সম্প্রতি ‘মুক্তি পেলেন শিক্ষামন্ত্রী ড. দীপু মনি’ শিরোনামে মূলধারার গণমাধ্যম যমুনা টেলিভিশনের ডিজাইন সংবলিত একটি ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে। ফটোকার্ডে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের মন্ত্রী দীপু মনিকে ‘ঢাকা কেন্দ্রীয় জেল’ লেখা একটি গেটের সামনে ফুল দিয়ে বরণ করার সদৃশ একটি ছবিও সংযুক্ত করে প্রচার করা হয়েছে।

এরূপ দাবিতে ফেসবুকে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ) এবং এখানে (আর্কাইভ)।
এছাড়াও, টেক্সট আকারে দাবি প্রচার করা হয়েছে, ‘আলহামদুলিল্লাহ জামিনে মুক্তি পেয়েছেন সমাজকল্যাণ মন্ত্রী ড. দীপু মনি আপা।’
এরূপ দাবিতে ফেসবুকে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ) এবং এখানে (আর্কাইভ)।
এরূপ দাবিতে ইনস্টাগ্রামে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।
ফ্যাক্টচেক
রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ‘মুক্তি পেলেন শিক্ষামন্ত্রী ড. দীপু মনি’ শিরোনামে যমুনা টিভি আলোচিত ফটোকার্ড প্রকাশ করেনি। প্রকৃতপক্ষে, যমুনা টিভির ফটোকার্ড ডিজাইনের আদলে ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তার আলোচিত ফটোকার্ডটি তৈরি করা হয়েছে। এছাড়াও, দীপু মনির মুক্তি পাওয়ার ছবি দাবিতে প্রচারিত ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি করা হয়েছে। এবং টেক্সট আকারে প্রচারিত দাবিটির সূত্রপাত মূলত দীপু মনির নামে পরিচালিত এক ভুয়া ফেসবুক পেজের পোস্ট থেকে হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে দীপু মনি এখনও জামিন পাননি।
এ বিষয়ে অনুসন্ধানে আলোচিত ফটোকার্ডটি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, এতে যমুনা টিভির নাম, লোগো উল্লেখ রয়েছে। এরই সূত্র ধরে যমুনা টিভির ফেসবুক পেজ এবং ওয়েবসাইট পর্যবেক্ষণ করে এ সংক্রান্ত কোনো ফটোকার্ড বা সংবাদ খুঁজে পাওয়া যায়নি। যমুনা টিভির ইউটিউব চ্যানেলেও এ বিষয়ে কোনো সংবাদ বা তথ্য পাওয়া যায়নি।
এছাড়া, যমুনা টিভির ফেসবুক পেজে প্রচারিত ফটোকার্ডগুলোর সাথে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ফটোকার্ডটির তুলনা করলে শিরোনাম ও ফন্টের আকারে পার্থক্য দেখা যায়। এছাড়াও, যমুনা টিভির ফটোকার্ডে এরূপ সংবাদের ক্ষেত্রে ফটোকার্ড প্রচারের তারিখ উল্লেখ করা হয় কিন্তু আলোচিত ফটোকার্ডে তারিখের উল্লেখ নেই।

