গণভোটে ড. ইউনূস, তাসনিম জারা এবং তামিম ইকবালের ‘হ্যাঁ’ ভোটের বিপক্ষে প্রচারণা চালানোর দাবিতে এআই ছবি প্রচার

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। জুলাই সনদ বাস্তবায়নে সংবিধান সংস্কারে জনমত নেওয়ার লক্ষ্যে একইদিনে অনুষ্ঠিত হবে গণভোটও। গণভোটকে সামনে রেখে সরকারি দপ্তরে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচারণার পাশাপাশি প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ফেসবুক পেজেও একই প্রচারণা করতে দেখা যায়। এছাড়াও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)-কে ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালানোর অভিযোগও পাওয়া যায়। তবে সম্প্রতি, প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, তাসনিম জারা এবং জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক তামিম ইকবাল ‘হ্যাঁ’ ভোটের বিপক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন দাবিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের কয়েকটি ছবি প্রচার করা হয়েছে। প্রচারিত ছবিগুলোতে তাদের হাতে ‘তুমিও জানো আমিও জানি “হ্যাঁ” মানেই পাকিস্তানি’ শীর্ষক লেখা সংবলিত প্ল্যাকার্ড দেখতে পাওয়া যায়। প্রতিটি ছবিই Anm Ariful Islam নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে প্রচার করা হয়েছে।

আলোচিত প্ল্যাকার্ড হাতে ড. ‍মুহাম্মদ ইউনূসের ছবিটি দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।

একই লেখা সংবলিত প্ল্যাকার্ড হাতে তাসনিম জারার ছবি দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।

প্ল্যাকার্ডটি হাতে তামিম ইকবালের ছবি দেখুন এখানে (আর্কাইভ)

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে দেখা যায়, আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের বিপক্ষে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস, তাসনিম জারা এবং তামিম ইকবালের প্রচারণা চালানোর দাবিতে আলোচিত প্ল্যাকার্ড হাতে প্রচারিত তাদের ছবিগুলো আসল নয়। প্রকৃতপক্ষে, তাদের নামে প্রচারিত ছবিগুলো এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় তৈরি করা হয়েছে।

ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ছবি যাচাই

অনুসন্ধানের শুরুতে আলোচিত প্ল্যাকার্ড হাতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের ছবিটি সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করে ছবিটির নিচের ডান কোণে গুগলের জেমিনি এআইয়ের জলছাপ লক্ষ্য করা যায়।

এ বিষয়ে অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত বছরের ২৬ আগস্ট গুগল ডিপমাইন্ড ‘ন্যানো বানানা’ নামে একটি উন্নত ইমেজ এডিটিং মডেল উন্মোচন করেছে, যা বর্তমানে গুগলের এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট জেমিনির মাধ্যমে ব্যবহার করা যায়। এই মডেল ব্যবহারকারীদের উন্নত ও সৃজনশীলভাবে ছবি সম্পাদনার সুযোগ প্রদান করে।

পরবর্তীতে আলোচিত এই ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় নির্মিত কিনা তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী প্ল্যাটফর্ম Hive Detect এ ছবিটি পরীক্ষা করলে দেখা যায়, এটি এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ৯৯.৯ শতাংশ।

আলোচিত ছবিটি তৈরিতে ব্যবহৃত ছবির বিষয়ে অনুসন্ধানে রিভার্স ইমেজ সার্চের মাধ্যমে উইকিমিডিয়া কমন্সের ওয়েবসাইটে প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর একটি ছবি খুঁজে পাওয়া যায়। ছবিটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এআই দিয়ে তৈরি প্রধান উপদেষ্টার ‘না’ ভোটের পক্ষে প্রচারণা চালানোর ছবিটির সাথে উক্ত ছবির তার অংশের বেশ মিল রয়েছে।

শুধুমাত্র আলোচিত ছবিটিতে তার পরিহিত প্যান্টের রংটি ভিন্ন। এছাড়াও তার মুখভঙ্গি, পোশাকসহ সবকিছুর হুবহু মিল রয়েছে। এ থেকে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে, আলোচিত এআই ছবিটি তার ড. মুহাম্মদ ইউনূসের উক্ত ছবিটি ব্যবহার করেই তৈরি করা হয়েছে।

তাসনিম জারার ছবি যাচাই

একই দাবিতে প্রচারিত তাসনিম জারার ছবিটি পর্যালোচনা করে এটিতেও গুগলের জেমিনি এআইয়ের জলছাপ লক্ষ্য করা যায়। পরবর্তীতে উক্ত ছবিটিও এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী প্ল্যাটফর্ম Hive Detect এ ছবিটি পরীক্ষা করলে দেখা যায়, এটি এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও ৯৯.৯ শতাংশ।

তাসনিম জারার আলোচিত এই এআই ছবিটির বিষয়ে অনুসন্ধানে দেখা যায়, উক্ত ছবিটি তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে ব্যবহৃত প্রোফাইল ছবিটি ব্যবহার করে তৈরি করা হয়েছে। যেটি তিনি ২০২৩ সালের ৩০ মে প্রকাশ করেছিলেন।

তামিম ইকবালের ছবি যাচাই

‘তুমিও জানো আমিও জানি “হ্যাঁ” মানেই পাকিস্তানি’ শীর্ষক লেখা সংবলিত প্ল্যাকার্ড হাতে তামিম ইকবালের ছবিটিতেও গুগলের জেমিনি এআইয়ের জলছাপ লক্ষ্য করা যায়। উক্ত ছবিটিও এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী প্ল্যাটফর্ম Hive Detect এ ছবিটি পরীক্ষা করলে দেখা যায়, এটি এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও ৯৯.৯ শতাংশ।

পরবর্তীতে তামিম ইকবালের আলোচিত এআই ছবিটি তৈরিতে ব্যবহৃত কনটেন্টের বিষয়ে অনুসন্ধানে দেখা যায়, তামিম তার ফেসবুক পেজে ২০২৩ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর একটি ভিডিও প্রচার করেন। ভিডিওতে তাকে যে টি-শার্ট এবং ক্যাপ পরিহিত অবস্থায় দেখা যায়, আলোচিত দাবিতে প্রচারিত এআই ছবিটিতেও তাকে একই পোশাক পরিহিত অবস্থায় দেখতে পাওয়া যায়। যা থেকে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে, উক্ত ছবির কোনো একটি মুহুর্তের স্ক্রিনশট নিয়ে সেটি ব্যবহার করে আলোটিত ছবিটি তৈরি করা হয়েছে।

পাশাপাশি লক্ষ্য করা যায়, আলোচিত দাবিতে প্রচারিত তিনজনের ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডের প্যাটার্ন অনেকটা একই। বিশেষ করে তাসনিম জারা এবং তামিম ইকবালের ছবির ব্যাকগ্রাউন্ডের সড়ক দুটো বেশ সাদৃশ্যপূর্ণ। এছাড়াও আলোচিত দাবিগুলোর বিষয়ে অনুসন্ধানে গণমাধ্যম কিংবা অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রে ড. মুহাম্মদ ইউনূস, তাসনিম জারা কিংবা তামিম ইকবালের ‘হ্যাঁ’ ভোটের বিপক্ষে প্রচারণা চালানোর তথ্য পাওয়া যায়নি।

সুতরাং, ড. মুহাম্মদ ইউনূস, তাসনিম জারা কিংবা তামিম ইকবালের ‘হ্যাঁ’ ভোটের বিপক্ষে প্রচারণা চালানোর দাবিতে প্রচারিত ছবিগুলো এআই জেনারেটেড।

তথ্যসূত্র

Share: