‘হিন্দু নিধন’ বিষয়ে প্রশ্ন করায় উঠে যাননি স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা, ভারতীয় গণমাধ্যমে অপপ্রচার

সম্প্রতি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘আজতক বাংলা’য় ‘’আমি কিছু বলব না’ Hindu নিধন প্রশ্নেই ল্যাজে গোবরে Yunus র নির্লজ্জ স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা’ শিরোনামে একটি সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করে দাবি করা হয়েছে, ‘এমনকি (হিন্দু নির্যাতন বিষয়ে) সংবাদমাধ্যমের প্রশ্নের উত্তরও দেওয়া হচ্ছে না (বাংলাদেশ) প্রশাসনের তরফ থেকে। সম্প্রতি এই সংক্রান্ত একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায় যেখানে বাংলাদেশের প্রধান স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীকে গণপ্রহার হিন্দুদের জানে শেষ এবং আওয়ামী লীগের নেতাদের ওপর হামলা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি সাংবাদিকদের সেই সমস্ত প্রশ্ন করতে বাধা দেন এবং সাংবাদিক বৈঠক থেকে কার্যত ক্ষুব্ধ হয়ে বেরিয়ে যান।’
উল্লেখ্য, প্রতিবেদনে সংযুক্ত ভিডিওতে দেখা যায় স্বরাষ্ট্র ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীকে কোনো এক সাংবাদিক ‘যশোরে একটা মৃত’ শব্দগুচ্ছ বলার পরই বাক্য পূর্ণ করার আগেই স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা বাধাপ্রদান করেন এবং এসময় উপদেষ্টাকে বলা হয় তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে আছেন। সেসময় স্বরাষ্ট্র ও কৃষি উপদেষ্টা বলেন, ‘আমি কৃষি ছাড়া বলবো না। আপনারা কৃষির ওপর জিজ্ঞেস করেন। যেহেতু কৃষকদের সমস্যাগুলি আপনারা বলেন না এই জন্য হলো সমস্যা..’ এসময় জাহাঙ্গীর আলম সাংবাদিকদের বলেন তিনি স্বরাষ্ট্র বিষয়ে বক্তব্য দিবেন কিন্তু সেটা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে দিবেন।

এরূপ দাবিতে আজতক বাংলায় প্রকাশিত প্রতিবেদন দেখুন এখানে।
এরূপ দাবিতে আজতক বাংলা’র ইউটিউবে প্রকাশিত প্রতিবেদন দেখুন এখানে।
ফ্যাক্টচেক
রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রচারিত ভিডিওতে প্রদর্শিত ব্রিফিংয়ে ‘হিন্দু নিধন’ বিষয়ে প্রশ্ন করায় জবাব দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে উঠে যাননি স্বরাষ্ট্র ও কৃষি মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী (অব.)। প্রকৃতপক্ষে গত ২৫ জানুয়ারি কৃষি মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত কৃষি বিষয়ক ব্রিফিংয়ে আলোচিত ছাত্রলীগ নেতা জুয়েলের বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হলে স্বরাষ্ট্র ও কৃষি উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম সংশ্লিষ্ট এই প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানান এবং জবাবে উপদেষ্টা জানিয়ে দেন, কৃষি মন্ত্রণালয়ে কৃষি বিষয়ক আলোচনার বাইরে তিনি কোনো মন্তব্য করবেন না। উক্ত ব্রিফিংয়ে হিন্দু বিষয়ক কোনো প্রশ্ন বা আলোচনা করা হয়নি।
এ বিষয়ে জাহাঙ্গীর আলমের আলোচিত ব্রিফিংয়ের ভিডিওর বিষয়ে অনুসন্ধানে মূলধারার গণমাধ্যম ‘একাত্তর টিভি’র ইউটিউব চ্যানেলে ‘কৃষির বাইরে প্রশ্ন করায় উঠে চলে গেলেন স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা’ শিরোনামে গত ২৫ জানুয়ারিতে আলোচিত ব্রিফিংয়ের ভিডিও প্রচার হতে দেখা যায়। ভিডিওতে দেখা যায় ‘যশোরে মৃত বাচ্চা’র বিষয়ে উল্লেখ করতেই জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে কৃষি বিষয়ক প্রশ্ন করতে বলেন। ভিডিওতে জাহাঙ্গীর আলমের উঠে যাওয়ার আগ পর্যন্ত হিন্দু বিষয়ক কোনো প্রশ্ন করতে দেখা যায়নি।

এ বিষয়ে প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চ করলে মূলধারার গণমাধ্যম ‘ডিবিসি নিউজ’ এর ওয়েবসাইটে গত ২৫ জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, ‘নিষিদ্ধঘোষিত সংগঠন ছাত্রলীগের বাগেরহাট সদর উপজেলার সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দামের স্ত্রী ও নয় মাসের শিশু সন্তানের মৃত্যুর মর্মান্তিক ঘটনার পর তার প্যারোেল মঞ্জুর না হওয়া নিয়ে কৃষি ও স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরীকে প্রশ্ন করেন সাংবাদিকরা। তবে কৃষি বিষয়ক ব্রিফিংয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট এই প্রশ্নের উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানান এই উপদেষ্টা। কৃষি মন্ত্রণালয়ের সভাকক্ষে আয়োজিত এই শেষ পর্যায়ে উপদেষ্টা ব্রিফিংয়ের সাংবাদিকদের প্রশ্নের আহ্বান জানালে একজন সাংবাদিক যশোরের ওই ঘটনার প্রতি তার দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। জবাবে উপদেষ্টা জানিয়ে দেন, কৃষি বিষয়ক আলোচনার বাইরে তিনি কোনো মন্তব্য করবেন না। এ সময় সাংবাদিকরা তাকে মনে করিয়ে দেন, তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েরও দায়িত্বে রয়েছেন এবং এ বিষয়ে তার দায়বদ্ধতা আছে। এর প্রত্যুত্তরে জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী বলেন, আজকের আয়োজন শুধুই কৃষির জন্য এবং এই মুহূর্তের জন্য তিনি অন্য বিষয়ে দায়বদ্ধ নন। তিনি পাল্টা অভিযোগ করে বলেন, সাংবাদিকরা কৃষকদের প্রকৃত সমস্যাগুলো তুলে ধরেন না, যা অত্যন্ত হতাশার।’
এছাড়াও, আরেক গণমাধ্যম ‘এখন টিভি’ সূত্রেও একইরকম তথ্য জানা যায়। প্রসঙ্গত, গত ২৩ জানুয়ারি বাগেরহাট সদর উপজেলার ছাত্রলীগের সভাপতি জুয়েল হাসান সাদ্দামের বাড়ি থেকে সাদ্দামের স্ত্রী কানিজ সুবর্ণা স্বর্ণালীর ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পাশেই পড়ে ছিল তার নয় মাস বয়সী ছেলে সেজাদ হাসান নাজিফের মরদেহ। স্ত্রী ও শিশু সন্তানের মরদেহ দেখার জন্য প্যারোলে মুক্তি পাননি সাদ্দাম। তবে সাদ্দামের প্যারোলের আবেদন করা ও না করা নিয়ে তার এবং যশোর জেলা প্রশাসনের দুই ধরনের বক্তব্য রয়েছে।
অনুসন্ধানে কোথাও স্বরাষ্ট্র ও কৃষি উপদেষ্টার উত্তর দিতে অস্বীকৃতি জানানোর ঘটনায় হিন্দু বিষয়ক কোনো প্রশ্ন করার কোনো উল্লেখ নির্ভরযোগ্য সূত্রে পাওয়া যায়নি।
সুতরাং, ‘হিন্দু নিধন’ বিষয়ে প্রশ্ন করায় উত্তর না দিয়ে ব্রিফিং থেকে উঠে গিয়েছেন স্বরাষ্ট্র ও কৃষি উপদেষ্টা বলে প্রচারিত দাবিটি মিথ্যা।

