সিনেমার দৃশ্যকে ভারতে ‘মুসলিম নিপীড়ন’ হিসেবে দেখালো আমার দেশ

জাতীয় দৈনিক আমার দেশের প্রিন্ট ও অনলাইন সংস্করণে ২৫ জুন “ভারতীয় মুসলিমদের অসহনীয় জীবন” শিরোনামে একটি খবর প্রকাশিত হয়েছে। সংবাদটির ফ্যাক্ট বক্সে দাবি করা হয়েছে, “চলতি বছরের প্রথম চার মাসে অন্তত ২৭ জন মুসলিমকে নির্মমভাবে হত্যা।” এছাড়া, খবরে ভারতীয় মুসলিমরা অত্যাচারের শিকার হচ্ছেন চারটি ছবি যুক্ত করা হয়েছে।

এ সংক্রান্ত গণমাধ্যমটির প্রতিবেদন দেখুন এখানে।

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, এ বছরের প্রথম চার মাসে অন্তত ২৭ জন মুসলিমকে হত্যার দাবিটি সঠিক নয় এবং খবরটিতে প্রচারিত চারটি ছবির দুইটির সাথে মুসলিম অত্যাচারের সরাসরি কোনো সম্পর্ক নেই। প্রকৃতপক্ষে, ভারতে চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ১৭ মুসলিম হত্যার খবর এসেছে। এছাড়া, চারটি ছবির প্রথম ও দ্বিতীয় ছবিটি ২০২৪ ও ২০২৫ সালের। বাকি দুইটি ছবির একটি সংশোধিত নাগরিকত্ব আইন ঘিরে ২০২০ সালের সহিংসতার, অন্যটি একটি সিনেমার দৃশ্য।

চার মাসে ২৭ মুসলিম হত্যা?

আমার দেশ এর প্রতিবেদনটির সাব-হেডিং লেখা হয়েছে ‘চার মাসে ভারতে ২৭ মুসলিমকে নির্মমভাবে হত্যা’ করা হয়েছে। অন্যদিকে, একই প্রতিবেদনের বিস্তারিত অংশে লেখা হয়েছে, “সাউথ এশিয়া জাস্টিস ক্যাম্পেইন কর্তৃক প্রকাশিত ‘ইন্ডিয়া পারসিকিউশন ট্র্যাকার’-এর তথ্য থেকে জানা গেছে, ২০২৬ সালের জানুয়ারি থেকে এপ্রিল মাসের মধ্যে ভারতে অন্তত ১৭ জন মুসলমানকে হত্যা করা হয়েছে।”

অনুসন্ধানে সাউথ এশিয়া জাস্টিস ক্যাম্পেইন এর ওয়েবসাইট থেকে জানা যায়, চলতি বছরের প্রথম চার মাসে ভারতে ১৭ মুসলিমকে হত্যা করা হয়েছে।

অর্থাৎ, একই প্রতিবেদনে দুই রকম তথ্য দিয়েছে পত্রিকাটি। মূলত, সূত্র অনুযায়ী প্রতিবেদনের বিস্তারিত অংশের তথ্যটি সঠিক।

প্রথম ছবি যাচাই

আমার দেশ প্রকাশিত প্রথম ছবিটি রিভার্স সার্চ করে টাইমস অফ ইন্ডিয়ার ওয়েবসাইটে ২০২৪ সালের ০৯ মার্চের এক প্রতিবেদনে একই ফুটেজ পাওয়া যায়। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ০৮ মার্চ উত্তর দিল্লির ইন্দরলোকে নামাজরত এক মুসল্লিকে লাথি মারার অভিযোগে এক সাব-ইন্সপেক্টরকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়।

অর্থাৎ, মুসলিমদের ওপর আক্রমণ হিসেবে ঘটনাটি সত্য, তবে তা ২০২৪ সালের পুরোনো ফুটেজ।

দ্বিতীয় ছবি যাচাই

আমার দেশ প্রকাশিত দ্বিতীয় ছবিটি রিভার্স সার্চ করে ভারতীয় গণমাধ্যম অর্গানাইজারের ওয়েবসাইটে ২০২৫ সালের ১১ জুলাইয়ের এক প্রতিবেদনে একই ঘটনার ফুটেজ পাওয়া যায়। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে এক বড় অভিযানে কর্তৃপক্ষ ১১ জুলাই সকালে দেশটির সম্ভাজিনগরের রেলস্টেশনের কাছে অবৈধভাবে নির্মিত একটি মাজার ও মসজিদের মতো স্থাপনা ভেঙে দিয়েছে।

অর্থাৎ, মুসলিমদের ওপর আক্রমণ হিসেবে এই ঘটনাটিও সত্য, তবে তা ২০২৫ সালের পুরোনো ফুটেজ।

তৃতীয় ছবি যাচাই

আমার দেশ প্রকাশিত তৃতীয় ছবিটি রিভার্স সার্চ করে ইন্ডিয়া টুডের ওয়েবসাইটে ২০২০ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারির এক প্রতিবেদনে একই ফুটেজ পাওয়া যায়। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সংশোধিত নাগরিকত্ব আইনকে কেন্দ্র করে উত্তর-পূর্ব দিল্লিতে সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে ২৪ ফেব্রুয়ারি এলাকাটি রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। এতে চারজন নিহত হন, যাদের মধ্যে একজন হেড কনস্টেবল ছিলেন। এছাড়াও বেশ কয়েকজন আধাসামরিক বাহিনী ও দিল্লি পুলিশের কর্মীসহ অন্তত ৫০ জন আহত হয়েছেন। এই ছবিটি সেদিন তোলা।

অর্থাৎ, ২০২০ সালের পুরোনো এই ফুটেজটি মুসলিমদের ওপর আক্রমণের ঘটনার নয়।

চতুর্থ ছবি যাচাই

আমার দেশ প্রকাশিত চতুর্থ ছবিটি রিভার্স সার্চ করে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস এর ওয়েবসাইটে ২০০৭ সালে ২১ এপ্রিলের এক প্রতিবেদনে একই ফুটেজ পাওয়া যায়। প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ফুটেজটি পারজানিয়া নামে একটি সিনেমার দৃশ্য।

অর্থাৎ, মুসলিমদের ওপর আক্রমণ হিসেবে প্রচার হলেও এই ফুটেজটি মূলত বাস্তব কোনো ঘটনারই নয়।

সুতরাং, আমার দেশ পত্রিকায় “ভারতীয় মুসলিমদের অসহনীয় জীবন” শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি বিভ্রান্তিকর।

তথ্যসূত্র

Share: