তফসিল বাতিলের জন্য আ.লীগের মশালমিছিলের দৃশ্য দাবিতে এআই-তৈরি ছবি প্রচার

গত ১১ ডিসেম্বর সন্ধ্যায় জাতির উদ্দেশে ভাষণে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন। তিনি জানান, আগামী বছরের ১২ ফেব্রুয়ারি নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এ প্রেক্ষাপটে তফসিল বাতিলের দাবিতে শরীয়তপুর জেলা আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের মশালমিছিলের দৃশ্য দাবিতে একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ছবিটিতে মশাল হাতে ‘অবৈধ সরকারের অবৈধ নির্বাচন মানি না, তফসিল বাতিল কর’ লেখা ব্যানারসহ অসংখ্য মানুষকে দেখা যায়।

উক্ত দাবিতে ফেসবুকে প্রচারিত পোস্ট দেখুন: এখানে, এখানে।
ফ্যাক্টচেক
রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, আলোচিত ছবিটি তফসিল বাতিলের দাবিতে আওয়ামী লীগ ও দলটির অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের মশালমিছিলের বাস্তব কোনো দৃশ্য নয়। প্রকৃতপক্ষে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি ব্যবহার করে ছবিটি তৈরি করা হয়েছে।
এ বিষয়ে অনুসন্ধানে ১২ ডিসেম্বর প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১১ ডিসেম্বর রাত আটটার দিকে ঢাকা-শরীয়তপুর সড়কের জাজিরা উপজেলার মিরাশা এলাকায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল বাতিলের দাবিতে কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া দল আওয়ামী লীগ মশালমশালমিছিল করে। ১২ ডিসেম্বর প্রথম প্রহরে আওয়ামী লীগের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে একই ঘটনার একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়। ভিডিওতে দেখা যায়, অল্প কয়েকজন ব্যক্তি রাতের আঁধারে মুখ ঢেকে মশাল ও ব্যানার হাতে মশালমিছিল করছেন, যা আলোচিত ছবিটির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

পরবর্তীতে আলোচিত ছবিটি পর্যবেক্ষণ করে এতে একাধিক এআই-জনিত অসংগতি লক্ষ্য করা যায়। মশালমিছিলের সামনের বড় ব্যানারের বাংলা লেখার অধিকাংশ অংশ ঠিক থাকলেও একেবারে উপরের লেখাটি বিক্ষিপ্তভাবে গঠিত। সেখানে ‘শরীয়তপুর’ এর পরিবর্তে ‘শরীয়তপর’ লেখা দেখা যায় এবং এর পাশের লেখাটিও কোনো অর্থপূর্ণ শব্দ নয়। মশালমিছিলের প্রথম ও দ্বিতীয় ব্যানারের অধিকাংশ লেখা পড়া গেলেও তৃতীয় ব্যানারের লেখা বাংলা অক্ষরে লেখা হলেও তা কোনো অর্থপূর্ণ শব্দ গঠন করছে না। এছাড়া ছবির দুই পাশে থাকা দোকানের সাইনবোর্ডের লেখাও অর্থবোধক কোনো শব্দ নির্দেশ করে না। সাধারণত এআই দিয়ে তৈরি কনটেন্টে সূক্ষ্ম ডিটেলের ঘাটতি দেখা যায়, এ ক্ষেত্রেও তার প্রতিফলন ঘটেছে। এসবের পাশাপাশি, মানুষের মুখের অভিব্যক্তি ও পারিপার্শ্বিক পরিবেশেও অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা যায়। আরও উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ছবিটির ডান কোণে গুগলের জেমিনি এআইয়ের জলছাপ দেখা যায়।

এরপর ছবিটি এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী টুল হাইভ ডিটেক্টে পরীক্ষা করলে দেখা যায়, এটি এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ৯৯ শতাংশেরও বেশি।

পাশাপাশি, গুগলের সিন্থআইডি (SynthID) প্রযুক্তি এআই দিয়ে তৈরি ছবি, ভিডিও, অডিও বা টেক্সটে অদৃশ্য ডিজিটাল ওয়াটারমার্ক যুক্ত করে, যা খালি চোখে দেখা না গেলেও বিশেষ প্রযুক্তির মাধ্যমে শনাক্ত করা যায়। গুগলের দাবি, কনটেন্ট তৈরি হওয়ার মুহূর্তেই এই ওয়াটারমার্ক যুক্ত হয় এবং ক্রপ করা, ফিল্টার প্রয়োগ বা ফ্রেম রেট পরিবর্তনের মতো সম্পাদনার পরও এটি টিকে থাকে। কোনো ছবি গুগল এআই দিয়ে তৈরি বা সম্পাদিত কি না জানতে চাইলে জেমিনিতে ছবিটি আপলোড করে জিজ্ঞেস করলেই সিন্থআইডি ওয়াটারমার্ক আছে কি না পরীক্ষা করে জানিয়ে দেয়। আলোচিত ছবিটি জেমিনিতে পরীক্ষা করে জানতে চাইলে জেমিনি জানায়, ছবিটি গুগলের এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে তৈরি বা সম্পাদিত।

সুতরাং, এআই দিয়ে তৈরি একটি ছবিকে তফসিল বাতিলের দাবিতে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ-সহযোগী সংগঠনের মশালমিছিলের দৃশ্য দাবি করে প্রচার করা হয়েছে, যা মিথ্যা।
তথ্যসূত্র
- Rumor Scanner’s analysis.
- Prothom Alo: তফসিল বাতিলের দাবিতে শরীয়তপুরে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মশালমশালমিছিল

