সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ভিডিও প্রচার করে দাবি করা হচ্ছে, বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে বক্তব্য দিতে গিয়ে প্রথমেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ করেছেন। ভিডিওতে তাকে বলতে শোনা যায়, “সংসদের প্রথম অধিবেশনে আমি প্রথমে স্মরণ করতে চাই জনাব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে এবং তার কন্যা শেখ হাসিনাকে, যার হাত ধরে এই সংসদের পথচলা শুরু হয়েছে।”

উক্ত দাবিতে ফেসবুকে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।
টিকটকে প্রচারিত ভিডিও দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।
ফ্যাক্টচেক
রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে দেখা যায়, আলোচিত ভিডিওটি আসল নয়। প্রকৃতপক্ষে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির সাহায্যে ভিডিওটি তৈরি করা হয়েছে। বাস্তবে তারেক রহমান তার বক্তব্যের শুরুতে শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ করেননি। বরং তিনি মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে জুলাই আন্দোলনে শহিদ ও আহত হওয়া ব্যক্তিদের এবং তাদের পরিবার-পরিজনকে স্মরণের মধ্য দিয়ে বক্তব্য শুরু করেন।
এ বিষয়ে অনুসন্ধানে ‘Bangladesh Parliament – বাংলাদেশ জাতীয় সংসদ’ নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের ভিডিও পাওয়া যায়। ৪৮ মিনিট দৈর্ঘ্যের ওই ভিডিওর ৮ মিনিট ৫০ সেকেন্ডের পর থেকে তারেক রহমানের বক্তব্য শুরু হয়।
বক্তব্যের শুরুতে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার সংগ্রামসহ এ পর্যন্ত দেশে গণতন্ত্র ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যারা শহিদ হয়েছেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের এই যাত্রালগ্নে তিনি তাদের কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছেন।
এছাড়া আন্দোলন-সংগ্রামে যেসব মা তাদের সন্তান হারিয়েছেন, যেসব সন্তান তাদের প্রিয়জন হারিয়েছেন, যেসব পরিবার তাদের স্বজন হারিয়েছে এবং যেসব আহত মানুষ তাদের স্বাভাবিক জীবন হারাতে বাধ্য হয়েছেন তাদের প্রতিও তিনি কৃতজ্ঞতা জানান। পাশাপাশি নির্যাতন-নিপীড়ন, রাজনৈতিক হয়রানি কিংবা মিথ্যা মামলার শিকার হয়ে সর্বস্ব হারানো মানুষের অবদানও তিনি স্মরণ করেন।
তিনি আরও দেশের ছাত্র-জনতা, কৃষক, শ্রমিক, শিক্ষক, কবি-সাহিত্যিক, সাংবাদিক, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী, কামার-কুমার, জেলে, তাঁতি, গাড়িচালক, ব্যবসায়ী, সরকারি ও বেসরকারি চাকরিজীবী, গৃহিণীসহ সর্বস্তরের মানুষ এবং গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মী-সমর্থকদের অভিনন্দন জানিয়ে বক্তব্য শুরু করেন।
তার বক্তব্যের শুরুতে কোথাও শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ করতে শোনা যায়নি।
বক্তব্যের শেষের দিকে তারেক রহমান বলেন, নতুন সংসদের যাত্রা শুরুর সময় সংসদে সাবেক স্পিকার কিংবা ডেপুটি স্পিকার থাকার কথা ছিল। কিন্তু পতিত, পরাজিত ও বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট সরকারের জনবিরোধী কর্মকাণ্ডের ফলে যে জনরোষ সৃষ্টি হয়েছিল, তাতে এই মহান সংসদের সাবেক স্পিকার বা ডেপুটি স্পিকারকে খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাদের কেউ কারাগারে, কেউ নিখোঁজ কিংবা কেউ পলাতক।
তিনি আরও বলেন, দীর্ঘ দেড় দশক ফ্যাসিবাদী ও তাবেদারিমূলক শাসন-শোষণের পর জনগণের ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে এক বিশেষ পরিস্থিতিতে জাতীয় সংসদের কার্যক্রম শুরু হতে যাচ্ছে। এমন পরিস্থিতিতে সংবিধান ও সংসদের কার্যপ্রণালী বিধির আলোকে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সভাপতিত্ব করার জন্য তিনি প্রবীণ রাজনীতিবিদ ও পাঁচবারের নির্বাচিত জাতীয় সংসদ সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেনের নাম প্রস্তাব করেন।
এ সময় তিনি সংসদীয় রীতিনীতির ইতিহাস উল্লেখ করে বলেন, এমন পরিস্থিতি নজিরবিহীন নয়। ১৯৭৩ সালে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান সংসদের সদস্য মাওলানা আবদুর রশিদ তর্কবাগীশের নাম প্রস্তাব করেছিলেন এবং তার সভাপতিত্বেই বাংলাদেশের প্রথম সংসদের প্রথম অধিবেশন শুরু হয়েছিল। এখানে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরতে গিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানের নাম উল্লেখ করা হলেও, অধিবেশনের শুরুতে তাকে স্মরণ করে তারেক রহমান বক্তব্য শুরু করেননি।এছাড়া প্রচারিত ভিডিওতে তারেক রহমানের কথা বলার ভঙ্গি ও মুখাবয়বে কিছু অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা যায়। অর্থাৎ, তার সংসদ অধিবেশনে দেওয়া মূল বক্তব্যকে বিকৃত করেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির সহায়তায় ভিডিওটি তৈরি করা হয়েছে। এআই কনটেন্ট শনাক্তকরণ ওয়েবসাইট সাইটএঞ্জিনে ভিডিওটি যাচাই করে দেখা যায়, এটি এআই দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা ৮৯ শতাংশ।

সুতরাং, সংসদের প্রথম অধিবেশনে তারেক রহমান প্রথমে শেখ মুজিবুর রহমানকে স্মরণ করেছেন এমন দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটি এআই নির্মিত।
তথ্যসূত্র
- Bangladesh Parliament – YouTube Video
- Sightengine
- Rumor Scanner’s own analysis


