আওয়ামী সমর্থিত অ্যাকাউন্ট থেকে জামায়াত, এনসিপি ও বিভিন্ন ব্যক্তিত্বকে নিয়ে ক্রমাগত বিকৃত ছবি প্রচার

সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নোয়াখালী-৬ আসনের সংসদ সদস্য এনসিপি নেতা আবদুল হান্নান মাসউদ এবং তার স্ত্রী ও জাতীয় ছাত্রশক্তির ঢাকা বিভাগের সাংগঠনিক সম্পাদক শ্যামলী সুলতানা জেদনীর একটি আপত্তিকর ছবি ব্যাপকভাবে প্রচারিত হতে দেখা যায়।
ছবিটির বিষয়ে অনুসন্ধানে রিউমর স্ক্যানার দেখতে পায়, এই দম্পতির স্বাভাবিক একটি ছবিকে ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় সম্পাদনার মাধ্যমে আপত্তিকর কনটেন্টে রূপান্তরিত করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে। প্রচারিত এই পোস্টগুলোতে ব্যবহৃত ছবিতে Syful Islam লেখা একটি ওয়াটার মার্ক দেখতে পাওয়া যায়। ওয়াটার মার্কটির সূত্র ধরে অনুসন্ধানে Mohammad Syful Islam নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্টের সন্ধান পায় রিউমর স্ক্যানার। অ্যাকাউন্টটিতে গত ১৬ এপ্রিল হান্নান মাসউদ এবং তার স্ত্রীর আলোচিত এই ছবিটি সর্বপ্রথম পোস্ট করতে দেখা যায়।
Mohammad Syful Islam নামের এই ফেসবুক অ্যাকাউন্টটি পর্যালোচনা করে বিভিন্ন রাজনৈতিক এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্বকে নিয়েও এই ধরনের আপত্তিকর ও ব্যঙ্গাত্মকমূলক অসংখ্য পোস্ট করতে দেখা যায়। এই প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়া পর্যন্ত উক্ত অ্যাকাউন্ট থেকে অন্তত ১৯৫টি ছবি পোস্ট করা হয়েছে। এর মধ্যে ৯৯টি বা প্রায় ৫০.৮ শতাংশ পোস্টই এই ধরনের আপত্তিকর বা ব্যঙ্গাত্মকমূলক পোস্ট; যা করা হয়েছে বিভিন্ন ব্যক্তিত্বকে টার্গেট করে।
উল্লিখিত পোস্টগুলো পর্যালোচনা করে দেখা যায়, জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান, সারজিস আলম, নাহিদ ইসলাম, হাসনাত আবদুল্লাহ, ড. মুহাম্মদ ইউনুস, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম, ডাকসু নেতা মোসাদ্দেকসহ বেশ অনেকেই এ ধরনের পোস্টের শিকার হয়েছে।
শুধু পুরুষ রাজনৈতিক বা আলোচিত ব্যক্তিত্বরাই এসব কনটেন্টের শিকার হয়েছেন এমনটিই নয়। এসব পোস্টের শিকার হয়েছেন এনসিপির আলোচিত নেত্রী ডা. মাহমুদা মিতু, তাহরিমা জান্নাত সুরভী, ডা. তাসনিম জারা, ঢাকসু নেত্রী ফাতিমা তাসনিম জুমা, হান্নান মাসউদের স্ত্রী জেদনী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষিকা শেহরীন আমিন ভূঁইয়া মোনামীসহ অনেকে। পোস্টগুলোকে লিঙ্গ এবং প্রকৃতির ভিত্তিতে পর্যালোচনা করে দেখেছে রিউমর স্ক্যানার।
ডিজিটাল বিকৃতির শিকার পুরুষ নেতা ও আলোচিত ব্যক্তিত্বরা
Mohammad Syful Islam নামের অ্যাকাউন্টটি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায় উক্ত অ্যাকাউন্টে প্রচারিত ৯৯টি পোস্টের মাঝে ৬৫টি কনটেন্টই পুরুষ রাজনীতিবিদ ও আলোচিত ব্যক্তিত্বকে টার্গেট করে প্রচার করা হয়েছে। এসব পোস্টগুলোতে মোট রিয়েকশন পড়েছে প্রায় ৬৭ হাজার। মন্তব্যের সংখ্যাও কম নয়, প্রায় ১৪ হাজার। এছাড়াও পোস্টগুলো সামাজিক মাধ্যমে ব্যাপকভাবে শেয়ারও করা হয়েছে। সম্মিলিতভাবে যার সংখ্যা প্রায় ১১ হাজার বার।
এসব কনটেন্টের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ভিন্ন ব্যক্তি বা নারীর ছবি ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় সম্পাদনার মাধ্যমে সেগুলোর সাথে এসব আলোচিত ব্যক্তিত্বের ফেস সোয়াপ করে অধিকাংশ কনটেন্ট তৈরি করা হয়েছে। সিংহভাগ ছবিতেই নারীর শরীরে এসব পুরুষ ব্যক্তিত্বের চেহারা জুড়ে দেওয়া হয়েছে।
কিছুক্ষেত্রে এআই জেনারেটেড ছবিতে ফেস সোয়াপ করে এ ধরনের কনটেন্ট তৈরি করতেও দেখা যায়। জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানকে নিয়ে তৈরিকৃত এমন একটি কনটেন্টের বিষয়ে অনুসন্ধানে দেখা যায়, এআই জেনারেটেড এক দম্পতির ছবি সম্পাদনার মাধ্যমে ছবিতে থাকা পুরুষের চেহারা পরিবর্তন করে সেখানে ডা. শফিকুর রহমানের চেহারা যুক্ত করে দেওয়া হয়েছে। এ ধরনের কিছু পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে। এসব পোস্ট থেকে এটি স্পষ্টত বোঝা যাচ্ছে, কনটেন্টগুলো ব্যঙ্গাত্মক প্রচারণার উদ্দেশ্যেই তৈরি করা হয়েছে।
অ্যাকাউন্টটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, অ্যাকাউন্টটি থেকে সর্বোচ্চ সংখ্যক এমন কনটেন্ট প্রচার করা হয় জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানকে নিয়ে। যার সংখ্যা ১৩টি। এরপর সারজিস আলমকে নিয়ে ৬টি, ডাকসুর সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয়ক সম্পাদক মোসাদ্দেক ইবনে আলী মোহাম্মদকে নিয়ে ৫টি, হাসনাত আবদুল্লাহকে নিয়ে ৩টি, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলমকে নিয়ে ২টি, ব্যারিস্টার এএসএম শাহরিয়ার কবিরকে নিয়ে ২টি কনটেন্ট প্রচার করা হয়েছে অ্যাকাউন্টটি থেকে। এছাড়াও নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া, সাদিক কায়েম, সালাহউদ্দিন আম্মার, ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাবেক উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, মোস্তফা সরয়ার ফারুকী এবং সংসদ সদস্য মুফতি আমির হামজাকে নিয়ে ১টি করে ব্যঙ্গাত্মক কনটেন্ট প্রচার করা হয়েছে।

পাশাপাশি বিভিন্ন আলোচিত ব্যক্তিত্বকে একত্রিত করে তৈরিকৃত কনটেন্টের সংখ্যাও অন্তত ২৬টি। এসব কনটেন্টগুলোতে এক বা একাধিক ব্যক্তিকে ব্যঙ্গাত্মকভাবে তুলে ধরা হয়েছে।
নারী ভিকটিমদের ক্ষেত্রে এডাল্ট কনটেন্টের প্রবণতা
নারী রাজনৈতিক ও আলোচিত নারী ব্যক্তিত্বরাও আলোচিত এই প্রোফাইলের নিয়মিত লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হচ্ছেন। অ্যাকাউন্টটি থেকে প্রচারিত এমন কনটেন্টের প্রায় ৩৪.৩ শতাংশ পোস্ট করা হয়েছে এসব নারী ব্যক্তিত্বকে টার্গেট করে। তবে পুরুষদের তুলনায় নারীদের টার্গেট করে প্রচার করা কনটেন্টগুলোতে ভিন্ন প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। নারীদেরকে টার্গেট করে প্রচারিত কনটেন্টগুলোর ক্ষেত্রে সার্কাজমের সীমা লঙ্ঘন করে এডাল্ট ছবি ছড়াতে দেখা যায়। কোনো পোস্টে আলোচিত পুরুষ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের সাথে আপত্তিকর অবস্থায়, আবার কোনোটিতে এডাল্ট পোশাকে এসব নারীদের তুলে ধরা হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে যা ব্যাপকহারে ছড়িয়ে পড়তেও দেখা যায়। যার ফলে তাদেরকে পড়তে হচ্ছে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে।
অ্যাকাউন্টটি থেকে নারীদের টার্গেট করে প্রচারিত এমন ৩৪টি কনটেন্ট শেয়ার করা হয়েছে অন্তত সাড়ে ৩ হাজারের বেশি বার। যাতে মন্তব্য পড়েছে প্রায় ৭ হাজারের বেশি এবং প্রতিক্রিয়া পড়েছে অন্তত ২৫ হাজার।
সর্বাধিক সংখ্যক এমন কনটেন্টের শিকার হয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও সহকারী প্রক্টর শেহরীন আমিন ভূঁইয়া মোনামী। তাকে ঘিরে অ্যাকাউন্টটি থেকে মোট ১১টি কনটেন্ট প্রচার করা হয়েছে। এরপর নারী হিসেবে সর্বোচ্চ আপত্তিকর কনটেন্টের শিকার হয়েছেন ঢাকসু নেত্রী ফাতিমা তাসনিম জুমা। যার সংখ্যা ৬টি। এছাড়াও হান্নান মাসউদের স্ত্রী ও ছাত্রশক্তি নেত্রী শ্যামলী সুলতানা জেদনী ৪টি, তাসনিম জারা ৪টি, ডা. মাহমুদা মিতু ৩টি, তাহরিমা জান্নাত সুরভী ৩টি, সামান্তা শারমিন ২টি এবং আরেক ডাকসু নেত্রী উম্মে উসওয়াতুন রাফিয়া ১টি আপত্তিকর কনটেন্টের শিকার হয়েছেন।

এসব কনটেন্টের ক্ষেত্রে দেখা যায়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এডাল্ট কনটেন্ট প্রচারকারী নারীদের ছবির সাথে উল্লিখিত নারী নেত্রী ও আলোচিত ব্যক্তিত্বদের ফেস সোয়াপ করে, আবার কখনো এআই দিয়ে তৈরি আপত্তিকর ছবি বা ভিডিওর স্ক্রিনশটের সাথে তাদের চেহারা সোয়াপ করে তৈরি করা হয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে তাদের স্বাভাবিক ছবিকে এআই প্রযুক্তির সহায়তায় সম্পাদনার মাধ্যমেও সেগুলোতে আপত্তিকর কনটেন্টে রূপান্তরিত করা হয়েছে। এমন কিছু কনটেন্ট দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে।
অর্থাৎ, উক্ত অ্যাকাউন্টটিতে প্রচারিত কনটেন্টগুলো পর্যালোচনার মাধ্যমে এটি স্পষ্টত বোঝা যাচ্ছে যে, পোস্টকারী ব্যক্তি আলোচিত পুরুষ ব্যক্তিত্বদের নিয়ে ব্যঙ্গাত্মক কনটেন্ট তৈরি করলেও নারীদের টার্গেট করে অশ্লীল কনটেন্ট তৈরি করে তা প্রচার করেন। যার সর্বাধিক শিকার হয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান ও ঢাবি শিক্ষিকা শেহরীন আমিন ভূঁইয়া মোনামী।
বিকৃত কনটেন্ট প্রচারের নেপথ্যে
Mohammad Syful Islam নামের এই অ্যাকাউন্টটি থেকে প্রচারিত কনটেন্টগুলোর প্রতিটিতেই Syful নামের ওয়াটার মার্কটি ব্যবহার করা হয়েছে। এছাড়াও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের ভিন্ন ভিন্ন অ্যাকাউন্ট বা পেজ থেকে প্রচারিত একই কনটেন্টগুলোতেও এই নামের ওয়াটার মার্ক দেখতে পাওয়া যায়। যা থেকে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে, Mohammad Syful Islam নামের এই অ্যাকাউন্ট পরিচালনাকারী-ই উল্লিখিত বিকৃত কনটেন্টগুলো তৈরি করেছেন এবং তার মাধ্যমে এসব কনটেন্টের প্রচার ও প্রসার ঘটেছে। তার করা পোস্টগুলোই পরবর্তীতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ছে।
উক্ত অ্যাকাউন্টটি পর্যালোচনার মাধ্যমে দেখা যায় পরিচিতি অংশে লেখা রয়েছে, ‘জয় বাংলার সৈনিকেরা আইডিটা ফলো করে পাশে থাকবা। আর রাজাকাররা ১০০ হাত ধরে থাকবি’। এছাড়াও অ্যাকাউন্টটি পর্যালোচনায় আওয়ামী লীগ সমর্থিত একাধিক পোস্টের সন্ধানও পাওয়া যায়। অর্থাৎ, প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রতীয়মান হয় যে, অ্যাকাউন্টটি আওয়ামী সমর্থিত কোনো ব্যক্তি দ্বারা পরিচালিত। যা থেকে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সাথে সম্পর্কিত এবং অন্যান্য আলোচিত ও রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বদের নিয়ে ক্রমাগতভাবে বিকৃত কনটেন্ট প্রচার করা হচ্ছে।

পাশাপাশি লক্ষ্য করা যায়, অ্যাকাউন্টটি ২০১৭ সালের ২১ নভেম্বর খোলা হলেও অ্যাকাউন্টটিতে বর্তমানে বিদ্যমান সবচেয়ে পুরোনো পোস্টটি ২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর প্রকাশিত, যা একটি নারীর ছবি। সে সময় অ্যাকাউন্টটির নাম ছিল Ratna Akter। পরবর্তীতে নাম বদলে বর্তমান নাম রাখা হয়। অ্যাকাউন্টটিতে উল্লিখিত সময় থেকে ২৪ ডিসেম্বর পর্যন্ত একজন নারীর ছবি প্রচার করা হয়। এরপরই সারজিস আলমের একটি বিকৃত ছবি প্রচার করা হয়। তারপর থেকে আলোচিত পোস্টগুলো করা শুরু হয়।
কাজের পদ্ধতি
এই প্রতিবেদনটি Mohammad Syful Islam নামের এই অ্যাকাউন্টটিতে ২০২৫ সালের ১৩ ডিসেম্বর থেকে ২০২৬ সালের ২৭ এপ্রিল পর্যন্ত প্রচারিত ছবিগুলোর ওপর ভিত্তি করে প্রকাশ করা হয়েছে। প্রতিবেদন প্রকাশের নিমিত্তে অ্যাকাউন্টটিতে উল্লিখিত সময়ে প্রচারিত তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে নথিভুক্ত করা হয়েছে। এরপর তথ্য-উপাত্তগুলো বিশ্লেষণ করা হয়েছে। পরবর্তীতে সেগুলোকে পোস্টার এবং লেখার মাধ্যমে উপস্থাপন করা হয়েছে।

