শেখ হাসিনা ও আ.লীগের পক্ষে ডিপজল, পলাশ এবং মাহমুদউল্লাহর প্রচারণা চালানোর দাবিতে এআই ছবি প্রচার

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে পতন ঘটে আওয়ামী লীগ তথা সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রায় দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনামলের। শেখ হাসিনা ও দলটির একচ্ছত্র আধিপত্যের কারণে অন্যান্য রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মী ও অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক তার শাসনামলকে ফ্যাসিস্ট রেজিম হিসেবে অভিহিত করতেন। এর প্রেক্ষিতে সম্প্রতি, খল অভিনেতা মনোয়ার হোসেন ডিপজল, ছোট পর্দার অভিনেতা জিয়াউল হক পলাশ এবং ক্রিকেটার মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার পক্ষে প্ল্যাকার্ড হাতে রাস্তায় নেমেছেন দাবিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তাদের কয়েকটি ছবি প্রচার করা হয়েছে। প্রচারিত ছবিগুলোতে তাদের ‘যদি ফ্যাসিস্ট দিয়ে ভালো কিছু হয়, তবে ফ্যাসিস্টই ভালো।’ শীর্ষক প্ল্যাকার্ড হাতে রাস্তায় ও স্টেডিয়ামে দেখতে পাওয়া যায়। প্রতিটি ছবিই Anm Ariful Islam নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে প্রচার করা হয়েছে।

মনোয়ার হোসেন ডিপজলের আলোচিত প্ল্যাকার্ড হাতে প্রচারিত ছবি দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।

একই প্ল্যাকার্ড হাতে জিয়াউল হক পলাশের ছবিটি দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।

মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের একই প্ল্যাকার্ড হাতে স্টেডিয়ামের ছবিটি দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে দেখা যায়, শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের পক্ষে জনপ্রিয় খল অভিনেতা মনোয়ার হোসেন ডিপজল, ছোট পর্দার অভিনেতা জিয়াউল হক পলাশ এবং ক্রিকেটার মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের প্রচারণা চালানোর দাবিতে আলোচিত প্ল্যাকার্ড হাতে প্রচারিত তাদের ছবিগুলো আসল নয়। প্রকৃতপক্ষে, তাদের নামে প্রচারিত ছবিগুলো এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় তৈরি করা হয়েছে।

মনোয়ার হোসেন ডিপজলের ছবি যাচাই

অনুসন্ধানের শুরুতে আলোচিত প্ল্যাকার্ড হাতে মনোয়ার হোসেন ডিপজলের ছবিটি সূক্ষ্মভাবে পর্যবেক্ষণ করে ছবিটির নিচের ডান কোণে গুগলের জেমিনি এআইয়ের জলছাপ লক্ষ্য করা যায়।

এ বিষয়ে অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত বছরের ২৬ আগস্ট গুগল ডিপমাইন্ড ‘ন্যানো বানানা’ নামে একটি উন্নত ইমেজ এডিটিং মডেল উন্মোচন করেছে, যা বর্তমানে গুগলের এআই অ্যাসিস্ট্যান্ট জেমিনির মাধ্যমে ব্যবহার করা যায়। এই মডেল ব্যবহারকারীদের উন্নত ও সৃজনশীলভাবে ছবি সম্পাদনার সুযোগ প্রদান করে।

পরবর্তীতে আলোচিত এই ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় নির্মিত কিনা তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী প্ল্যাটফর্ম Hive Detect এ ছবিটি পরীক্ষা করলে দেখা যায়, এটি এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ৯৯.৯ শতাংশ।

আলোচিত ছবিটি তৈরিতে ব্যবহৃত ছবির বিষয়ে অনুসন্ধানে রিভার্স ইমেজ সার্চের মাধ্যমে গণমাধ্যমের প্রতিবেদনে ব্যবহৃত ডিপজলের একটি ছবির সন্ধান পাওয়া যায়।

ছবিটিতে পরিহিত তার পোশাকের সাথে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ছবিতে তার পরিহিত পোশাকের হুবহু মিল পাওয়া যায়। যা থেকে ধারণা করা যাচ্ছে, ডিপজলের উক্ত ছবিটি ব্যবহার করে এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সহায়তায় আলোচিত প্ল্যাকার্ডটি হাতে তার রাস্তায় দাঁড়ানোর ছবিটি তৈরি করা হয়েছে।

জিয়াউল হক পলাশের ছবি যাচাই

একই দাবিতে প্রচারিত জিয়াউল হক পলাশের ছবিটি পর্যালোচনা করে এটিতেও গুগলের জেমিনি এআইয়ের জলছাপ লক্ষ্য করা যায়। পরবর্তীতে উক্ত ছবিটিও এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী প্ল্যাটফর্ম Hive Detect এ ছবিটি পরীক্ষা করলে দেখা যায়, এটি এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও ৯৯.৯ শতাংশ।

জিয়াউল হক পলাশের আলোচিত এই এআই ছবিটির বিষয়ে অনুসন্ধানে দেখা যায়, গতবছরের ২০ অক্টোবর তিনি একই পোলো শার্ট, প্যান্ট ও জুতা পরিহিতি একটি ছবি প্রচার করেন।

ছবিটিতে পরিহিত তার ঘড়িও আলোচিত ছবিটিতে দেখতে পাওয়া যায়। যা থেকে ধারণা করা যাচ্ছে, উক্ত ছবিটি ব্যবহার করে এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে আলোচিত ছবিটি তৈরি করা হয়েছে।

মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের ছবি যাচাই

‘যদি ফ্যাসিস্ট দিয়ে ভালো কিছু হয়, তবে ফ্যাসিস্টই ভালো।’ শীর্ষক লেখা সংবলিত প্ল্যাকার্ড হাতে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের ছবিটিতেও গুগলের জেমিনি এআইয়ের জলছাপ লক্ষ্য করা যায়। উক্ত ছবিটিও এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী প্ল্যাটফর্ম Hive Detect এ ছবিটি পরীক্ষা করলে দেখা যায়, এটি এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও ৯৯.৯ শতাংশ।

পরবর্তীতে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের আলোচিত এআই ছবিটি তৈরিতে ব্যবহৃত কনটেন্টের বিষয়ে অনুসন্ধানে দেখা যায়, আইসিসি টি-টোয়েন্টি ওয়ার্ল্ড কাপ ২০২৪-এর জন্যে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের তোলা একটি ছবির সাথে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ছবির বেশ মিল পাওয়া যায়। উভয় ছবিতেই তাকে একই ভঙ্গিতে ও একই পোশাকে দেখতে পাওয়া যায়। যা থেকে ধারণা করা যাচ্ছে, উক্ত ছবিটি ব্যবহার করে এআই প্রযুক্তির সহায়তায় আলোচিত ছবিটি তৈরি করা হয়েছে।

পাশাপাশি, আলোচিত দাবিতে প্রচারিত প্রতিটি ছবি-ই জেমিনি অ্যাপে গুগলের সিন্থআইডি প্রযুক্তি ব্যবহার করে যাচাই করলে জানানো হয়, ছবিগুলোর অধিকাংশ বা পুরো অংশই গুগলের এআই প্রযুক্তি দিয়ে তৈরি।

উক্ত ছবিগুলোর পাশাপাশি কৌতুক অভিনেতা দেলোয়ার হোসেন ওরফে দিলদার হোসেনের একটি ছবিও Anm Ariful Islam নামের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে প্রচারিত হতে দেখা যায়। যেটিতে তিনি ‘ইউনুস তুই পালিয়ে যা, এখন সময় পক্ষে না।’ শীর্ষক প্ল্যাকার্ড হাতে সড়কে বসে থাকতে দেখা যায়।

ছবিটি পর্যালোচনায় এটিতে গুগলের জেমিনি এআইয়ের জলছাপ লক্ষ্য করা যায়। এছাড়াও এআই কনটেন্ট শনাক্তকারী প্ল্যাটফর্ম Hive Detect-এ ছবিটি পরীক্ষা করলে দেখা যায়, এটি এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনাও ৯৯.৯ শতাংশ।

এছাড়াও কৌতুক অভিনেতা দেলোয়ার হোসেন ওরফে দিলদার হোসেন মারা গেছেন ২০০৩ সালের ১৩ জুলাই। তাই বর্তমানে তার এমন প্ল্যাকার্ড হাতে রাস্তায় নামার ছবিটি সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক।

সুতরাং, অভিনেতা মনোয়ার হোসেন ডিপজল, জিয়াউল হক পলাশ এবং ক্রিকেটার মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার পক্ষে প্যাকার্ড হাতে প্রচারণা চালানোর দাবিতে প্রচারিত ছবিগুলো এআই জেনারেটেড।

তথ্যসূত্র

Share: