বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান শীর্ষক প্রচারিত ব্যানারটির সত্যতা কতটুকু?

সম্প্রতি, বেশ কয়েকটি সূচকে বিশ্ব এবং এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থানের একটি পরিসংখ্যান উল্লেখ করে ”সোনার বাংলাদেশ শ্মশান কেন?” শীর্ষক শিরোনামে একটি ডিজিটাল ব্যানার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে প্রচার করা হচ্ছে।

ফেসবুকে প্রচারিত এমন কিছু পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে। পোস্টগুলোর আর্কাইভ ভার্সন দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রচারিত ডিজিটাল ব্যানারটিতে উল্লেখিত অধিকাংশ দাবিই সত্য নয় এবং উক্ত ব্যানারে ধীরগতির মোবাইল ইন্টারনেটে বাংলাদেশের অবস্থান সম্পর্কিত তথ্যটি বিভ্রান্তিকর। এছাড়া বায়ু দূষণ ও বাল্যবিবাহের তালিকায় বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান উপস্থাপন সম্পর্কিত তথ্যগুলো সত্য।

প্রথম দাবি যাচাই

আলোচিত ডিজিটাল ব্যানারটিতে উল্লেখ করা হয়েছে, বাংলাদেশে চালের দাম ভারত ও পাকিস্তানের চেয়ে বেশি এবং বর্তমান বাংলাদেশে চালের দাম বিশ্বে সর্বোচ্চ।

তবে অনুসন্ধানে জানা যায়, বর্তমানে বাংলাদেশে চালের দাম পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত ও পাকিস্তানের তুলনায় বেশি হলেও বিশ্বে সর্বোচ্চ নয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের পণ্যের দাম নিয়ে তথ্য সরবরাহ সংক্রান্ত ওয়েবসাইট ‘globalproductprices’ এ ৯২ দেশের চালের দাম নিয়ে গত মার্চ মাসে প্রকাশিত সর্বশেষ রিপোর্ট অনুযায়ী বর্তমানে জাপানে চালের দাম বিশ্বে সর্বোচ্চ এবং বাংলাদেশ চালের দামের দিক দিয়ে বিশ্বে ৮৭ তম। ভারত ও পাকিস্তান যথাক্রমে ৯০ ও ৯১ তম।

উল্লিখিত দেশগুলোর বর্তমানে চালের দামের তালিকা-

  • জাপান- ৪.৭৬ ডলার
  • বাংলাদেশ- ০.৮১ ডলার
  • ভারত- ০.৭০ ডলার
  • পাকিস্তান- ০.৬৮ ডলার

বর্তমানে বাংলাদেশে চালের দামে বিশ্বে সর্বোচ্চ দাবিতে প্রচারিত তথ্যটির সূত্রপাত যাচাই করতে গিয়ে, কি ওয়ার্ড সার্চের মাধ্যমে দেশীয় মূলধারার সংবাদমাধ্যম দৈনিক প্রথম আলোর অনলাইন সংস্করণে ২০২১ সালের ১৪ জুলাই “বাংলাদেশেই চালের দাম এখন সর্বোচ্চ” শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়।

তবে প্রথম আলোর উক্ত প্রতিবেদনটি সারা বিশ্বের চালের বাজারের ওপর চালানো পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে নয় বরং এটি বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ড এই পাঁচটি দেশের চালের দাম নিয়ে তৈরি পরিসংখ্যান। যা প্রতিবেদনটির বিস্তারিত অংশে উল্লেখ আছে।

দ্বিতীয় দাবি যাচাই

প্রচারিত ডিজিটাল ব্যানারটির দাবি অনুযায়ী, বর্তমানে বায়ু দূষণে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম।

উক্ত দাবিটির সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে জানা যায়, বর্তমানে বায়ুদূষণে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম শীর্ষক দাবিটি সত্য। সর্বশেষ, বিশ্ব বায়ুর মান নিয়ে সুইজারল্যান্ডের দূষণ প্রযুক্তি সংস্থা আইকিউএয়ার সমীক্ষা অনুযায়ী বিশ্বে বর্তমানে বায়ু দূষণে বাংলাদেশের অবস্থান প্রথম।

তৃতীয় দাবি যাচাই

আলোচিত ব্যানারটিতে উল্লিখিত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মান এশিয়াতে সর্বনিম্ন এবং বিশ্বে ১৩৮টি দেশের মধ্যে ১২২তম।

উক্ত দাবিটির সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে জানা যায়, বর্তমানে বিশ্বে ১৩৮ টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের শিক্ষার মান ১২২ তম নয় এবং বাংলাদেশের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার মানও এশিয়াতে সর্বনিম্ন নয়। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচী (ইউএনডিপি) কর্তৃক বৈশ্বিক জ্ঞান সূচক নিয়ে সর্বশেষ প্রকাশিত(২০২১) সমীক্ষা অনুযায়ী বর্তমানে বিশ্বে বাংলাদেশের শিক্ষার মান ১২০ তম এবং এশিয়ার মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে আফগানিস্তান, দেশটির অবস্থান ১৫১তম।

প্রসঙ্গত, ২০২০ সালে প্রকাশিত বৈশ্বিক জ্ঞান সূচক তালিকায় বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ছিলো ১১২তম এবং দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ছিলো সর্বনিম্ন। তবে এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে সর্বনিম্ন অবস্থানে ছিলো মিয়ানমার (১২৮তম)

উল্লেখ্য, পূর্বেও বাংলাদেশে শিক্ষার মান এশিয়ায় সর্বনিম্ন দাবিতে ফেসবুকে প্রচারিত তথ্যকে মিথ্যা হিসেবে শনাক্ত করে ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে রিউমর স্ক্যানার।

এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের শিক্ষার মান সর্বনিম্ন হওয়ার দাবিটি মিথ্যা

চতুর্থ দাবি যাচাই

আলোচিত ডিজিটাল ব্যানারটিতে প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, টাকা পাচারে বর্তমানে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়।

উল্লিখিত দাবিটির সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে জানা যায়, বর্তমানে বিশ্বে টাকা পাচারে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয় নয় বরং দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে ভুটান। দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। সর্বশেষ প্রকাশিত বাসেল এন্টি মানি লন্ডারিং ইনডেক্স-২০২১ অনুযায়ী অর্থ পাচারে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ৩৩ তম। দক্ষিণ এশিয়ার দেশ শ্রীলঙ্কা, ভুটান ও পাকিস্তানের অবস্থান যথাক্রমে ১৮, ২১ এবং ২৮ তম।

বাসেল এন্টি মানি লন্ডারিং ইনডেক্স-২০২১ অনুযায়ী অর্থ পাচারে ওপরে উল্লেখিত দেশগুলোর স্কোর-

  • শ্রীলঙ্কা- ৬.৫১
  • ভুটান- ৬.২৪
  • পাকিস্তান – ৬
  • বাংলাদেশ- ৫.৮৪

পঞ্চম তথ্য যাচাই

আলোচিত ডিজিটাল ব্যানারটিতে প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ধনী-দরিদ্রের ব্যবধান বৃদ্ধির তালিকায় বাংলাদেশ বিশ্বে প্রথম।

উল্লিখিত দাবিটির সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে জানা যায়, ধনী-দরিদ্র বৈষম্য বৃদ্ধির তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে প্রথম নয়। এমনকি এই তালিকায় শীর্ষ ১০ এর মধ্যেও বাংলাদেশের নাম নেই। ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ এর ওয়েবসাইটে সর্বশেষ ২০২২ সালে প্রকাশিত ধনী দরিদ্রের বৈষম্য বৃদ্ধির তালিকা অনুযায়ী শীর্ষ দেশ দক্ষিণ আফ্রিকা।

এই সূচক অনুযায়ী ওপরে উল্লিখিত দেশগুলোর স্কোর-

  • দক্ষিণ আফ্রিকা- ৬৩
  • শ্রীলঙ্কা- ৩৯.৩
  • ভুটান- ৩৭.৪
  • ভারত- ৩৫.৭
  • নেপাল- ৩২.৮
  • বাংলাদেশ- ৩২.৪

ষষ্ঠ তথ্য যাচাই

আলোচিত ডিজিটাল ব্যানারটিতে প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে বিশ্বে বাল্য বিবাহের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়।

উক্ত দাবিটির সত্যতা যাচাইয়ের করতে গিয়ে জানা যায়, বর্তমানে বিশ্বে বাল্য বিবাহের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয় শীর্ষক তথ্যটি সঠিক।

বিভিন্ন সূচকের তথ্য প্রদানকারী পরিসংখ্যানভিত্তিক ওয়েবসাইট ‘Statista’ এ সর্বশেষ ২০২১ সালে প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী বর্তমানে বিশ্বে বাল্যবিবাহের তালিকায় বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। নাইজার এবং চাদের অবস্থান যথাক্রমে প্রথম ও দ্বিতীয়।

[image: Statistic: Countries with the highest child marriage rate as of 2021 | Statista]
Find more statistics at Statista

ওপরে উল্লিখিত দেশসমূহে ১৮ বছরের কম বয়সী শিশুদের বিবাহের হার-

  • নাইজার- ৭৫%
  • চাদ- ৬৮%
  • বাংলাদেশ- ৬৬%

সপ্তম তথ্য যাচাই

আলোচিত ডিজিটাল ব্যানারটিতে প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ধীরগতির ইন্টারনেটে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়।

উক্ত দাবিটির সত্যতা যাচাই করতে গিয়ে জানা যায়, ধীরগতির মোবাইল/ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয় নয়।

ইন্টারনেট স্পিড যাচাইকারি প্রতিষ্ঠান ‘ওকলা’র ওয়েবসাইটে সর্বশেষ (ফেব্রুয়ারি-২০২২) প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী মোবাইল ইন্টারনেট গতিতে বিশ্বের ১৩৮ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১২৯ তম, ধীরগতির দিক দিয়ে যা বিশ্বে ১০ম এবং ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট গতিতে বাংলাদেশের অবস্থান ১৮০ টি দেশের মধ্যে ৯৮, ধীরগতির দিক দিয়ে যা ৮৩তম অবস্থানে রয়েছে।

সূচকে

তবে ২০২১ সালের জুলাই এবং সেপ্টেম্বরে একই প্রতিষ্ঠান কর্তৃক প্রকাশিত তালিকা অনুযায়ী ধীরগতির মোবাইল ইন্টারনেট গতিতে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান ছিলো যথাক্রমে তৃতীয় এবং চতুর্থ। (নিম্নগতি বলতে তালিকায় শেষ দিক থেকে অবস্থান বোঝানো হয়েছে)

বর্তমানে ধীরগতির মোবাইল ইন্টারনেটে বিশ্বে প্রথম অবস্থানে রয়েছে ফিলিস্তিন। আর ধীরগতির ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটে বর্তমানে বিশ্বে প্রথম অবস্থান রয়েছে আফগানিস্তান।

Also Read: বাংলাদেশ কি দক্ষিন এশিয়ায় প্রথম শতভাগ বিদ্যুতায়নের দেশ?

অনুসন্ধানে দেখা যায়, কোনোপ্রকার নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র ছাড়াই “রাষ্ট্র সংস্কার আন্দোলন” নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে কয়েকটি সূচকে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থানের পরিসংখ্যান সম্পর্কিত একটি ডিজিটাল ব্যানার প্রচারের তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। তবে বর্তমানে পেজটিতে ঐ ব্যানারের অস্তিত্ব না থাকলেও একই তথ্য সম্বলিত ভিন্ন ডিজাইনের একটি ব্যানার সেখানে খুঁজে পাওয়া যায়।

রিউমর স্ক্যানার টিমের বিস্তর অনুসন্ধানে দেখা যায়, আলোচিত ব্যানারে উল্লিখিত ৭টি দাবির মধ্যে ৪টি দাবি মিথ্যা, ১টি দাবি বিভ্রান্তিকর এবং ২টি দাবি সত্য।

সুতরাং, বিশ্বে বিভিন্ন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থানের তথ্য উল্লেখ করে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে প্রচারিত ডিজিটাল ব্যানারটি বিভ্রান্তিকর।

[su_box title=”True or False” box_color=”#f30404″ radius=”0″]

  • Claim Review: সোনার বাংলাদেশ শ্মশান কেন?
  • Claimed By: Facebook Posts
  • Fact Check: Misleading

[/su_box]

তথ্যসূত্র

Share: