বাংলাদেশ বিমান কর্তৃক বিনা পয়সায় প্রবাসীদের মরদেহ দেশে ফেরত আনার দাবি সঠিক নয়

গত ৪ ফেব্রুয়ারি আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ঘোষিত ‘জনতার ইশতেহার’-এ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান নির্বাচনী অঙ্গীকার হিসেবে বলেন, বিদেশে কর্মরত কোনো প্রবাসী বাংলাদেশি ইন্তেকাল করলে রাষ্ট্রীয় খরচে ও পূর্ণ মর্যাদায় তার মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনা হবে।
এই প্রেক্ষাপটে ‘বাংলাদেশ বিমান অনেক বছর ধরে বিনা পয়সায় প্রবাসীদের মরদেহ দেশে ফেরত আনছে’ বলে একটি দাবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

উক্ত দাবিতে ফেসবুকে প্রচারিত কিছু পোস্ট দেখুন: এখানে, এখানে, এখানে, এখানে, এখানে।
একই দাবিতে ইন্সটাগ্রামে প্রচারিত পোস্ট দেখুন: এখানে।
ফ্যাক্টচেক
রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, বাংলাদেশ বিমান প্রবাসীদের মরদেহ বিনা পয়সায় দেশে ফেরত আনে দাবিতে প্রচারিত তথ্যটি সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে, আগে বাংলাদেশ বিমান এই সেবা দিলেও ২০২০ সাল থেকে তা বন্ধ রয়েছে।
এ বিষয়ে অনুসন্ধানে ২০২০ সালের ২৮ নভেম্বর প্রথম আলোতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে সংশ্লিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, আগে প্রবাসী কর্মীদের মরদেহ বিনা পয়সায় পরিবহন করত বাংলাদেশ বিমান। তবে ২০২০ সাল থেকে এ সেবা বন্ধ করা হয় বলে প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় ও ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড নিশ্চিত করে।
তৎকালীন বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোকাব্বির হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, বছরে কয়েক শ মরদেহ পরিবহন করতে গিয়ে বিমানের কোটি কোটি টাকা লোকসান হতো। একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে ঋণ নিয়ে বিনা পয়সায় এ ধরনের সেবা দেওয়া সম্ভব নয়। তার মতে, এটি প্রবাসী মন্ত্রণালয় ও কল্যাণ বোর্ডের দায়িত্ব এবং প্রবাসীদের জমানো অর্থ তাদের নিজস্ব তহবিলে রয়েছে।
একই বিষয়ে ২০২০ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর জাগোনিউজ২৪-এ প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, আগে প্রবাসে কোনো বাংলাদেশি মারা গেলে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স বিনা খরচে মরদেহ দেশে পাঠাত। তবে ২০২০ সাল থেকে এ সেবা বন্ধ হওয়ায় পরিবারের খরচেই মরদেহ দেশে আনতে হচ্ছে।
এছাড়া মধ্যপ্রাচ্য হয়ে বাংলাদেশে ফ্লাইট পরিচালনা করে এমন তিনটি বিদেশি এয়ারলাইন্সের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জাগো নিউজ জানায়, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে একজন ব্যক্তির মরদেহের কফিন পরিবহনের ক্ষেত্রে তারা প্রতি কেজি ১৮ ডলার বা বাংলাদেশি প্রায় ১ হাজার ৫৩০ টাকা ভাড়া নেয়। এতে মরদেহ ও কফিনের সম্মিলিত ওজন অনুযায়ী মোট খরচ পড়ে আনুমানিক ২ লাখ ৩০ হাজার থেকে আড়াই লাখ টাকা।অন্যদিকে, ২০২৫ সালের ২৪ জানুয়ারি ডেইলি স্টারের এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ওয়েজ আর্নার্স ওয়েলফেয়ার বোর্ড প্রবাসী কর্মীদের মৃত্যুর পর দাফন ও পরিবহন খরচ বাবদ প্রতি মরদেহে ৩৫ হাজার টাকা সহায়তা দেয়। পাশাপাশি ক্ষতিপূরণ হিসেবে প্রতিটি মৃত্যুর জন্য ৩ লাখ টাকা প্রদান করা হয়। একই তথ্য ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের ওয়েবসাইটেও পাওয়া যায়।
রিউমর স্ক্যানারের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের সহকারী পরিচালক মো. হাফিজুর রহমান জানান, বাংলাদেশ বিমান বিনা পয়সায় প্রবাসীদের মরদেহ দেশে আনে এমন তথ্য সত্য নয়। সাধারণত মরদেহ দেশে আনার খরচ পরিবারের সদস্য বা নিয়োগকর্তা বহন করে। আবেদন করলে যাচাই-বাছাই শেষে বোর্ড বিশেষ ক্ষেত্রে সহায়তা দেয়।
কাতারের দোহায় অবস্থিত বাংলাদেশের দূতাবাসের ওয়েবসাইটের একটি নিবন্ধে বলা হয়েছে, সংশ্লিষ্ট কোম্পানি বা নিয়োগকর্তা মরদেহ দেশে ফেরত আনার সব খরচ বহন করে এবং পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। এ জন্য আগে দূতাবাস থেকে অনাপত্তিপত্র সংগ্রহ করতে হয়। তবে ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিতে মৃত ব্যক্তির স্বজন, প্রবাসী কমিউনিটি বা ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ডের সহায়তায় দূতাবাস নিজেই মরদেহ প্রত্যাবাসনের দায়িত্ব নেয়।
সুতরাং, বাংলাদেশ বিমান প্রবাসীদের মরদেহ বিনা পয়সায় দেশে ফেরত আনে বলে প্রচারিত দাবিটি বিভ্রান্তিকর।
তথ্যসূত্র
- Prothom Alo: পরিবারের শেষ ভালোবাসাটুকুও জুটছে না
- Jagonews24: বিনা খরচে মরদেহ আনা বন্ধ বিমানের, ‘মুখে কুলুপ’ প্রবাসীকল্যাণের
- Daily Star: গত বছর রেকর্ড ৪৮১৩ প্রবাসী কর্মীর মরদেহ দেশে এসেছে
ওয়েজ আর্নার্স কল্যাণ বোর্ড: মৃতদেহ পরিবহন ও দাফন খরচ - Embassy of the People’s Republic of Bangladesh, Doha, Qatar: Dead body Repatriation
- Statement from Hafizur Rahman, Assistant Director, Wage Earners’ Welfare Board

