অন্তর্বর্তীকালীন কিংবা বিএনপি নয়, ট্রাফিক সিগন্যালে প্রথমবারের মতো এআই ক্যামেরা ব্যবহার করেছে আ.লীগ সরকার

সম্প্রতি রাজধানীর সড়কে ট্রাফিক আইনের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে এআই-প্রযুক্তির ক্যামেরা স্থাপনের বিষয়টি নিয়ে অনলাইনে বেশ আলোচনা চলছে। এরই প্রেক্ষিতে সম্প্রতি অনলাইনে দাবি প্রচার করা হয়েছে, প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে ট্র্যাফিক সিগন্যালে এআই ক্যামেরা ব্যবহারের উদ্যোগ বিএনপি সরকার নিয়েছে।

এরূপ দাবিতে ফেসবুক প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ) এবং এখানে (আর্কাইভ)।

এরূপ দাবিতে ইনস্টাগ্রামে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।

এরূপ দাবির বিপরীতে ফেসবুক ভিত্তিক নানা সংবাদমাধ্যম পেজসহ নানা পেজ ও অ্যাকাউন্ট থেকে দাবি করা হয়েছে, প্রথমবারের মতো বাংলাদেশে ট্র্যাফিক সিগন্যালে এআই ক্যামেরা ব্যবহারের উদ্যোগ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিয়েছে।

ফেসবুকে প্রচারিত এরূপ পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ) এবং এখানে (আর্কাইভ)।

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, ঢাকায় বা ঢাকার বাইরে ট্র্যাফিক সিগন্যালে এআই ক্যামেরা ব্যবহারের উদ্যোগ প্রথমবারের মতো বিএনপি সরকার বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কেউই নেয়নি, বরং বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেই এরূপ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং সেসময় ক্ষেত্র বিশেষে তা বাস্তবায়নও করা হয়েছে।

এ বিষয়ে অনুসন্ধানে প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চ করলে ২০২৩ সালের ২৬ সেপ্টেম্বরে মূলধারার সংবাদমাধ্যম যুগান্তর এর ওয়েবসাইটে ‘ট্রাফিক সিগন্যালে এআই ক্যামেরা’ শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, লাল-সবুজ-হলুদ বাতির পর দেশের ট্রাফিক সিস্টেমে যুক্ত হয়েছে এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা)। রাস্তায় বসানো হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন (এআই) সিগন্যাল সিস্টেম। প্রাথমিকভাবে ঢাকার গুলশান-২ সিগন্যালে পরীক্ষামূলকভাবে এ পদ্ধতি চালু করা হয়েছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন সিগন্যাল মেনটেন্যান্স সরঞ্জাম, সিসি ক্যামেরা, ইমেজ ক্যামেরা, ভিডিও ক্যামেরা ও অন্য সরঞ্জামাদি দিয়ে এই সিস্টেম চালু করা হয়েছে।

যুগান্তরের প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, গুলশান-২ নম্বর সিগন্যালে কর্মরত ট্রাফিক পুলিশ সদস্যরা বলছেন, লালবাতি জ্বলা অবস্থায় সাদা দাগ অতিক্রম করলেই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ট্রাফিক মামলা হবে। এতে ট্রাফিক আইন ভাঙার প্রবণতা ৯৯ শতাংশ কমে আসবে। এ আধুনিক ব্যবস্থাপনায় ট্রাফিক পুলিশের কষ্টও অনেকাংশেই কমে আসবে। লালবাতি জ্বলা মাত্র সবাই সতর্ক হয়ে যাবেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে সব ধরনের গাড়ির গতিবিধি। এআই ক্যামেরার মাধ্যমে কতগুলো গাড়ি ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করেছে তা দেখা যাচ্ছে। তথ্য বলছে, সেসময় এক মাসে শুধু এই সিগন্যালে ট্রাফিক আইন ভেঙেছে তিন লাখ গাড়ি।

এছাড়াও, অনুসন্ধানে ২০২৩ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর মূলধারার গণমাধ্যম ‘বাংলাভিশন” এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন (এআই) সিগন্যাল সিস্টেম বসানো হয়েছে ঢাকার গুলশান-২ সিগন্যালে যার মাধ্যমে সব ধরনের গাড়ির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে । এআই ক্যামেরার মাধ্যমে সিগন্যাল ছাড়ার আগে-পরে কতগুলো গাড়ি ট্রাফিক আইন ভঙ্গ করেছে তা নিরুপন করা হচেছ। জানা গেছে, গুলশান-২ সিগন্যালে ট্রাফিক আইন ভেঙেছে তিন লাখ গাড়ি। ট্রাফিক শৃঙ্খলা ফেরাতে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি) এই পদক্ষেপ নিয়েছে। পর্যায়ক্রমে রাজধানীর ১৭টি পয়েন্টে প্রাথমিকভাবে এ পদ্ধতি চালু করা হবে।’

প্রসঙ্গত, এর আগে ২০২৩ সালের ৩১ জানুয়ারিতে সংবাদমাধ্যম ‘ইত্তেফাক’ এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এক প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, নিরাপদ মহাসড়ক নিশ্চিত করতে ইন্টিগ্রেটেড ট্রাফিক ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড ইনসিডেন্ট ডিটেকশন সিস্টেম (আইটিমিডিএস) চালুর পরিকল্পনা করেছে আওয়ামী লীগ সরকার।

এর কার্যক্রম বিষয়ে ইত্তেফাক এর প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘আইটিএমআইডিএস কাজ করবে সিসিটিভি, ভিডিও, অডিও ফিডস এবং স্বয়ংক্রিয় নাম্বার প্লেট সনাক্তকরণ (এএনপিআর) প্রযুক্তির মাধ্যমে। পাশাপাশি ন্যাশনাল হাইওয়ে সেইফ করিডোর ডেমোন্সট্রেশন প্রজেক্ট সাইটসের সঙ্গেও কাজ করবে।’

এছাড়াও, অনুসন্ধানে অনলাইন সংবাদমাধ্যম ‘বাংলা ট্রিবিউন’ এর ওয়েবসাইটে ২০২৪ সালের ১১ ফেব্রুয়ারিতে প্রকাশিত আরেকটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের নিরাপত্তা জোরদারে ১৫২ কোটি টাকা ব্যয়ে মহাসড়কের ২৫০ কিলোমিটারজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাসম্পন্ন (এআই) সিসি ক্যামেরা বসানো হচ্ছে। অপরাধ শনাক্ত করে মুহূর্তেই পুলিশ কন্ট্রোলরুমে সতর্ক সংকেত পাঠাতে সক্ষম এই ক্যামেরা। ইতোমধ্যে এই ক্যামেরা অপরাধী ধরতে সাহায্য করেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ।

প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ক্যামেরা ও অপটিক্যাল ফাইবার স্থাপনের কাজ চৌদ্দগ্রাম পর্যন্ত সম্পন্ন হয়েছে। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) অর্থায়নে ১৫২ কোটি ৫৬ লাখ টাকার এই প্রকল্পের প্রায় ৭০ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। আর ১০০টি ক্যামেরা বসানোর কাজ বাকি আছে। ২০২১ সালের জুনে ‘হাইওয়ে পুলিশের সক্ষমতা বৃদ্ধি’ শীর্ষক প্রকল্পের অধীন ক্যামেরা বসানোর কাজ শুরু হয়েছিল। ২০২৩ সালের জুনে শেষ হওয়ার কথা ছিল। পরে প্রকল্পের মেয়াদ বাড়িয়ে ২০২৪ সালের জুন পর্যন্ত ধরা হয়।

অর্থাৎ, উপরোক্ত তথ্যপ্রমাণ বিশ্লেষণ করলে নিশ্চিত হওয়া যায় যে ঢাকা এবং ঢাকার বাইরে এআই ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ বিএনপি সরকার ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের আগে আওয়ামী লীগ সরকার নিয়েছে এবং ক্ষেত্র বিশেষে তা বাস্তবায়নও করা হয়েছে।

সুতরাং, ঢাকায় ট্র্যাফিক সিগন্যালে এআই ক্যামেরা ব্যবহারের উদ্যোগ প্রথমবারের মতো বিএনপি সরকার বা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার নিয়েছে শীর্ষক দাবিগুলো মিথ্যা।

তথ্যসূত্র

Share: