শরিফ ওসমান বিন হাদির হত্যার বিচার দাবিতে ইনকিলাব মঞ্চের কর্মসূচিকে কেন্দ্র করে গতকাল ৬ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর শাহবাগে পুলিশের সঙ্গে বিক্ষোভকারীদের সংঘর্ষ হয়। এতে অর্ধশতাধিক ব্যক্তি আহত হন। এরই প্রেক্ষিতে গত ৬ ফেব্রুয়ারিতে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল জাবেরের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্ট করে দাবি করা হয়, আব্দুল্লাহ আল জাবের গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।

এছাড়াও, এরই প্রেক্ষিতে পরবর্তীতে ডাকসু ভিপি সাদিক কায়েম, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) মুখ্য সমন্বয়ক এবং ঢাকা-৮ আসনের ১১ দলীয় জোট মনোনীত প্রার্থী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, কুষ্টিয়া-৩ আসনে জামায়াত প্রার্থী মুফতি আমির হামজাসহ অনেকেই দাবি করেন আব্দুল্লাহ আল জাবের গুলিবিদ্ধ হয়েছেন।
পাশাপাশি, এরই প্রেক্ষিতে বাড়তি কোনো সূত্র ছাড়া দেশিয় একাধিক গণমাধ্যমেও আলোচিত দাবি প্রচার করা হয়।
এরূপ দাবিতে ফেসবুকে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।
এরূপ দাবিতে টিকটকে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।
ফ্যাক্টচেক
রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আব্দুল্লাহ আল জাবের গুলিবিদ্ধ হননি বরং, তিনি সাউন্ড গ্রেনেডের শেলে আহত হয়েছেন।
এ বিষয়ে অনুসন্ধানে সংবাদমাধ্যম ‘ঢাকা ট্রিবিউন’ এর ফেসবুক পেজে গত ৬ ফেব্রুয়ারিতে প্রচারিত একটি ভিডিও পাওয়া যায়। ভিডিওতে হাসপাতালের বেডে আবদুল্লাহ আল জাবেরকে শুয়ে মোবাইল ব্যবহার করতে দেখা যায় এবং তার শরীরে আঘাতের দাগ দেখা যায়, যা সাউন্ড গ্রেনেডের শেলের আঘাতের বলে প্রতীয়মান হয়।
পরবর্তীতে অনুসন্ধানে প্রধান উপদেষ্টার ফেসবুক পেজে গত ৬ ফেব্রুয়ারিতে এ বিষয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের বিবৃতি পাওয়া যায়। বিবৃতিতে বলা হয়, ‘৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে বিক্ষোভকারীরা ব্যারিকেড ভেঙে যমুনার অভিমুখে অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করলে এবং একপর্যায়ে জলকামানের ওপর উঠে গেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে সাউন্ড গ্রেনেড ও জলকামান ব্যবহার করে। সরকার স্পষ্টভাবে জানাচ্ছে যে এ সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কোনো ধরনের গুলি ছোড়েনি।.. এ সময় কোনো ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র (lethal weapon) ব্যবহার করা হয়নি বলে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ নিশ্চিত করেছে। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে কর্তব্যরত চিকিৎসকদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় আহত হয়ে ইনকিলাব মঞ্চের সদস্য সচিব আব্দুল্লাহ আল জাবেরসহ সর্বমোট ২৩ জন চিকিৎসা গ্রহণ করেছেন। তবে তাঁদের কারও শরীরে গুলির আঘাত নেই বলে কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা নিশ্চিত করেছেন।..’
এছাড়াও, এ বিষয়ে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের অনলাইন নিউজ পোর্টাল ‘ডিএমপি নিউজ’ এ ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের বিবৃতি পাওয়া যায়। বিবৃতিতে পুলিশ বলে, এক পর্যায়ে পুলিশ টিয়ারশেল ও সাউন্ড গ্রেনেড ব্যবহার করে আন্দোলনকারীদের ছত্রভঙ্গ করে দেয়। এতে কোন ধরনের আগ্নেয়াস্ত্র (Lethal Weapon) বা গুলি ব্যবহার করা হয়নি।
তাছাড়া, এ বিষয়ে জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো’র ওয়েবসাইটে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘পুলিশ প্রথমে বিক্ষোভকারীদের ওপর জলকামান থেকে পানি ছোড়ে। পরে সাউন্ড গ্রেনেড ও কাঁদানে গ্যাসের শেল নিক্ষেপ এবং লাঠিপেটা করে। এ সময় ইনকিলাব মঞ্চের নেতা–কর্মীরাও পুলিশের দিকে বোতল, ইটপাটকেল নিক্ষেপ করতে থাকেন। এ ঘটনায় ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের, মঞ্চের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখপাত্র ও ডাকসু নেত্রী ফাতিমা তাসনিম জুমাসহ অনেকে আহত হন।’
পাশাপাশি, প্রতিবেদনে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. আসাদুজ্জামানের বরাতে বলা হয়, ‘আহত ব্যক্তিদের মধ্যে কোনো গুলিবিদ্ধ রোগী পাওয়া যায়নি। যাঁরা আহত হয়ে এসেছেন, তাঁদের জরুরি বিভাগে রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। অনেকে চিকিৎসা নিয়ে চলে গেছেন। আহত ব্যক্তিদের শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাতের জখম রয়েছে। তাঁদের মধ্যে বেশির ভাগ রোগীর জখম, ফেটে যাওয়া, থেঁতলে যাওয়া।’
পরবর্তীতে রিউমর স্ক্যানার এ বিষয়ে ঘটনাস্থলে সেদিন সকাল থেকে উপস্থিত থাকা কয়েকজন সাংবাদিকের সাথে কথা বললে তাদের কেউই ইনকিলাব মঞ্চের কর্মীদের ওপর পুলিশকে আগ্নেয়াস্ত্রের গুলি ছুঁড়তে দেখেননি বলে জানান। তারা আরো জানান, পুলিশ সাউন্ডগ্রেনেড আর টিয়ারশেল নিক্ষেপ করেছে। লাঠিচার্জ করেছে।
এছাড়াও, এ বিষয়ে ইনকিলাব মঞ্চের ফেসবুক পেজ থেকে সার্বিক বিষয় নিয়ে গতকাল ৬ ফেব্রুয়ারিতে একটি লাইভ ভিডিও প্রচার করা হয়। ভিডিওতে আব্দুল্লাহ আল জাবেরকে বলতে শোনা যায়, ‘..সরকার জনগণের ওপর আজকে মুহুর্মুহু সাউন্ড গ্রেনেড, টিয়ারশেল, রাবার বুলেট এগুলো নিক্ষেপ করেছে।..’
এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সচিব শফিকুল আলম ৭ ফেব্রুয়ারি দুপুরে একটি ফেসবুক পোস্ট করেন। পোস্টে জাবেরের গুলিবিদ্ধ হওয়ার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমরা পুলিশের সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। ডিএমপি স্পষ্টভাবে জানিয়েছে যে কোনো গুলি ছোড়া হয়নি। প্রকৃতপক্ষে, অন্তর্বর্তী সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী পুলিশ আর প্রাণঘাতী অস্ত্র বহন করে না। পরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের পরিচালকও নিশ্চিত করেছেন যে জাবেরসহ কোনো বিক্ষোভকারীকে গুলি করা হয়নি।’ (অনূদিত)
অনুসন্ধানে আবদুল্লাহ আল জাবেরের আগ্নেয়াস্ত্র কর্তৃক লাইভ বুলেটে গুলিবিদ্ধ হওয়ার দাবির সপক্ষে কোনো ভিডিও বা নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সুতরাং, ইনকিলাব মঞ্চের সদস্যসচিব আবদুল্লাহ আল জাবের গুলিবিদ্ধ হয়েছেন শীর্ষক দাবিটি বিভ্রান্তিকর।
তথ্যসূত্র
- Dhaka Tribune – Facebook Post
- Chief Adviser GOB – Facebook Post
- Prothom Alo – ইনকিলাব মঞ্চের অবস্থান কর্মসূচি ঘিরে সংঘর্ষ, পুলিশের লাঠিপেটা–সাউন্ড গ্রেনেড
- DMP News – যমুনা ও আশপাশের এলাকায় বেআইনী সমাবেশ ছত্রভঙ্গ করতে কোন প্রকার আগ্নেয়াস্ত্র বা গুলি ব্যবহার করেনি পুলিশ
- ইনকিলাব মঞ্চ – Facebook Post
- Shafiqul Alam – Facebook Post