এ থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় সম্পাদনার মাধ্যমে যমুনা টিভির ফটোকার্ডের আদলে ভুয়া এই ফটোকার্ডটি তৈরি করা হয়েছে।
পরবর্তীতে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ফটোকার্ডে সংযুক্ত ছবির বিষয়ে অনুসন্ধানে ছবিটি আসল হওয়ার সপক্ষে কোনো নির্ভরযোগ্য তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি। ছবিটি পর্যবেক্ষণ করলে দীপু মনি, পাশে থাকা ব্যক্তিরা, তাদের গড়ন ও পারিপার্শ্বিক অবস্থায় অস্বাভাবিকতা লক্ষ্য করা যায় যা সাধারণত এআই প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি কনটেন্টে লক্ষ্য করা যায়।
পাশাপাশি, প্রচারিত ছবিটি এআই প্রযুক্তির সহায়তায় তৈরি কি না তা যাচাই করতে রিউমর স্ক্যানার টিম গুগলের বিশেষ শনাক্তকরণ প্রযুক্তি ‘SynthID’ ব্যবহার করে। গুগলের এই প্রযুক্তি এআই দিয়ে তৈরি ছবি, ভিডিও বা অডিওতে অদৃশ্য জলছাপ যুক্ত করে, যা খালি চোখে দেখা না গেলেও গুগলের নিজস্ব টুলের মাধ্যমে শনাক্ত করা যায়। ছবিটি সিন্থআইডি দিয়ে বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এই ছবিটির পুরো অংশ বা অনেকটা অংশই গুগল এআই ব্যবহার করে তৈরি বা এডিট করা হয়েছে। এছাড়া, ছবিটি এআই শনাক্তকারী প্ল্যাটফর্ম ‘হাইভ মডারেশন’ অনুযায়ী, ছবিটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় শতভাগ।
এ থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে প্রচারিত ছবিটি আসল নয় বরং, এআই প্রযুক্তির সাহায্যে তৈরি করা হয়েছে।
পরবর্তীতে টেক্সট আকারে দীপু মনির মুক্তি পাওয়ার দাবিতে প্রচারিত ফেসবুক পোস্টগুলো পর্যবেক্ষণ করলে তাতে সূত্র হিসেবে একটি ফেসবুক পোস্টের লিঙ্ক সংযুক্ত করতে দেখা যায়। উক্ত লিঙ্কে ক্লিক করলে দীপু মনির ছবি প্রোফাইল ছবিতে সংযুক্ত ও ‘ড. দীপু মনি’ নামের একটি ফেসবুক পেজে গত ২৬ এপ্রিলে প্রচারিত একটি পোস্ট পাওয়া যায়৷ পোস্টে লেখা হয়েছে, ‘আলহামদুলিল্লাহ মহামান্য আদালত জামিন মঞ্জুর করেছেন।’

পেজটির ‘ট্রান্সপারেন্সি’ বিভাগ পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় পেজটি গত ২৬ এপ্রিলে দীপু মনির নামে তৈরি করা হয়েছে এবং এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ হওয়া অবধি পেজটিতে মাত্র ১ হাজার ফলোয়ার রয়েছে। অপরদিকে দীপু মনির নামে ভেরিফাইড ফেসবুক পেজটি পর্যবেক্ষণ করলে তাতে এরূপ কোনো পোস্ট পাওয়া যায়নি৷ এ থেকে স্পষ্ট যে দীপু মনির নামে অতি সম্প্রতি তৈরি উপরোক্ত ফেসবুক পেজটি ভুয়া।
দীপু মনির জামিন হয়েছে কি না এ বিষয়ে অনুসন্ধানে প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চ করলে জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো’র ওয়েবসাইটে গত ২৬ এপ্রিলে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত ২৬ এপ্রিল একটি মামলায় দীপু মনিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের একটি মামলায় দীপু মনিসহ ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের সরকারের ৯ মন্ত্রী, উপদেষ্টা, সংসদ সদস্য ও আমলাকে গত ২৬ এপ্রিল সকালে কারাগার থেকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। শুনানি শেষে দীপু মনিসহ এ মামলার আসামিদের ট্রাইব্যুনালের হাজতখানায় নেওয়া হয়।
পাশাপাশি প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চে দীপু মনির জামিন হওয়ার বিষয়ে নির্ভরযোগ্য সূত্রে কোনো তথ্যপ্রমাণ পাওয়া যায়নি।
সুতরাং, দীপু মনির জামিন হয়েছে শীর্ষক দাবিটি মিথ্যা।
তথ্যসূত্র
- Rumor Scanner’s analysis
- Jamuna Television – Facebook Page
- Jamuna Television – Website
- AI Analysis
- Prothom Alo – হুইলচেয়ারে করে দীপু মনিকে দেখতে এলেন স্বামী


