গত বছরের ১২ ডিসেম্বর দুপুরে, ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি ঢাকার পুরানা পল্টনের বক্স কালভার্ট রোডে গুলিবিদ্ধ হন। এরপর সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১৮ ডিসেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। এরই প্রেক্ষিতে, “হাদি হত্যা মামলায় নাটকীয় মোড়! শামীম ওসমানকে আটক করেছে সেনাবাহিনী” শীর্ষক দাবিতে একটি ভিডিও ইউটিউবে প্রচার করা হয়েছে।
এই প্রতিবেদন প্রকাশ অবধি ইউটিউবে ভিডিওটি ১৬ হাজারের অধিকবার দেখা হয়েছে।

উক্ত ভিডিওটি দেখুন: এখানে (আর্কাইভ)।
ফ্যাক্টচেক
রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, সেনাবাহিনী কর্তৃক শামীম ওসমানকে আটকের দাবিটি সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে, অধিক ভিউ পাওয়ার আশায় চটকদার থাম্বনেইল এবং শিরোনাম ব্যবহার করে ভিন্ন ভিন্ন ঘটনার ভিডিওকে প্রযুক্তির সাহায্যে যুক্ত করে ভিত্তিহীনভাবে উক্ত দাবিটি প্রচার করা হয়েছে।
এ বিষয়ে অনুসন্ধানের শুরুতে আলোচিত ভিডিওটি পর্যবেক্ষণ করে তাতে শামীম ওসমানকে গ্রেফতারের দাবির সপক্ষে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি।
আলোচিত ভিডিওটিতে মোট তিনটি ভিন্ন ঘটনার ভিডিও ক্লিপ সংযুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে প্রথম ভিডিওর বিষয়ে অনুসন্ধানে সংবাদ সংস্থা ‘United News of Bangladesh’ এর ইউটিউব চ্যানেলে গত ১৬ জানুয়ারিতে প্রকাশিত একটি ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়। ৪ মিনিট ১৮ সেকেন্ড সময়ের দীর্ঘ এই ভিডিওর দৃশ্যের সঙ্গে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ভিডিও’র প্রথম দৃশ্যের মিল রয়েছে। উক্ত ভিডিওর শিরোনাম থেকে জানা যায়, এটি কেরানীগঞ্জে শিক্ষিকার ফ্ল্যাট থেকে নিখোঁজ ছাত্রী ও তার মায়ের লাশ উদ্ধারের ঘটনার ভিডিও। উক্ত ভিডিওতে সাবেক সংসদ সদস্য শামীম ওসমানের গ্রেফতার দাবি সমর্থিত কোনো তথ্যের উল্লেখ নেই।

পাশাপাশি, আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ভিডিওতে যুক্ত দ্বিতীয় ফুটেজে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগকে (ডিবি) উদ্ধৃত করে ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদির হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে সংবাদ পরিবেশন করতে দেখা যায়। প্রকৃতপক্ষে, কিছু ফুটেজ কোনো প্রকার প্রাসঙ্গিকতা ছাড়াই আলোচিত ভিডিওটিতে যুক্ত করা হয়েছে, যা শামীম ওসমানের গ্রেফতারের দাবির সাথে কোনোভাবেই সম্পর্কিত নয়।
এছাড়া, আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ভিডিওতে প্রদর্শিত তৃতীয় ফুটেজের বিষয়ে অনুসন্ধানে দৈনিক সংবাদ চর্চা নামক অনলাইন নিউজ পোর্টালে ২০১৮ সালের ২৬ এপ্রিলে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়। একই ছবি ব্যবহারে তৈরি এই প্রতিবেদন বিশ্লেষণে জানা যায়, এটি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সক্রিয় দেহব্যবসা নিয়ে প্রকাশিত সংবাদ। যার সাথে শামীম ওসমানের গ্রেফতারের দাবির কোনো সম্পর্ক নেই।

স্বাভাবিকভাবে, শামীম ওসমান সাম্প্রতিক সময়ে গ্রেফতার হলে তা নিয়ে সংবাদমাধ্যমগুলোতে ঢালাওভাবে খবর প্রচার হতো। তবে, এক্ষেত্রে অনুসন্ধানে গণমাধ্যম কিংবা বিশ্বস্ত কোনো সূত্র উক্ত দাবি সমর্থিত কোনো তথ্যের সন্ধান পাওয়া যায়নি।
পরবর্তীতে, আলোচিত দাবিটির সূত্রপাত অনুসন্ধানে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগের ফেসবুক পেজে মো. শামীম ওসমান নামের এক প্রতারককে গ্রেপ্তার সংক্রান্ত বিষয়ে একটি পোস্ট খুঁজে পাওয়া যায়। আটক শামীম ওসমান নিজেকে স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা লেফটেন্যান্ট জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী পরিচয় দিয়ে জেলা প্রশাসককে হোয়াটসঅ্যাপে বিভ্রান্তিকর বার্তা পাঠাতেন এবং অর্থ দাবি করতেন।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের জুলাই-আগষ্টের আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরে আত্মগোপনে চলে যান শামীম ওসমান। প্রথম আলোর ওয়েবসাইটে গত ১৯ জানুয়ারিতে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে, জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় নারায়ণগঞ্জ এলাকায় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় শামীম ওসমানসহ ১২ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নেওয়ার খবর পাওয়া যায়। তাছাড়া, এই মামলার সব আসামি পলাতক বলেও প্রতিবেদনটিতে উল্লেখ পাওয়া যায়।
সুতরাং, শামীম ওসমান সেনাবাহিনী কর্তৃক আটক হয়েছেন শীর্ষক দাবিটি সম্পূর্ণ মিথ্যা।
তথ্যসূত্র
- United News of Bangladesh: কেরানীগঞ্জে গৃহশিক্ষিকার বাসা থেকে মা–মেয়ের গলিত লাশ উদ্ধার;লোনের চাপেই হত্যাকাণ্ড
- Daily Sangbad Chorcha: রূপগঞ্জে চলছে পতিতার রমরমা ব্যবসা
- CID, Bangladesh Police: Facebook Post
- Prothom Alo: শামীম ওসমানসহ ১২ আসামির বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ আমলে নিয়েছেন ট্রাইব্যুনাল
- Rumor Scanner’s Analysis


