দিল্লিতে আ.লীগের সংবাদ সম্মেলন ঘিরে শেখ হাসিনার প্রকাশ্য উপস্থিতির দাবিতে সামাজিক মাধ্যমে ভুয়া তথ্যের ছড়াছড়ি

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় নেন। এরপর থেকে তিনি ইমেলের মাধ্যমে বিভিন্ন গণমাধ্যমে সাক্ষাৎকার দিয়েছেন এবং ভার্চুয়ালি দলীয় সভায় যুক্ত হলেও, জনসমক্ষে কিংবা ভিডিওর মাধ্যমে তার সরাসরি উপস্থিতির কোনো নজির পাওয়া যায়নি।
এমন প্রেক্ষাপটে গত ২৩ জানুয়ারি দিল্লির প্রেস ক্লাব অব ইন্ডিয়ায় ফরেন করেস্পন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া এফসিসি আয়োজিত একটি সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশে রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন। সংবাদ সম্মেলনটি ঘিরে আগে থেকেই বিভিন্ন আলোচনা চলছিল এবং ভারতের গণমাধ্যমের একাংশে শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল উপস্থিতির সম্ভাবনার কথাও প্রচারিত হয়। এসব বিষয়কে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বিভিন্ন ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। এর মধ্যে ভিডিওভিত্তিক ১২টি এবং ছবি ও তথ্যভিত্তিক একটি করে ভুয়া দাবি শনাক্ত করা হয়।
বিশ্লেষণে দেখা যায়, ছড়ানো ভিডিওগুলোর মধ্যে একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি, ১০টি শেখ হাসিনার বিভিন্ন সময়ের পুরোনো ভিডিও এবং একটি ভারতের একজন রাজনীতিবিদের ভিডিও। পাশাপাশি প্রচারিত একমাত্র ছবিটিও শেখ হাসিনার পুরোনো ছবি। এছাড়া, তথ্যভিত্তিক দাবিটি প্রথমে একটি ব্যঙ্গাত্মক পেজে পোস্ট আকারে প্রকাশিত হলেও পরবর্তীতে সেটিই বাস্তব ঘটনা হিসেবে ছড়িয়ে পড়ে।
২৩ জানুয়ারি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের একাধিক প্ল্যাটফর্মে (১,২,৩) বিমানের সিঁড়ি বেয়ে শেখ হাসিনার নামার একটি ভিডিও ছড়িয়ে দিয়ে দাবি করা হয়, সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিতে তিনি ভারত সরকারের রাষ্ট্রীয় প্রটোকলে ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছাচ্ছেন। তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভিডিওটি ২০২৪ সালের এবং ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে দুই দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে দিল্লি পৌঁছানোর সময় ধারণ করা। ৫ আগস্টের পর এই একই ভিডিও ভিন্ন দাবিতে একাধিকবার প্রচার করা হলে রিউমর স্ক্যানার সে সময়ই এর প্রকৃততথ্য তুলে ধরে ফ্যাক্টচেক প্রকাশ করেছিল।

এছাড়া বিমানবন্দরের ভেতরে শেখ হাসিনার হাঁটার একটি ভিডিও দিয়ে দাবি (১,২,৩) করা হয়, দীর্ঘ ৫৩৬ দিন পর অবশেষে প্রকাশ্যে এলেন শেখ হাসিনা। তবে এ বিষয়ে অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০২৩ সালে প্রকাশিত দক্ষিণ আফ্রিকার সরকারি ইউটিউব চ্যানেলে একই দৃশ্য সংবলিত একটি ভিডিও রয়েছে। ভিডিওটির বর্ণনা এবং সে সময় বাংলাদেশ সংবাদ সংস্থা – বাসসে প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, এটি দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেসিডেন্ট সিরিল রামাফোসার আমন্ত্রণে ২২ থেকে ২৪ আগস্ট অনুষ্ঠিত পনেরোতম ব্রিকস শীর্ষ সম্মেলনে যোগ দিতে বাংলাদেশের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জোহানেসবার্গের ও আর টাম্বো আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছানোর দৃশ্য।

এদিন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি একটি ভিডিও ছড়ানো হয়। ভিডিওটির মাধ্যমে দাবি করা হয়, সংবাদ সম্মেলনের উদ্দেশ্যে ভারতের সেনাবাহিনী ও পুলিশ ভিআইপি প্রটোকলের মাধ্যমে শেখ হাসিনাকে নিয়ে যাচ্ছে। তবে ভিডিওটি পর্যবেক্ষণ করলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহারের একাধিক অসংগতি ধরা পড়ে। ডিপফেক ও মিটারের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এটি কৃত্রিমভাবে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ। পাশাপাশি ভিডিওতে দেখা নারীর অবয়বের সঙ্গে শেখ হাসিনার বাস্তব চেহারারও অমিল রয়েছে।

এছাড়া দিল্লি প্রেস ক্লাবে শেখ হাসিনার আগমনের দাবিতে একটি গাড়িবহরের ভিডিও (১,২) প্রচার করা হয়। তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, ভিডিওটি ভারতীয় রাজনীতিবিদ নির্মল চৌধুরীর একটি ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে গত ১৪ জানুয়ারি প্রকাশিত হয়েছিল। ভিডিওটির ওপর হিন্দিতে ধোরিমানা বারমের লেখা রয়েছে। একই রাজনীতিবিদের আরেকটি অ্যাকাউন্টে ওই দিন প্রকাশিত অনুরূপ একটি গাড়িবহরের ভিডিওর ক্যাপশনে উল্লেখ করা হয়, যোধপুর থেকে ধোরিমানা বারমের যাওয়ার পথে। পাশাপাশি ভিডিওটি পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, গাড়িবহরের একাধিক গাড়ির সামনেই ওই ভারতীয় রাজনীতিবিদের নাম লেখা রয়েছে।

এদিকে সংবাদ সম্মেলনে অংশ নিতে শেখ হাসিনা সাংবাদিকদের সামনে উপস্থিত হয়েছেন এমন দাবিতে আরেকটি ভিডিও (১,২,৩,৪) প্রচার করা হয়। তবে এ বিষয়ে অনুসন্ধানে দেখা যায়, ‘Ziaul Amin Jewel’ নামের একটি ফেসবুক প্রোফাইলে ২০২৩ সালের ৩ অক্টোবর প্রকাশিত একটি ভিডিওর সঙ্গে আলোচিত ভিডিওটির মিল রয়েছে। উভয় ভিডিওতেই স্থান, শেখ হাসিনার পোশাক এবং তার আশপাশে থাকা ব্যক্তিদের অবস্থানের মধ্যে সাদৃশ্য দেখা যায়। পোস্টটির ক্যাপশন অনুযায়ী, এটি লন্ডনে শেখ হাসিনাকে দেওয়া একটি নাগরিক সংবর্ধনার দৃশ্য। পাশাপাশি সে সময় একাধিক গণমাধ্যমে (১,২) প্রকাশিত প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০২৩ সালের ২ অক্টোবর লন্ডনের মেথোডিস্ট সেন্ট্রাল হল ওয়েস্টমিনস্টারে আয়োজিত এক নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন শেখ হাসিনা।

ভারতীয় গণমাধ্যমকর্মীদের সঙ্গে শেখ হাসিনা সাক্ষাৎ করছেন এমন দাবিতে একটি ভিডিও (১,২,৩) ছড়ানো হয়। তবে অনুসন্ধানে জানা যায়, ভিডিওটি ২০২৪ সালের এবং এতে বাংলাদেশের গণভবনে অনুষ্ঠিত একটি সৌজন্য সাক্ষাৎ ও মতবিনিময় সভার দৃশ্য রয়েছে। ওই সভায় দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর দেশি ও বিদেশি সাংবাদিক এবং পর্যবেক্ষকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন শেখ হাসিনা। এর আগেও ভিডিওটি ভিন্ন দাবিতে প্রচার হলে গত বছর রিউমর স্ক্যানার টিম এ বিষয়ে একটি ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল।

শেখ হাসিনাকে দেখে আওয়ামী লীগের নেতা কর্মীরা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করছেন এমন দাবিতে একটি ভিডিও (১,২,৩) ছড়ানো হয়। ভিডিওতে মঞ্চে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা শেখ হাসিনাকে ঘিরে দর্শকসারিতে উপস্থিত ব্যক্তিদের স্লোগান দিতে দেখা যায়। তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, টিবিএন টোয়েন্টিফোর নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলে ২০২৩ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত একটি ভিডিওর সঙ্গে আলোচিত ভিডিওটির মিল রয়েছে। ভিডিওটির শিরোনাম অনুযায়ী, এটি নিউ ইয়র্কে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দেওয়া একটি নাগরিক সংবর্ধনার দৃশ্য। সে সময় প্রকাশিত ভয়েস অব আমেরিকা বাংলার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২২ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় নিউ ইয়র্ক সিটি আওয়ামী লীগ আয়োজিত এক নাগরিক সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন শেখ হাসিনা। জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের আটাত্তরতম অধিবেশনে যোগ দিতে সে সময় তিনি নিউ ইয়র্কে অবস্থান করছিলেন।

একটি ইনডোর সেটিং বা স্টুডিওতে ক্যামেরার সামনে বসে থাকা শেখ হাসিনার একটি ছবি দিয়ে দাবি (১,২) করা হয়, দীর্ঘ ১৭ মাস পর তিনি দিল্লিতে সরাসরি সাংবাদিকদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন। তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, ছবিটি সাম্প্রতিক নয়। এ বিষয়ে চ্যানেল ২৪ এর ওয়েবসাইটে ২০২৩ সালের ১৭ নভেম্বর প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে একই ছবির ব্যবহার পাওয়া যায়। ওই প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, ছবিটি কানাডার সিবিসি টেলিভিশনের অনুসন্ধানী বিভাগ দ্য ফিফথ স্টেট এর একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার দেওয়া সাক্ষাৎকারের সময় তোলা। পরবর্তীতে দ্য ফিফথ স্টেট এর ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত ওই প্রতিবেদনে শেখ হাসিনাকে একই পোশাক ও সেটআপে সাক্ষাৎকার দিতে দেখা যায়।

সেদিনের সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনার বক্তব্যের দৃশ্য দাবিতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একাধিক ভিডিও (১,২,৩) প্রচার করা হয়। এর মধ্যে একটি ভিডিও ফেসবুকে লাইভ হিসেবে ছড়ানো হয়, যেখানে শেখ হাসিনাকে বক্তব্য দিতে দেখা যায়। পাশাপাশি ভিডিওটির বিভিন্ন অংশে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকেও দেখা যায়, ফলে এটি দেখে মনে হতে পারে ওই সংবাদ সম্মেলনে নরেন্দ্র মোদীও উপস্থিত ছিলেন। তবে অনুসন্ধানে জানা যায়, ভিডিওটি সেদিনের নয়। প্রকৃতপক্ষে, শেখ হাসিনার একটি পুরোনো বক্তৃতার ভিডিও ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে সম্পাদনা করে তাতে নরেন্দ্র মোদির ভিন্ন সময়ের ভিডিও ফুটেজ ও আলাদা ব্যাকগ্রাউন্ড যুক্ত করা হয়েছে। এভাবেই ভিডিওটি তৈরি করে আলোচিত দাবিতে প্রচার করা হয়। একই ভিডিও গত বছরের জানুয়ারিতেও ভিন্ন দাবিতে ছড়ানো হলে সে সময় রিউমর স্ক্যানার টিম এ বিষয়ে একটি ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছিল।

শেখ হাসিনার সরাসরি বক্তব্য দেওয়ার দৃশ্য দাবিতে আরেকটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হয়। তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, এটিও সাম্প্রতিক নয় এবং ভারতে শেখ হাসিনার কোনো বক্তব্যের ভিডিও নয়। ভিডিওটি পর্যবেক্ষণ করলে পেছনের ব্যানারে ‘মতবিনিময় সভা’ এবং ‘টুঙ্গিপাড়া আওয়ামী লীগ কার্যালয়’ লেখা দেখা যায়। এই সূত্র ধরে ২০২৩ সালের ১২ অক্টোবর ‘Rico Sheikh’ নামের একটি ফেসবুক প্রোফাইলে একই লেখা সংবলিত ব্যানারের সামনে বসে থাকা শেখ হাসিনার একাধিক ছবি পাওয়া যায়। পাশাপাশি ভিডিওতে তার পরিহিত পোশাকের সঙ্গেও ছবিগুলোর মিল রয়েছে। এছাড়া এর এক দিন আগে ‘Aziz Sheikh’ নামের আরেকটি ফেসবুক প্রোফাইলে প্রকাশিত একাধিক ভিডিওর সঙ্গেও আলোচিত ভিডিওটির মিল পাওয়া যায়। উভয় প্রোফাইলের পোস্ট অনুযায়ী, এটি টুঙ্গিপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়ে আয়োজিত একটি মতবিনিময় সভায় শেখ হাসিনার উপস্থিতির দৃশ্য। এ বিষয়ে ১১ অক্টোবর ভয়েস অব আমেরিকা বাংলায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, সেদিন টুঙ্গিপাড়া উপজেলা আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী ও বন্ধুত্বপূর্ণ সংগঠন, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি এবং নাগরিক ব্যক্তিত্বদের সঙ্গে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির ভাষণ দেন শেখ হাসিনা।

বক্তব্যের দৃশ্য দাবিতে অপর একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তবে অনুসন্ধানে জানা যায়, ভিডিওটি সাম্প্রতিক নয়; এটি ২০২০ সালের। ভিডিওটি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে দেওয়া শেখ হাসিনার ভাষণের দৃশ্য। ২০২০ সালের ১৭ মার্চ সময় টিভির ইউটিউব চ্যানেলে প্রকাশিত ওই ভাষণের একটি ভিডিও পাওয়া যায়। আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটির সঙ্গে ২০২০ সালের ওই বক্তব্যের দৃশ্যের মিল থাকলেও বক্তব্যের অডিও ভিন্ন। ভিডিওটি পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, শেখ হাসিনার ঠোঁটের নড়াচড়ার সঙ্গে যুক্ত অডিওর কোনো সামঞ্জস্য নেই। অর্থাৎ, ২০২০ সালের পুরোনো ভিডিওতে ভিন্ন অডিও সংযুক্ত করে ভিডিওটি প্রচার করা হয়েছে।

বক্তব্যের দৃশ্য দাবিতে ছড়িয়ে পড়া আরেকটি ভিডিও (১,২,৩,৪) নিয়ে অনুসন্ধানে বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি)-এর ইউটিউব চ্যানেলে ২০২২ সালের ১১ ডিসেম্বর প্রকাশিত একটি ভিডিও পাওয়া যায়। ভিডিওটিতে শেখ হাসিনার পরিহিত পোশাকের সঙ্গে আলোচিত ভিডিওটির মিল রয়েছে। তবে বক্তব্যের অডিওতে ভিন্নতা দেখা যায়। মূল ভিডিওটি ২০২২ সালের বিজয় দিবস উপলক্ষে জাতির উদ্দেশে দেওয়া শেখ হাসিনার ভাষণের। সেখানে ওই উপলক্ষ্যসংক্রান্ত বক্তব্য শোনা গেলেও আলোচিত ভিডিওতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন প্রসঙ্গে তাকে কথা বলতে শোনা যায়। ভিডিওটি পর্যবেক্ষণে আরও দেখা যায়, শেখ হাসিনার ঠোঁটের নড়াচড়ার সঙ্গে যুক্ত অডিওর কোনো সামঞ্জস্য নেই। পাশাপাশি ভিডিওটির পেছনের দৃশ্যে ভারতের পতাকা যুক্ত করা হয়েছে। অর্থাৎ, ২০২২ সালের একটি পুরোনো ভিডিও সম্পাদনা করে তাতে ভিন্ন অডিও সংযুক্ত করা এবং পেছনের দৃশ্য পরিবর্তনের মাধ্যমে আলোচিত দাবিতে ভিডিওটি প্রচার করা হয়েছে।

বক্তব্যের দৃশ্য দাবিতে ছড়িয়ে পড়া শেষ ভিডিওটি (১,২,৩) নিয়ে অনুসন্ধানে এনটিভির ইউটিউব চ্যানেলে ২০২৪ সালের ১ আগস্ট প্রকাশিত একটি ভিডিও পাওয়া যায়। এতে শেখ হাসিনার পরিহিত পোশাকের সঙ্গে আলোচিত ভিডিওটির মিল রয়েছে। ভিডিওটির বিবরণ অনুযায়ী, এটি জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে আয়োজিত কৃষক লীগের একটি আলোচনা সভায় শেখ হাসিনার বক্তব্যের দৃশ্য। তবে আলোচিত ভিডিওটি পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, আগের ভিডিওগুলোর মতো এখানেও বক্তব্যের অডিও পরিবর্তন করা হয়েছে। অর্থাৎ, পুরোনো ভিডিওর দৃশ্য ব্যবহার করে ভিন্ন অডিও সংযুক্ত করে এটি প্রচার করা হয়েছে।

উপরের আলোচনায় দেখা যায়, আলোচিত ওই সংবাদ সম্মেলনে শেখ হাসিনা সেদিন সশরীরে বা প্রকাশ্যে উপস্থিত হয়ে বক্তব্য দিয়েছেন এমন দাবিতে অন্তত ১২টি ভিডিও ও একটি ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। তবে বাস্তবে তিনি সেদিন সশরীরে বা প্রকাশ্যে বক্তব্য রেখেছিলেন কি না, সে বিষয়ে অনুসন্ধান করা হয়। এ বিষয়ে বিবিসি বাংলার একটি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ওই সংবাদ সম্মেলনের জন্য শেখ হাসিনা রেকর্ড করা অডিও বার্তা পাঠাবেন। পরবর্তীতে সংবাদ সম্মেলনটির আয়োজক ফরেন করেস্পন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া এফসিসির ইউটিউব চ্যানেলে সেদিনের লাইভ সম্প্রচার পাওয়া যায়। ভিডিওটি পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, সেখানে শেখ হাসিনার দুটি অডিও বার্তা শোনানো হয়, একটি ইংরেজিতে এবং অন্যটি বাংলায়। ইংরেজি বক্তব্য শুরুর আগে একজন বক্তা বলেন, শেখ হাসিনা অনুষ্ঠানটি শুনছেন ও দেখছেন, তবে তিনি ভিডিওর মাধ্যমে যুক্ত হতে পারছেন না এবং আয়োজকদের কাছে কেবল তার অডিও বার্তাই রয়েছে। এদিকে ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লিতে শেখ হাসিনার বক্তব্য প্রচারের সুযোগ দেওয়াকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশের অন্তর্বর্তী সরকার বিস্ময় ও ক্ষোভ প্রকাশ করে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়, ওই বক্তব্যে বাংলাদেশে সরকার উৎখাত এবং আসন্ন জাতীয় নির্বাচন ভণ্ডুল করার উদ্দেশ্যে সহিংসতায় উসকানি দেওয়া হয়েছে, যা বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক উত্তরণ এবং শান্তি ও নিরাপত্তাকে ঝুঁকির মুখে ফেলছে।
আওয়ামী লীগের ওই সংবাদ সম্মেলন নিয়ে রিউমর স্ক্যানারের শনাক্ত করা সর্বশেষ দাবিতে (১,২,৩) বলা হয়, শেখ হাসিনার বক্তব্য সংবলিত লাইভটি এক ঘণ্টায় প্রায় ১১ কোটি মানুষ দেখেছে। তবে অনুসন্ধানে জানা যায়, এই তথ্যটি সত্য নয়। প্রকৃতপক্ষে, ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম বাংলাভিশনের আদলে পরিচালিত ‘GojobVision’ নামের একটি স্যাটায়ার পেজ থেকে এমন দাবিতে একটি ফটোকার্ড পোস্ট করা হয়। পরবর্তীতে সেটিকেই বাস্তব ঘটনা হিসেবে প্রচার করা শুরু হয়।

বাস্তব তথ্য অনুযায়ী, শেখ হাসিনার বক্তব্য সংবলিত ওই লাইভ ভিডিওটি আয়োজকদের ইউটিউব চ্যানেলে এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত প্রায় এক লাখ পঁচাশি হাজার ভিউ পেয়েছে। বিবিসির প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সংবাদ সম্মেলন শুরু হওয়ার পর দর্শকসংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকে। প্রথম ২০ মিনিটে লাইভ সম্প্রচারে যুক্ত হন ১৩ হাজার ৮০৯ জন, ৩৩ মিনিটে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৫৪ হাজারে এবং ভারতীয় সময় সন্ধ্যা ৬টা ৪০ মিনিটে দর্শকসংখ্যা পৌঁছায় ৯২ হাজার ৫২৫ জনে। এক পর্যায়ে দর্শকসংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়ে যায়, ঠিক তখনই শেখ হাসিনার রেকর্ড করা অডিও বার্তা প্রচার হচ্ছিল। তবে অডিও বার্তা শেষ হওয়ার পর আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রশ্নোত্তর পর্ব শুরু হলে দর্শকসংখ্যা দ্রুত কমতে থাকে এবং তা আড়াই হাজারের কাছাকাছি নেমে আসে।

