‘বিশ্বকাপ শিরোপার টাকা ইসরায়েলি শিশুদের জন্য’ বলেননি আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট

গত ১১ জুন ফুটবল বিশ্বকাপের ২৩তম আসর শুরু হয়েছে, যা চলবে আগামী ১৯ জুলাই পর্যন্ত। ইতোমধ্যে প্রতিযোগিতার সেমিফাইনালে জায়গা করে নিয়েছে আর্জেন্টিনা।

এই প্রেক্ষাপটে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেইকে উদ্ধৃত করে একটি মন্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। দাবি করা হচ্ছে, তিনি বলেছেন, আর্জেন্টিনা এবারের বিশ্বকাপ জিতলে শিরোপার অর্থ ইসরায়েলি শিশুদের জন্য উৎসর্গ করা হবে।

উক্ত দাবিতে ফেসবুকে প্রচারিত পোস্ট দেখুন: এখানে, এখানে, এখানে, এখানে

একই দাবিতে অন্যান্য প্ল্যাটফর্মে প্রচারিত পোস্ট দেখুন: ইন্সটাগ্রাম, ইউটিউব, টিকটক। 

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, আলোচিত দাবিটি সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে, নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্যসূত্র ছাড়াই আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্টের নামে এই মন্তব্য প্রচার করা হয়েছে।

অনুসন্ধানে বিশ্বস্ত কোনো সূত্রে হাভিয়ের মিলেইর এমন কোনো মন্তব্যের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। প্রচারিত পোস্টগুলোতেও দাবিটির পক্ষে কোনো তথ্যসূত্র উল্লেখ করা হয়নি। বিশ্বকাপ ও ইসরায়েলকে জড়িয়ে আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট এমন মন্তব্য করলে তা স্বাভাবিকভাবেই আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোচিত হতো। তবে কোনো বিশ্বাসযোগ্য সংবাদমাধ্যমে এ-সংক্রান্ত তথ্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে আর্জেন্টিনাভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ইনফোবায়ে গত ৮ জুন প্রকাশিত এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সম্ভাব্য বিশ্বকাপ উদ্‌যাপনের জন্য আর্জেন্টিনা জাতীয় দলকে কাসা রোসাদা (দেশটির প্রেসিডেন্টের সরকারি কার্যালয়) ব্যবহারের প্রস্তাব দিয়েছেন হাভিয়ের মিলেই। তবে তিনি জানিয়েছেন, ওই অনুষ্ঠানে তিনি উপস্থিত থাকবেন না। মিলেইর ভাষ্য অনুযায়ী, সাফল্যের পুরো কৃতিত্ব খেলোয়াড়দের এবং উদ্‌যাপনটি রাজনৈতিক হস্তক্ষেপমুক্ত থাকা উচিত। এ জন্য প্রয়োজনে সরকারি কর্মকর্তাদেরও ভবন থেকে দূরে রাখা হবে, যাতে অনুষ্ঠানটি পুরোপুরি দল ও আর্জেন্টিনার জনগণের হয়।

এর আগে ২০২২ বিশ্বকাপ জয়ের পর আর্জেন্টিনা দল কাসা রোসাদায় উদ্‌যাপনের প্রস্তাব গ্রহণ করেনি। ধারণা করা হয়, তৎকালীন প্রেসিডেন্ট আলবার্তো ফার্নান্দেজ যাতে দলটির সাফল্যকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করতে না পারেন, সে কারণেই তারা ওই সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।

অন্যদিকে, ফিফা জানিয়েছে, ২০২৬ বিশ্বকাপ উপলক্ষে অংশগ্রহণকারী সদস্য ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনগুলোর মধ্যে মোট ৭২৭ মিলিয়ন ডলারের আর্থিক অবদান বিতরণ করা হবে। এর মধ্যে ৬৫৫ মিলিয়ন ডলার পুরস্কার অর্থ হিসেবে ৪৮টি অংশগ্রহণকারী দলের মধ্যে বণ্টিত হবে এবং চ্যাম্পিয়ন দল পাবে ৫০ মিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, আর্জেন্টিনা চ্যাম্পিয়ন হলে পুরস্কারের অর্থ দেশটির ফিফা-স্বীকৃত সদস্য সংস্থা আর্জেন্টাইন ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন বা এএফএর কাছে যাবে, দেশটির প্রেসিডেন্টের কাছে নয়।

প্রাসঙ্গিকভাবে, আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই ইসরায়েলের একজন জোরালো সমর্থক হিসেবে পরিচিত। তিনি একাধিকবার প্রকাশ্যে দেশটির প্রতি সমর্থন জানিয়েছেন। সম্প্রতি, জেরুজালেমে ১০ লাখ ডলারের ‘জেনেসিস প্রাইজ’ গ্রহণ করেছেন। ইসরায়েলের প্রতি তার জোরালো সমর্থনের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়। জেনেসিস প্রাইজ কর্তৃপক্ষ জানায়, পুরস্কারের অর্থ মিলেই এমন একটি উদ্যোগে দান করবেন, যার লক্ষ্য ইসরায়েলের সঙ্গে লাতিন আমেরিকার দেশগুলোর কূটনৈতিক সম্পর্ক জোরদার করা এবং ওই অঞ্চলে ইহুদিবিদ্বেষ মোকাবিলা করা।

বিশ্বকাপ চলাকালে এক পডকাস্টে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুও জানান, তিনি আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করছেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই সমর্থনের প্রধান কারণ লিওনেল মেসি নন; বরং হাভিয়ের মিলেই, যাকে তিনি ‘ইসরায়েলের একজন মহান বন্ধু’ হিসেবে উল্লেখ করেন।

তবে এসব তথ্যের কোনো সূত্রেই বিশ্বকাপের পুরস্কারের অর্থ ইসরায়েলি শিশুদের জন্য দান করার বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।

সুতরাং, আর্জেন্টিনা বিশ্বকাপ জিতলে শিরোপার অর্থ ইসরায়েলি শিশুদের জন্য উৎসর্গ করা হবে বলে হাভিয়ের মিলেইকে উদ্ধৃত করে প্রচারিত মন্তব্যটি ভুয়া ও বানোয়াট।

তথ্যসূত্র

Share: