গতকাল ২৩ জুন ছিল রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারানোর পর দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম বর্তমানে নিষিদ্ধ থাকার ফলে রাজপথে প্রকাশ্যে পুরোদমে ফেরার সুযোগ নেই। এদিকে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে সরকারের পক্ষ থেকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরাপত্তা ও সতর্কতা জোরদার করা হয়েছিল। এরই মাঝে দিনটিকে ঘিরে ইন্টারনেটে ছড়িয়েছে গুজবের উত্তাপ। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আবহকে কেন্দ্র করে অন্তত ১৫টি এমন কনটেন্ট রিউমর স্ক্যানারের নজরে এসেছে, যেখানে পুরোনো বা ভিন্ন ঘটনার মূল প্রেক্ষাপট বিকৃত করে প্রচার করা হয়েছে।
অপতথ্যের উৎপাত প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আগে থেকেই
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আগের দিন গত ২২ জুন একটি বিক্ষোভের ভিডিও প্রচার করে দাবি করা হয়, ‘ঝিনাইদহে ঢেঁ’টা-ব’ল্ল’ম নিয়ে আওয়ামী লীগের ন’জি’রবি’হীন শোডাউন: প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে মাঠ দখলের র’ণপ্রস্তুতি’। কিন্তু অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভিডিওটি ২০২৪ সালের আগস্টে গোপালগঞ্জে বিক্ষোভের ভিডিও।

সেসময় সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পক্ষে গোপালগঞ্জের নানা এলাকায় বিক্ষোভ ও মিছিলের ঘটনা ঘটেছিল। পাশাপাশি, গত ২২ জুন বিকেলে ঝিনাইদহে পুলিশের বাঁধা উপেক্ষা করে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের বিক্ষোভ মিছিলের দৃশ্য দাবিতে আরেকটি ভিডিও প্রচার করা হয়েছে। ভিডিওটি অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘ফ্রিডম বাংলা নিউজ‘সহ একাধিক ফেসবুক পেজ/অ্যাকাউন্ট থেকে প্রচার করা হয়েছে।

তবে এ দাবিটিও সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে ভিডিওটি ২০২২ সালে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির একটি বিক্ষোভ মিছিলের পুরোনো ভিডিও।
প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর দিনে উত্তাপ বাড়ে অপতথ্যের
গত ২৩ জুন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আরেকটি ভিডিও প্রচার করা হয়েছে। ভিডিওতে ফরিদপুর-৪ আসনের সাবেক সাংসদ ও যুবলীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মজিবুর রহমান চৌধুরী ওরফে নিক্সন চৌধুরীসহ নানা আওয়ামী নেতাকর্মীদের মিছিল দিতে দেখা যায়। তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই ভিডিওটি অন্তত ২০২১ সাল থেকেই অনলাইনে বিদ্যমান রয়েছে। তাছাড়া, নিক্সন চৌধুরীকে সম্প্রতি প্রকাশ্যে কোথাও মিছিল করতে দেখা যায়নি। দেশিয় নানা গণমাধ্যম সূত্রে, তিনি আত্মগোপনে আছেন।

এছাড়াও, গত ২৩ জুন আরেকটি ভিডিও প্রচার করে দাবি করে হয়েছে, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে যশোরে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের মিছিলের দৃশ্য। তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, এই ভিডিওটি ২০২২ সালের মে মাসে যশোরে ছাত্রলীগের মিছিলের। সেসময় শেখ হাসিনাকে নিয়ে ছাত্রদল নেতার ‘কটুক্তি’ করার প্রতিবাদে যশোরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় প্রতিবাদ মিছিল ও বিক্ষোভ করে ছাত্রলীগ।

প্রসঙ্গত, যশোরে আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মিছিল দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটিতে প্রদর্শিত ব্যানারে থাকা লেখার অক্ষর বিকৃত অবস্থায় দেখা যায়। সাধারণত কোনো ভিডিওর রেজ্যুলেশন এআই এর সাহায্যে বাড়ালে এরূপ অসংগতি দেখা যায়।
পাশাপাশি, সেনাবাহিনীর সাথে বেশ কয়েকজন মানুষের মুখোমুখি অবস্থার একটি ভিডিও প্রচার করে দাবি করা হয়েছে, নিষেধাজ্ঞা, কারাবরণ, মামলা-হামলা দিয়েও আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদযাপন থামানো যায়নি। তবে, দাবিটি সঠিক নয়৷ প্রকৃতপক্ষে এটি রাঙামাটিতে গত মে মাসে ছাত্রদলের দুই গ্রুপের সংঘর্ষের ঘটনার দৃশ্য।

এছাড়াও, আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর ভিডিও দাবিতে হাতে বাঁশ লাঠি নিয়ে সড়কে বিক্ষোভের আরেকটি ভিডিও প্রচার করা হয়েছে। তবে এই ভিডিওটিও আওয়ামী লীগের নয়৷ গত বছরের সেপ্টেম্বরে ফরিদপুরের ভাঙ্গায় আসন পুনর্বিন্যাসের প্রতিবাদে এলাকাবাসীর বিক্ষোভের ভিডিওকে আ.লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর ভিডিও দাবিতে প্রচার করা হয়েছে।

গত ২৩ জুনে আরেকটি মিছিলের ভিডিও প্রচার করে ক্যাপশনে লেখা হয়েছে, ‘ভয় করে আওয়ামিলীগ করা যায় না, আওয়ামিলীগ আন্দোলন সংগ্রামে চ্যাম্পিয়ন!’। ভিডিওটিও প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আবহের মধ্যেই প্রচার করা হয়েছে। তবে এই ভিডিওটিও সাম্প্রতিক সময়ের নয়৷ ২০১৮ সালের ১১ ফেব্রুয়ারিতে ফেনী জেলা ছাত্রলীগের মিছিল দাবিতে ২০১৮ সালেই অনলাইনে ভিডিওটি পাওয়া যায়।

এছাড়াও, আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী ঘিরে গোপালগঞ্জে উত্তেজনা দাবিতে আরেকটি বিক্ষোভের ভিডিও সংবাদমাধ্যম ‘নাগরিক প্রতিদিন’ গত ২৩ জুন তাদের ফেসবুক পেজে পোস্ট করেছে। তবে প্রকৃতপক্ষে এই ভিডিও-ও পুরোনো। ২০২৪ সালের ১০ আগস্টে গোপালগঞ্জে আ.লীগ নেতাকর্মীদের বিক্ষোভের দৃশ্য এটি।

একই ধারাবাহিকতায় গাছের সাথে বেঁধে এক যুবককে মারধরের ভিডিও প্রচার করে দাবি করা হয়েছে, ‘আওয়ামিলীগের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী পালন করায় যুবকের উপর ছাত্রদলের নির্মম হামলার দৃশ্য’। তবে অনুসন্ধানে জানা যায়, ভিডিওটি প্রকৃতপক্ষে গত ১০ এপ্রিল রাজশাহী মহানগরীর কাজলা এলাকায় চুরির অভিযোগে এক যুবককে মারধরের ভিডিও।

এছাড়াও, এক যুবককে পুলিশের ধাওয়ার একটি ভিডিও প্রচার করে দাবি করা হয়েছে, ভিডিওটি আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর। তবে প্রকৃতপক্ষে ভিডিওটি গত বছরের ১৭ নভেম্বরে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের ধ্বংসাবশেষ গুড়িয়ে দিতে গিয়ে এক যুবকের পুলিশের ধাওয়ার শিকারের দৃশ্যের।

অপতথ্যের পালে হাওয়া দিয়েছে এআই কনটেন্ট
গত ২২ জুন ছাত্রলীগের বিক্ষোভ মিছিল ও স্লোগানের ঢাকার রাজপথ মুখরিত দাবিতে চারটি মিছিলের ছবির সমন্বয়ে তৈরি একটি কোলাজ ছবি প্রচার করা হয়েছে। এছাড়াও, প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে শেখ হাসিনা কেক কাটছেন দাবিতেও আরেকটি ছবি গত ২৩ জুনে প্রচার করা হয়েছে। তবে এগুলোর মধ্যে কোনো ছবিই আসল নয়। প্রকৃতপক্ষে ছবিগুলো কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই এর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি করা হয়েছে।

পাশাপাশি, আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে নোয়াখালীতে সাধারণ জনগণের মশাল মিছিল দাবিতে গত ২৩ জুনে আরো তিনটি ছবি প্রচার করা হয়েছে। এসব ছবিগুলোও এআই নির্মিত। গুগলের এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই ছবি তিনটি তৈরি করা হয়েছে।
অপতথ্যের স্রোতে বাদ যায়নি গণমাধ্যমের নামে ফটোকার্ড প্রচার
গত ২২ জুন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মূলধারার গণমাধ্যম ‘কালের কণ্ঠ’ এর ফটোকার্ড দাবিতে একটি ফটোকার্ড প্রচার করা হয়েছে। কথিত ফটোকার্ডটিতে দাবি করা হয়েছে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘ইতিহাস স্বাক্ষী আজরাইল সময় দিলেও আওয়ামী লীগ সময় দেয় না, তাই আমাদের নিজেদের শাউয়া এবং পু/ট/কি নিরাপদ রাখতেই সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।’

প্রকৃতপক্ষে সালাহউদ্দিন আহমেদ এরূপ কোনো মন্তব্য করেননি এবং কালের কণ্ঠও এরূপ কোনো ফটোকার্ড প্রকাশ করেনি। কালের কণ্ঠের ভিন্ন একটি ফটোকার্ড সম্পাদনা করে আলোচিত ফটোকার্ড তৈরি করা হয়েছে।
অপতথ্যে রঙ যুক্ত করেছে ব্যঙ্গাত্মক কনটেন্ট
গত ২২ জুন বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় সভাপতি নূরুল ইসলাম সাদ্দামের ছবি সংযুক্ত করে তৈরি এক ফটোকার্ড প্রচার করে দাবি করা হয়েছে নূরুল ইসলাম সাদ্দাম বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর কর্মসূচিতে ছাত্রশিবির কোনো বাধা দেবে না। জামায়াতের সঙ্গে বেঈমানির শাস্তি বিএনপির প্রাপ্য।’

তবে নূরুল ইসলাম সাদ্দাম এমন কোনো মন্তব্য করেননি। এক্ষেত্রে, ‘Pinaki Elias National Institute of Sources – PENIS’ নামক একটি স্যাটায়ার পেজের ব্যঙ্গাত্মক পোস্ট থেকে সূত্রপাত হওয়া পোস্টকে আসল খবর দাবিতে প্রচার করা হয়েছে।
তবে কেবল নূরুল ইসলাম সাদ্দামই নন। আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে ব্যাঙ্গাত্মক কনটেন্টের টার্গেট হয়েছে পুলিশ-সেনাবাহিনীও। এ বিষয়ে ইতোমধ্যে একটি ফ্যাক্টস্টোরি প্রকাশ করেছে রিউমর স্ক্যানার টিম।
সার্বিক পর্যালোচনায় এটি স্পষ্ট যে, নিষিদ্ধ ঘোষিত দল বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের ৭৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত এরূপ বিভ্রান্তিকর, এআই তৈরি ও সম্পাদিত কনটেন্ট ছড়ানোর পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট মহলের সম্পৃক্ততা রয়েছে। অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এ ধরনের অপপ্রচার ও তথ্য বিকৃতির সঙ্গে জড়িত মূল প্রচারকারীরা প্রায় সকলেই আওয়ামী লীগ সমর্থক। অপতথ্য প্রচারের এরূপ সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টা মূলত ক্ষমতা হারানোর পর দলটির সমর্থকদের নিজেদের সক্ষম, শক্তিশালী ও দৃঢ় প্রমাণ করার চেষ্টার অনলাইন সংস্করণ। তবে এ ঘটনায় একইসাথে কিছু আওয়ামী বিরোধী পেজ/অ্যাকাউন্ট থেকেও অপতথ্য প্রচার লক্ষ্য করা গেছে৷ এক্ষেত্রে মূলত আওয়ামী লীগকে নিয়ে উপহাসের চেষ্টাই ছিল মূখ্য।


