গাজীপুরে তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এক হোটেল ব্যবসায়ীকে পিটিয়ে হত্যার ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক আঙ্গিকে অপপ্রচার 

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও ভারতীয় গণমাধ্যমে দাবি প্রচার করা হয়েছে, ‘দোকা‌নে ঠাকু‌র দেবতার ছ‌বি থাকলে দোকা‌নের খাবার ও মি‌ষ্টি হালাল হ‌বে না” ব‌লে পি‌টি‌য়ে খু/ন মি‌ষ্টি ব‌্যবসায়ী‌কে। উগ্র ইসলামপন্থী‌ বাবা-মা-‌ছে‌লের হা‌তে আবারও হিন্দু হ/ত‌্যা বাংলা‌দে‌শে’।

এরূপ দাবিতে ফেসবুকে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।

দেবতার ছবি রাখাকে কেন্দ্র করে সহিংসতা দাবিতে ভারতীয় গণমাধ্যমে প্রচারিত প্রতিবেদন: এই সময়

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, গাজীপুরে ‘দোকা‌নে ঠাকু‌র দেবতার ছ‌বি রাখাকে কেন্দ্র করে হিন্দু ব্যবসায়ী লিটন চন্দ্র ঘোষ ওরফে কালিকে হত্যা করা হয়েছে’ শীর্ষক দাবি সঠিক নয়।। প্রকৃতপক্ষে, কলার ছড়ি চুরির মত তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আকস্মিক উত্তেজনা বশতঃ মারামারির ঘটনা ঘটে এবং তাতে লিটন চন্দ্র মারা যান। এতে সাম্প্রদায়িক সহিংসতার কোনো বিষয় নেই।

এ বিষয়ে অনুসন্ধানে মূলধারার গণমাধ্যম ‘দ্য ডেইলি স্টার’ এর ওয়েবসাইটে গত ১৭ জানুয়ারিতে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। ‘দ্য ডেইলি স্টার’ এর প্রতিবেদনে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত পোস্ট ও প্রতিবেদনে সংযুক্ত নিহত ব্যক্তির ছবিরও সংযুক্তি পাওয়া যায়।

এ বিষয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজীপুরের কালীগঞ্জ উপজেলায় ‘তুচ্ছ ঘটনা’কে কেন্দ্র করে গত ১৭ জানুয়ারিতে লিটন চন্দ্র ঘোষ (৫৫) নামে এক হোটেল ব্যবসায়ীকে পিটিয়ে হত্যার অভিযোগ উঠেছে। কালীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জাকির হোসেনের বরাতে প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘অভিযুক্তদের কলাবাগান থেকে একটি কলার ছড়ি হারিয়ে যাওয়ার পর তারা সেটা ব্যবসায়ী লিটন চন্দ্র ঘোষের দোকানে খুঁজে পান বলে দাবি করেন। এ নিয়ে উভয়পক্ষের মধ্যে কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে লিটনকে মারধর করলে তিনি মাটিতে লুটিয়ে পড়েন এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়।’

এছাড়াও, প্রতিবেদনে নিহতের পরিবারের বরাতে বলা হয়, ‘আজ (১৭ জানুয়ারি) সকাল ১১টার দিকে মাসুম হোটেলে আসেন। এ সময় তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে হোটেল কর্মী অনন্ত দাশের সঙ্গে তার কথা কাটাকাটি হয় এবং একপর্যায়ে তা হাতাহাতি শুরু হয়। পরে স্বপন ও মাজেদা ঘটনাস্থলে এসে মারামারিতে জড়িয়ে পড়েন। পরিস্থিতি শান্ত করতে লিটন এগিয়ে এলে তাকেও মারধর করা হয়। একপর্যায়ে বেলচা দিয়ে তার মাথায় আঘাত করা হলে তিনি ঘটনাস্থলেই মারা যান।’

একইরকম তথ্য আরো একাধিক মূলধারার গণমাধ্যম সূত্রেও জানা যায়। কোথাও সাম্প্রদায়িক সহিংসতা বিষয়ক কোনো উল্লেখ পাওয়া যায়নি।

এছাড়াও, এ বিষয়ে গাজীপুর পুলিশ সুপারের ফেসবুক পেজের এক পোস্টে ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত উল্লেখ পাওয়া যায়। পোস্টে বলা হয়, ‘..গত ১৭/০১/২০১৬খ্রিঃ তারিখ সকাল অনুমান ১১:৪৫ ঘটিকার সময় কালীগঞ্জ থানার ডিউটি অফিসার জানতে পারেন যে, কালীগঞ্জ থানাধীন বালীগাঁও সাকিনস্থ বিসমিল্লাহ্ ডায়াগনস্টিক সেন্টার এর পশ্চিম পাশে বৈশাখী খাবারের হোটেলে লিটন চন্দ্র ঘোষ @ কালী ঘোষ (৬০) নামে একজন ব্যক্তি হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন। উক্ত সংবাদের ভিত্তিতে ঘটনা সংক্রান্তে ব্যবস্থা গ্রহনের উদ্দেশ্যে তাৎক্ষনিক কালীগঞ্জ থানার একটি টীম ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে জানতে পারে যে, ডিসিস্ট লিটন চন্দ্র ঘোষ @ কালী ঘোষ (৫০).. এর বিসমিল্লাহ্ ডায়াগনস্টিক সেন্টার এর পশ্চিম পাশে একটি বৈশাখী খাবারের হোটেল রয়েছে। অভিযুক্ত ১। মোঃ মাসুম মিয়া (২৬).. ২। মোঃ স্বপন মিয়া (৪৮).. ৩। মাজেদা বেগম (৪২).. গনদের বাসার সামনে হতে কলাগাছের এক ছড়ি কলা কে বা কারা চুরি করে নিয়ে যায়।

পরবর্তীতে তারা উক্ত কলার ছড়ি সংক্রান্তে বৈশাখী হোটেলের কর্মচারী অনন্ত দাস (১৮) কে জিজ্ঞাসা করলে অনন্ত দাস উক্ত কলার ছড়ির বিষয়ে কিছু জানে না বলে জানায়। একপর্যায়ে তারা বৈশাখী হোটেলের ভিতরে অনন্ত দাস (১৮) এর বসবাসের কক্ষে প্রবেশ করে উক্ত কলার ছড়িটি দেখতে পায় এবং আশেপাশের লোকজনদের ডেকে দেখায়। উক্ত সময়ে বিবাদীদের সাথে বৈশাখী হোটেলের কর্মচারী অনন্ত দাস (১৮) এর তর্ক বির্তক হয়। তর্ক বিতর্কের একপর্যায়ে উভয় পক্ষের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। এসময় বৈশাখী হোটেল এর মালিক লিটন চন্দ্র ঘোষ কালী ঘোষ (৬০) হাতাহাতির ঘটনা ঠেকানোর চেষ্টাকালে উল্লেখিত মোঃ মাসুম মিয়া (২৬) হোটেলের লোহার খুনতি দিয়ে লিটন চন্দ্র ঘোষ @ কালী ঘোষ (৬০) এর নাকের উপর আঘাত করে এবং বুকে পেটে কিলঘুষি মারতে থাকলে লিটন ঘোষ @ কালী ঘোষ (৬০) মাটিতে পড়ে অচেতন হয়ে যায়। উপস্থিত লোকজন তাকে দ্রুত কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত ডাক্তার তাকে মৃত বলে ঘোষনা করেন।.. এসময় এই হত্যাকান্ডের সাথে সরাসরি জড়িত ০৩ জনকে কালীগঞ্জ থানা পুলিশ গ্রেফতার করে হেফাজতে নেয়।… বর্ণিত ঘটনা পূর্ব পরিকল্পিত বা হিন্দু-মুসলিম সাম্প্রদায়িক বিরোধ/দ্বন্ধ সংক্রান্ত কোন ঘটনা নয়। কলার ছড়ি চুরির মত তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আকস্মিক উত্তেজনা বশতঃ মারামারির ঘটনা ঘটে। উক্ত ঘটনার বিষয়কে ভিন্নখাতে প্রবাহিত করার জন্য এক শ্রেণির লোক মিথ্যা অপপ্রচার চালাচ্ছে বলে জানা যায়, যা সম্পূর্ন অসত্য এবং ভিত্তিহীন। সামগ্রিক বিষয়ে গাজীপুর জেলা পুলিশের নজরদারি এবং মামলা তদন্ত অব্যহত রয়েছে।’

সুতরাং, গাজীপুরে দোকা‌নে ঠাকু‌র দেবতার ছ‌বি রাখাকে কেন্দ্র করে হিন্দু ব্যবসায়ী লিটন চন্দ্র ঘোষ ওরফে কালিকে হত্যা করা হয়েছে শীর্ষক দাবিটি বিভ্রান্তিকর।

তথ্যসূত্র

Share: