আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচকে ‘দিনের আলোতে ডাকাতি’ বলেননি মরিনহো, ভুয়া মন্তব্যে সয়লাব গণমাধ্যম

গত ৭ জুলাই ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ এর শেষ ষোলোর লড়াইয়ে মিশরকে ৩-২ গোলে হারিয়ে দেয় আর্জেন্টিনা। ম্যাচে ভিএআর হস্তক্ষেপে মিশরের একটি গোল বাতিল করা হয় এবং ম্যাচে রেফারির আরো কিছু সিদ্ধান্ত নিয়ে বিতর্কের শুরু হয়। এরই প্রেক্ষিতে সম্প্রতি গণমাধ্যমে দাবি প্রচার করা হয়েছে, পর্তুগিজ কোচ জোসে মরিনহো বলেছেন, ‘গোল হওয়ার পর সেটি বাতিল করা লজ্জাজনক, ফাউল হলে খেলা তখনই থামানো উচিত ছিল-গোল পর্যন্ত অপেক্ষা করা নয়, এটা ছিল দিনের আলোতে ‘ডাকাতি’”।
এছাড়াও, কতিপয় গণমাধ্যমে দাবি করা হয়, মরিনহো আরো বলেছেন, ‘এই আর্জেন্টিনা দলের বিপক্ষে ২-০ গোলে এগিয়ে থাকাও নিরাপদ নয়। কারণ প্রতিপক্ষ শুধু মাঠের ১১ জন খেলোয়াড় নয়। আপনাকে রেফারির বাঁশি, ভিডিও সহকারী রেফারির কক্ষ এবং পুরো একটি সাজানো চিত্রনাট্যের বিরুদ্ধেও লড়তে হয়।’

এরূপ দাবিতে গণমাধ্যমে প্রচারিত সংবাদ প্রতিবেদন: চ্যানেল২৪, বাংলাভিশন, মোহনা টিভি (ফেসবুক), মাছরাঙা টিভি (ফেসবুক), আরটিভি, এটিএন নিউজ (ফেসবুক), নাগরিক টিভি, খেলাযোগ (ফেসবুক), কালের কণ্ঠ, বাংলাদেশ প্রতিদিন, কালবেলা, যুগান্তর, দেশ রূপান্তর, ইত্তেফাক, আমার দেশ (ফেসবুক), নয়া দিগন্ত, সময়ের আলো (ফেসবুক), সময়ের কণ্ঠস্বর, এশিয়া পোস্ট (ইউটিউব), বাংলানিউজ২৪, বার্তা বাজার, এনপিবি নিউজ, প্রতিদিনের কাগজ, বিডি টুডে, বিডি২৪রিপোর্ট, টাইমস টুডে, নিউজনাউ২৪, প্রবাস খবর, দ্য ডেল্টা লেন্স, দ্য নিউজ২৪, দৈনিক করতোয়া, ভোরের পাতা, আমার বার্তা, প্রভাত নিউজ, লাতিন বাংলা (ফেসবুক), রেডিও পদ্মা নিউজ (ফেসবুক), এদিন, ম্যাজিক বাংলা টিভি, আজকালের খবর, দৈনিক বাংলা, ঐশী বাংলা, ডেইলি কুমিল্লা নিউজ, জাগো জনতা, সী স্পোর্টস (ইনস্টাগ্রাম)।
এছাড়াও, আলোচিত দাবিতে সংবাদ প্রচার করে পরবর্তীতে সরিয়ে নেওয়া গণমাধ্যম : একাত্তর, নিউজ২৪, আজকের পত্রিকা, বাংলাদেশ টাইমস, দ্য ডেইলি ক্যাম্পাস, ক্রিকফ্রেঞ্জি।

এরূপ দাবিতে গণমাধ্যমের ফেসবুক পেজে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে।
এরূপ দাবিতে গণমাধ্যমের ইউটিউব চ্যানেলে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে।
এরূপ দাবিতে টিকটকে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে।
ফ্যাক্টচেক
রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচকে ‘দিনের আলোতে ডাকাতি’ বলে কোনো মন্তব্য করেননি জোসে মরিনহো। প্রকৃতপক্ষে কোনোরকম নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রমাণ ছাড়াই একটি এক্স ও একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট থেকে আলোচিত ভুয়া দাবির সূত্রপাত হয়েছে।
এ বিষয়ে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত কতিপয় গণমাধ্যমের প্রতিবেদন পর্যবেক্ষণে তাতে দাবিটির সূত্র হিসেবে কাতার ভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ‘আল জাজিরা’র উল্লেখ পাওয়া যায়। এরই সূত্র ধরে অনুসন্ধানে ‘আল জাজিরা’র ওয়েবসাইটে গত ৭ জুলাইয়ে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ‘শোনা যাচ্ছে যে পর্তুগিজ ফুটবল তারকা হোসে মরিনহো এই ম্যাচটিকে ‘দিনের আলোয় ডাকাতি’ বলে আখ্যায়িত করেছেন।’ কিন্তু এ বিষয়ে ‘আল জাজিরা’র প্রতিবেদনে মরিনহো কোথায়, কবে এমন কথা বলেছেন তার সপক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রমাণ বা বিস্তারিত তথ্যের উল্লেখ পাওয়া যায়নি।
পরবর্তীতে আলোচিত দাবির সূত্রপাতের বিষয়ে অনুসন্ধানে ‘@MUFCDarren_’ ইউজারনেমের একটি এক্স অ্যাকাউন্টে গত ৭ জুলাই দিবাগত রাত ১২ টা ৭ মিনিটে ‘ডাকাতি’ শব্দ মরিনহোর হিসেবে ব্যবহার করে প্রচারিত প্রথম পোস্টটি পাওয়া যায়। পোস্টে দাবি করা হয় জোসে মরিনহো বলেছেন, ‘এটা দিনের আলোয় ডাকাতি। ফুটবল খেলাটা দিন দিন যে কী হয়ে যাচ্ছে, তা ভাবতেও লজ্জা লাগে। আপনি কীভাবে খেলা চালিয়ে যেতে দিতে পারেন, গোল হতে দিতে পারেন, আর তারপর একদম শেষে এসে সিদ্ধান্ত নেন যে পেছনে ফিরে গিয়ে গোলটা বাতিল করবেন? যদি ফাউল হয়েই থাকে, তবে খেলাটা তখনই থামিয়ে দিন। গোল হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবেন না।..’ (অনূদিত)
তবে এক্স পোস্টটিতে আলোচিত দাবির সপক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রমাণ সংযুক্ত করা হয়নি। মরিনহো এটি কখন, কোথায় বলেছেন তারও কোনো উল্লেখ করা হয়নি। অ্যাকাউন্টটির বায়ো পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় এটি ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড ক্লাবের ভক্তের একটি ফ্যান অ্যাকাউন্ট। এছাড়াও, পেজের বায়োতে ‘Satires’ও উল্লেখ করা হয়েছে। পাশাপাশি, পেজটি পর্যবেক্ষণে আরো নানা ব্যক্তির নামে ভুয়া উক্তি প্রচার হতে দেখা যায়।
এছাড়াও, অনুসন্ধানে ‘Alkass English’ নামের আরেকটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টেও মরিনহোর নামে গত ৮ জুলাইয়ে কাছাকাছি আরেকটি মন্তব্য প্রচার হতে দেখা যায়। দাবি করা হয়, মরিনহো বলেছেন, ‘আর্জেন্টিনার বিপক্ষে যখন আপনি খেলবেন, তখন ২-০ গোলের ব্যবধানে এগিয়ে থাকাও যথেষ্ট নয়। কারণ আপনি মাঠের শুধু ১১ জন খেলোয়াড়কে হারানোর চেষ্টা করছেন না— আপনাকে একই সাথে রেফারির বাঁশি, ভিএআর (VAR) এবং পুরো টুর্নামেন্ট যেভাবে চালানো হচ্ছে, তার বিরুদ্ধেও লড়াই করতে হচ্ছে।… এটা আর ফুটবল ম্যাচ ছিল না, এটা ছিল একটা সিনেমা, আর এর শেষটা কী হবে তা খেলোয়াড়রা মাঠের টানেল থেকে বের হওয়ার আগেই ঠিক করে রাখা হয়েছিল।’ (অনূদিত)
উক্ত ইনস্টাগ্রাম পোস্টটির দাবিও কতিপয় গণমাধ্যমে মরিনহোর বক্তব্য দাবিতে প্রচার করা হয়েছে। কিন্তু, উক্ত ইনস্টাগ্রাম পোস্টেও মরিনহো কোথায়, কবে এমন কথা বলেছেন তার সপক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রমাণ বা বিস্তারিত তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।
তাছাড়া, অনুসন্ধানে গত ৮ জুলাইয়ে মরিনহোর ছবি প্রোফাইল ছবিতে সংযুক্তিসহ ‘Mourinho coach’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকেও আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচের প্রেক্ষিতে ‘কেলেঙ্কারি’ ও ‘চুরি’ উল্লেখ করে মরিনহোর মন্তব্য দাবিতে প্রচার করা হয়েছে।

তবে, পেজটির ‘ট্রান্সপারেন্সি’ অংশ পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, পেজটি ২০২৩ সালের ২৫ এপ্রিলে মরিনহোর নামে তৈরি করা হয় এবং ২০২৩ সালের ২৫ এপ্রিলে ‘Yousef Abdullah Balideh’ নামে পেজটির নাম পরিবর্তন করা হয়৷ পরবর্তীতে গত ১৬ মে আবারও ‘Mourinho coach’ নাম দেওয়া হয়। পেজটি মূলত মিশর থেকে পরিচালনা করা হয়। অর্থাৎ, এ থেকে স্পষ্ট যে পেজটি মরিনহোর আসল ফেসবুক পেজ নয়। অনুসন্ধানে মরিনহোর কোনো আসল ফেসবুক পেজ পাওয়া যায়নি। মরিনহোর ভেরিফাইড ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্ট পর্যবেক্ষণেও আলোচিত দাবির সপক্ষে কোনো পোস্ট বা স্টোরি পাওয়া যায়নি।
পাশাপাশি, প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চ করলেও মরিনহোর এমন কোনো বক্তব্যের আসল ভিডিও পাওয়া যায়নি। মরিনহো কখন কোথায় এমন মন্তব্য করেছেন তারও কোনো হদিস পাওয়া যায়নি।
এদিকে আল জাজিরা পরবর্তীতে মরিনহোর উক্তি বলে প্রচারিত অংশ সরিয়ে নিয়েছে এবং প্রতিবেদনের শুরুতে একটি সংশোধনী সংযুক্ত করেছে। সংশোধনীতে বলা হয়, আরও গভীরভাবে যাচাই-বাছাই করার পর, আল জাজিরা সেই মন্তব্যগুলোর কোনো নির্ভরযোগ্য উৎস খুঁজে পায়নি, তাই সেগুলো প্রতিবেদন থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
অর্থাৎ, উপরোক্ত তথ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট যে মরিনহো এমন কোনো মন্তব্য করেননি।
সুতরাং, আর্জেন্টিনা-মিশর ম্যাচকে ‘দিনের আলোতে ডাকাতি’ বলেছেন মরিনহো শীর্ষক দাবিটি মিথ্যা।
তথ্যসূত্র
- Jose Mourinho – Instagram Account
- Rumor Scanner’s analysis

