর মায়ের দুধ পানের হার কমে যাওয়া প্রসঙ্গে জাতীয় পুষ্টি সেবার উপকর্মসূচি ব্যবস্থাপক সুপ্তা চৌধুরীর একটি মন্তব্য পাওয়া যায়। তিনি বলেন, যে সময় জরিপ হয়েছে, তখন করোনা মহামারি আকারে ছিল। ধারণা করা যায়, ওই সময় মাঠপর্যায়ে সচেতনতা কার্যক্রম কম থাকায় মাতৃদুগ্ধ পানের হার কমেছে। এ ছাড়া কর্মজীবী মায়ের সংখ্যা বাড়ছে। সব জায়গায় দুধ পান করানোর স্থান, শিশু দিবাযত্ন কেন্দ্রসহ বাড়িতেও সহায়ক পরিবেশ না থাকায় অনেক মা সন্তানকে টানা ছয় মাস দুধ পান করাতে পারছেন না।

জনস্বাস্থ্যবিদদের এ সকল মন্তব্যে মায়েদের ফিটনেস সংক্রান্ত কোনো তথ্যই আসেনি।

অর্থাৎ, আব্দুল্লাহ আল জাবের দাবি করেন, ফিটনেস হারানোর ভয়ে ৫৫% মা সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়ান না। তিনি এ তথ্যের সূত্র হিসেবে ডয়চে ভেলের একটি প্রতিবেদনের কথা বলেন। কিন্তু ওই প্রতিবেদনে ফিটনেসের কারণে মায়েরা বুকের দুধ খাওয়ান না- এমন কোনো তথ্য নেই। প্রতিবেদনে শুধু মাতৃদুগ্ধ পানের হার কমে যাওয়া ও শিশুদের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার বিষয়টি এসেছে। জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. লেলিন চৌধুরী জানান, তার বক্তব্যও প্রতিবেদনে ভুলভাবে উপস্থাপন করা হয়েছে। বাংলাদেশ ডেমোগ্রাফিক ও হেলথ সার্ভের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ২০২২ সালে এই হার ছিল প্রায় ৫৩ শতাংশ। এর কারণ ফিটনেস ইস্যু নয় এবং এ সংক্রান্ত দাবিটির পক্ষে কোনো গবেষণা বা প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

Share: