প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিষয়ে ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন: প্রশংসার চেয়ে সমালোচনাই যেখানে বেশি 

ব্রিটিশ সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ এর ওয়েবসাইটে গত ২৪ মে “Sheikh Hasina is Asia’s iron lady” শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার এবং প্রাসঙ্গিক নানা ইস্যুতে পত্রিকাটির নিজস্ব বিশ্লেষণ স্থান পায়। 

কী আছে ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে?

‘দ্য ইকোনমিস্ট’ এর পুরো প্রতিবেদনটিই হুবহু বাংলায় অনুবাদ করা হলো :

ইকোনমিস্টের আলোচিত প্রতিবেদনটির শিরোনামের নিচেই সাব-হেডলাইনে লেখা রয়েছে “Her tragic past now threatens Bangladesh’s future.” এই লাইনটি বাংলায় অনুবাদ করলে দাঁড়ায়, “তার করুণ অতীত এখন বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে হুমকির মুখে ফেলেছে।”

মূল প্রতিবেদনে কী আছে তা জানা যাক এবার। 

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিশ্বের সবচেয়ে বেশি সময় ধরে থাকা নারী সরকার প্রধান, এবং উভয় লিঙ্গের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য একজন। দুই দশক ধরে ক্ষমতায় থেকে তিনি ১৭০ মিলিয়ন মানুষের দেশটিতে দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তার ক্ষমতার মেয়াদের বেশিরভাগ সময়ে দেশের গড় বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশ ছিল। ৭৫ বছর বয়সী শেখ হাসিনা তার দল আওয়ামী লীগের নেতৃত্ব দিয়ে এর মধ্যে পরপর তিনটিসহ মোট চার নির্বাচনে জয়লাভ করেছেন, যা ইন্দিরা গান্ধী বা মার্গারেট থ্যাচারের ক্ষমতার সময়কালের চেয়েও বেশি। আগামী বছরের শুরুর দিকে বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে তিনি জয়ী হবেন বলে আশা করছেন। যুক্তরাষ্ট্রের নর্দার্ন ভার্জিনিয়ার হোটেল স্যুটে তার সাক্ষাৎকার নিয়েছে দ্য ইকোনমিস্ট।

‘আমি এই দেশকে একটি ক্ষুধামুক্ত, দারিদ্র্যমুক্ত উন্নত দেশ হিসেবে তৈরি করতে চাই।’ তারপর ভয়ঙ্কর ইতিহাস, যা তার রাজনৈতিক ক্যারিয়ারের সূচনা করে এবং এখনও ছায়া হয়ে আছে সেসবের বিষয়টি উল্লেখপূর্বক তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, ‘আপনি কী ভাবতে পারেন, তারা আমার বাবাকে হত্যা করেছে?’

তার বাবা ও বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতি শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কাছ থেকে দেশটির রক্তক্ষয়ী স্বাধীনতা লাভের চার বছর পর ১৯৭৫ সালে সামরিক অভ্যুত্থানে নিহত হন। তার ১৭ জন ঘনিষ্ঠ আত্মীয় খুন হয়েছিলেন। সেই সময় শেখ হাসিনা ইউরোপে থাকায় বেঁচে যান। ‘তারা আমার দুই ভাইকে, আমার মাকে, আরেক মাত্র দশ বছর বয়সী ভাইকে হত্যা করেছে! আমার দুই বোন জামাই (কাজিন), আমার একমাত্র চাচা, একজন প্রতিবন্ধী, তাকেও হত্যা করেছে’- বলেন শেখ হাসিনা। অশ্রুসিক্ত নয়নে এসব কথা বলেন তিনি।

তার উপদেষ্টারা এই সাক্ষাৎকার গ্রহণকারী ইকোনমিস্টের প্রতিবেদককে সেই দীর্ঘকাল আগের ট্র্যাজেডি সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীকে জিজ্ঞাসা করতে বলেছিলেন। প্রতিবেদক সেটি জিজ্ঞেস না করলেও শেখ হাসিনা তা তুলে ধরেন, যা তিনি প্রায়ই করে থাকেন। এটি তার ক্ষতি এবং নিয়তির বিশাল অনুভূতিকে চিত্রিত করে এবং যার উপর তিনি একটি প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব হিসেবে নিজেকে গড়ে তুলেছেন। শেখ মুজিবের বিশাল প্রতিকৃতি পৃথিবীজুড়েই রয়েছে তার চেয়ারের পাশে হেলান দিয়ে, তিনি আছেন শত মানুষের বেস্টনীর মধ্যে। তিনি মাথা নোয়ান প্রতিকৃতির দিকে, যেন খুন হওয়া ব্যক্তিটিকে কথোপকথনে ডেকে আনা হলো। 

বাংলাদেশিদের সামনে প্রশ্ন হচ্ছে, তাদের নেত্রীর অভিযোগ বিষয়ক অনুভূতি এবং বংশগত অধিকার তার উত্তরাধিকার এবং তাদের ভবিষ্যতের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে কিনা। সাক্ষাৎকারটি তারই ইঙ্গিত দেয়।

কোনও রাজনীতিবিদই সমালোচনা পছন্দ করেন না। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী তার রেকর্ড অসম্পূর্ণ দাবি করে সামান্যতম কথাতেই ঝাঁপিয়ে পড়েন; এবং তার প্রতিক্রিয়া তার নিজের ব্যতীত প্রায় প্রতিটি বাংলাদেশী সরকারেরই দ্রুত সমালোচনারই ইঙ্গিত দেয়। দুর্নীতির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি তার বাবার স্থলাভিষিক্ত হওয়া সামরিক সরকারকে দায়ী করেন। একই সঙ্গে তার সরকারের সদস্যদের দুর্নীতিতে জড়িত থাকার অভিযোগে একটি প্রকল্পের অর্থায়ন থেকে সরে যাওয়ার ঘটনায় বিশ্বব্যাংককে অভিযুক্ত করেন। বিশ্বব্যাংক দুর্নীতির যে অভিযোগ তুলেছিল, সেটির কোনও অস্তিত্ব নেই বলেও দাবি করেন তিনি। বলেন, “হয়তো নিচের স্তরে আছে (দুর্নীতি)। তবে আজকাল তেমন নেই। তারা দুর্নীতির সাহস করলেও আমি ব্যবস্থা নেব!”

দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশের তালিকায় আফগানিস্তানের পরই আছে বাংলাদেশ। তালেবানের উত্থানে এই অঞ্চলে এখন সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দেশ আফগানিস্তান। এর কিছু গ্রাফ বাস্তবে একদলীয় রাষ্ট্রের লক্ষণ দেখায় যা শেখ হাসিনা তার পিতার উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণ করে তৈরি করেছেন।

শেখ হাসিনা ২০০৮ সালে পুনরায় র্নির্বাচিত হওয়ার আগে আওয়ামী লীগ এবং খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) মধ্যে বারবার ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে।

রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে, মিডিয়া, পুলিশ এবং আদালত সহ দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো কিছুটা স্বাধীনতা পেয়েছিল। এখন মিসেস জিয়া গৃহবন্দী, তার দলের কর্মী-সমর্থকদের মারধর করা হয়েছে, মিডিয়া ভীত এবং পুলিশ ও আদালত শেখ হাসিনার দলের অধীন। কাকতালীয়ভাবে নয়, তারা দেশের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দুটি দল।

আগামী নির্বাচন বিএনপিকে ফেরার পথ দেখাবে না। যদিও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একটি সুষ্ঠু ভোটের জন্য প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে দাবি করেছেন। তিনি বলেছেন, নির্বাচনে কেবল ‘প্রকৃত রাজনৈতিক দলকেই’ প্রতিদ্বন্দ্বিতা করার অনুমতি দেওয়া উচিত এবং তার বিরোধীরা কোনো মানদণ্ডের সঙ্গেই মানানসই নয়।

তিনি অর্ধশতাব্দী আগে সেনা শাসনের অধীনে গঠিত বিএনপিকে ‘একজন সামরিক শাসক কর্তৃক অবৈধভাবে গঠিত’ রাজনৈতিক দল বলে অভিযোগ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী অভিযোগ করে বলেন, “পাকিস্তানের সাবেক মিত্র দেশের সবচেয়ে বড় একটি ইসলামি দল; যাদের প্রায় সবাই যুদ্ধাপরাধী। আমাদের বক্তব্য হল, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ ছাড়া এমন কোনও দল নেই, যারা সত্যিই নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারে।”

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কঠোর কব্জায় থাকার কারণে বাংলাদেশ সম্ভবত কিছু ক্ষেত্রে উপকৃতও হচ্ছে। তবে তা বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির হার স্পষ্টতই খুব বেশি বাড়ায়নি। বর্তমান মেয়াদে ক্ষমতায় আসার আগেই এই প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধি পেয়েছিল। পূর্বের বিদ্যমান বিভিন্ন অবকাঠামো ও অন্যান্য উপাদানের কল্যাণে তা হয়েছে যার মধ্যে রয়েছে দেশের পোশাক শিল্প এবং অভিজাত এনজিওগুলোর সরবরাহ করা সেবা। তারপরও তিনি দেশের অবকাঠামো বিনিয়োগসহ বিভিন্ন নীতিমালা তৈরি করেছেন; যা প্রবৃদ্ধির গতি বজায় রাখতে সহায়তা করেছে, কোনো দুর্বল সরকার হলে এসব সম্ভব হতো না।

কিন্তু এই কর্তৃত্ববাদের কারণে আয় হ্রাস পেয়েছে। পোশাকের ওপর অত্যধিক নির্ভরশীল বাংলাদেশকে নতুন রপ্তানির বিকাশ ঘটানো দরকার। আর এই বাস্তবতা দেশটির সরকার খুব কমই মোকাবিলা করছে। (শেখ হাসিনা বলেছেন, বাংলাদেশ হস্তশিল্প ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের বিকাশের দিকে নজর দিচ্ছে। তবে এটি এক অপর্যাপ্ত সমাধান।) কিছু বাংলাদেশি বিতর্কের জন্ম দিয়ে তার কঠোরতায় লাগাম দিচ্ছে। হোটেলের বাইরে কয়েক শতাধিক বিক্ষোভকারী। অধিকার গোষ্ঠীগুলো বলছে, নির্বাচন সহিংস হতে পারে।

বাংলাদেশের গণতন্ত্র রক্ষায় যুক্তরাষ্ট্র হয়তো একসময় শেখ হাসিনাকে সতর্ক করেছিল। এখন দেশটি প্রধানত উদ্বিগ্ন এই কারণে যে শেখ হাসিনার চীনকে স্থান দেওয়া উচিত নয়, যা তার সরকার বিনিয়োগের জন্য প্রশ্রয় দিচ্ছে। ভারতের সাথে যেখানে তার ঘনিষ্ঠ ব্যক্তিগত সম্পর্ক রয়েছে। তারাও একই দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই তিন শক্তির সাথে সম্পর্ক ঢেলে সাজাতে পারদর্শী বলে মনে হয়। বাস্তববাদী হওয়ায় এটি তার একটি সফলতা। শেখ হাসিনা বলেন, ‘আমেরিকা এবং চীনের সম্পর্ক তাদের নিজেদের ব্যাপার। আমি কেন সেখানে নাক গলাবো?’ এরপর আমেরিকার সমালোচনা করেন তিনি। কারণ এই দেশটি এক সময় খালেদা জিয়ার অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিল। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘তারা বলে, তারা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র… কিন্তু আমাদের দেশে তারা এর চর্চা করে না। কেন তারা আমাকে সমর্থন করে না?’ 

আসলে তারা করে, কিন্তু সম্ভবত করা উচিত নয়। শেখ হাসিনার দীর্ঘ কর্মজীবন সাহসিকতার এবং ক্ষমতার নির্মম ব্যবহারের গল্প, কিছু নীতিগত সাফল্য যা তিনি দাবি করতে পারেন, এবং মহাকাব্যের মতো কোনো জাতীয় উন্নয়ন হয়তো তিনি ঘটাতে পারবেন না রাতারাতি, কিন্তু তিনি চেষ্টা করছেন। তার এই গল্পটি কীভাবে শেষ হবে তা দেখা কঠিন। তিনি ক্রমেই কর্তৃত্ববাদী এবং অসন্তুষ্ট হয়ে উঠছেন এবং তিনি নিশ্চিত করেছেন, অবসর নেওয়ার কোনও পরিকল্পনা নেই।

তার সরকারের সর্বশেষ পরিকল্পনার শিরোনাম হলো ভিশন-২০৪১। তবে তিনি এটি দেখে যেতে পারবেন না বলে স্বীকার করেছেন। নেতৃত্বের তৃতীয় দশক পেরিয়ে গেলেও উত্তরাধিকার পরিকল্পনা তার এজেন্ডায় নেই বলে জানিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘কারণ, আমি যদি না থাকি… তাহলে কে ক্ষমতায় আসবে, তা আমি জানি না।’

ইকোনমিস্ট কোন অর্থে শেখ হাসিনাকে আয়রন লেডি বলেছে? 

ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী পদে মার্গারেট থ্যাচার টানা দীর্ঘ ১২ বছর (১৯৭৯-১৯৯০) দায়িত্ব পালন করেছেন। এই পদে বসার বছর তিনেক আগে, ১৯৭৬ সালের জানুয়ারিতে রাশিয়ার সংবাদপত্র Krasnaya Zvezda তাকে আয়রন লেডি উপাধি দেয়। তবে ঠিক কী কারণে তাকে এই উপাধি দেওয়া হয়েছিল তা নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যম The Washington Post ২০১৩ সালে এক প্রতিবেদনে জানায়, Krasnaya Zvezda হচ্ছে একটি প্রপাগাণ্ডা আউটলেট। থ্যাচারের এই উপাধিটি অপমান (insult) করার উদ্দেশ্যে দেওয়া হয়েছিল। তবে ২০২২ সালে থ্যাচারের মন্ত্রীসভার একজন সদস্য জানান, থ্যাচারকে আয়রন লেডি উপাধি অপমান অর্থে দেওয়া হয়নি। বরং তার কিছু কট্টর বক্তৃতার জন্য তিনি এই উপাধি পেয়েছিলেন।

‘দ্য ইকোনমিস্ট’ শেখ হাসিনাকে ঠিক কোন অর্থে আয়রন লেডি নামে অভিহিত করেছে তা আমরা জানতে পারিনি। পত্রিকাটির এশিয়া প্রেস অফিসে আমরা এ বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করেছিলাম। কিন্তু এই প্রতিবেদন প্রকাশ হওয়া পর্যন্ত তাদের পক্ষ থেকে সাড়া মেলেনি। ইকোনমিস্ট তাদের প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার প্রশংসা যেমন করেছে তেমনি সমালোচনা করতেও ছাড়েনি। তাই শেখ হাসিনাকে আয়রন লেডি ইতিবাচক নাকি নেতিবাচক অর্থে বলা হয়েছে তা স্পষ্ট নয়। 

শেখ হাসিনার প্রশংসায় ইকোনমিস্ট

‘দ্য ইকোনমিস্ট’ তাদের প্রতিবেদনের শুরুর অংশে শেখ হাসিনা প্রসঙ্গে লিখেছে, “দুই দশক ধরে ক্ষমতায় থেকে তিনি ১৭০ মিলিয়ন মানুষের দেশটিতে দারিদ্র্য বিমোচনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। তার ক্ষমতার মেয়াদের বেশিরভাগ সময়ে দেশের গড় বার্ষিক প্রবৃদ্ধির হার ৭ শতাংশ ছিল।”

পত্রিকাটি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর প্রশংসা করে বলেছে, “শেখ হাসিনার কঠোর কব্জায় থাকার কারণে বাংলাদেশ সম্ভবত কিছু ক্ষেত্রে উপকৃতও হচ্ছে। তিনি দেশের অবকাঠামো বিনিয়োগসহ বিভিন্ন নীতিমালা তৈরি করেছেন; যা প্রবৃদ্ধির গতি বজায় রাখতে সহায়তা করেছে,কোনো দুর্বল সরকার হলে এসব সম্ভব হতো না।”

শেখ হাসিনার সমালোচনায় ব্রিটিশ এই পত্রিকা

প্রশংসার চেয়ে অবশ্য শেখ হাসিনাকে নিয়ে সমালোচনাই বেশি স্থান পেয়েছে পত্রিকাটির প্রতিবেদনে।

‘দ্য ইকোনমিস্ট’ লিখেছে, “বাংলাদেশিদের সামনে প্রশ্ন হচ্ছে, তাদের নেত্রীর অভিযোগ বিষয়ক অনুভূতি এবং বংশগত অধিকার তার উত্তরাধিকার এবং তাদের ভবিষ্যতের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে কিনা। সাক্ষাৎকারটি তারই ইঙ্গিত দেয়।”

বাংলাদেশকে একদলীয় রাষ্ট্রের সাথে তুলনা করে পত্রিকাটি বলছে, “এর (বাংলাদেশের) কিছু গ্রাফ বাস্তবে একদলীয় রাষ্ট্রের লক্ষণ দেখায় যা শেখ হাসিনা তার পিতার উচ্চাকাঙ্ক্ষা পূরণ করে তৈরি করেছেন।”

ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে বলা হয়, “এখন মিসেস জিয়া গৃহবন্দী, তার দলের কর্মী-সমর্থকদের মারধর করা হয়েছে, মিডিয়া ভীত এবং পুলিশ ও আদালত শেখ হাসিনার দলের অধীন। কাকতালীয়ভাবে নয়, তারা দেশের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত দুটি দল।”

শেখ হাসিনার বরাত দিয়ে ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ লিখেছে, বাংলাদেশ হস্তশিল্প ও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের বিকাশের দিকে নজর দিচ্ছে। তবে পত্রিকাটি এটিকে একটি অপর্যাপ্ত সমাধান হিসেবে অভিহিত করেছে।

ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণে বলা হয়, “শেখ হাসিনার দীর্ঘ কর্মজীবন সাহসিকতার এবং ক্ষমতার নির্মম ব্যবহারের গল্প, কিছু নীতিগত সাফল্য যা তিনি দাবি করতে পারেন এবং মহাকাব্যের মতো কোনো জাতীয় উন্নয়ন হয়তো তিনি ঘটাতে পারবেন না রাতারাতি, কিন্তু তিনি চেষ্টা করছেন। তার এই গল্পটি কীভাবে শেষ হবে তা দেখা কঠিন।”

প্রতিবেদনের শেষদিকে পত্রিকাটি শেখ হাসিনার সমালোচনা করে লিখেছে, “তিনি ক্রমেই কর্তৃত্ববাদী এবং অসন্তুষ্ট হয়ে উঠছেন এবং তিনি নিশ্চিত করেছেন, অবসর নেওয়ার কোনও পরিকল্পনা নেই।”

বাংলাদেশের গণমাধ্যমে ইকোনমিস্টের প্রতিবেদন

বাংলাদেশের অধিকাংশ গণমাধ্যমই দ্য ইকোনমিস্টের আলোচিত প্রতিবেদনটি প্রকাশিত হয়েছে। তবে প্রতিবেদনের পুরো অংশ কতিপয় গণমাধ্যমে স্থান পেলেও অধিকাংশ গণমাধ্যমই শেখ হাসিনার বিষয়ে ইকোনমিস্টের প্রশংসাসূচক বাক্যগুলোই শুধু রেখেছে।

ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনের অধিকাংশ অংশই উল্লেখ রেখেছে ঢাকা টাইমস, দৈনিক সংগ্রাম

ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে স্থান পাওয়া শেখ হাসিনার বিষয়ে প্রশংসাসূচক বাক্যের পাশাপাশি সমালোচনামূলক বাক্যগুলো আংশিকভাবে এসেছে ঢাকা ট্রিবিউন, ঢাকা পোস্ট, আমাদের সময়, আমাদের নতুন সময়, ডেইলি ক্যাম্পাস এর প্রতিবেদনে।

ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনে স্থান পাওয়া সমালোচনামূলক বাক্যগুলো এড়িয়ে গিয়ে প্রশংসাসূচক বাক্যগুলো ব্যবহার করে প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে সময় টিভি, সময় টিভি (ইউটিউব), একাত্তর টিভি, একাত্তর টিভি (ইউটিউব), চ্যানেল২৪, কালবেলা, কালবেলা (ইউটিউব), সমকাল, যুগান্তর, চ্যানেল আই, বাংলা ট্রিবিউন, ডিবিসি নিউজ (ইউটিউব), এটিএন নিউজ (ইউটিউব), বাংলাভিশন (ইউটিউব), বাংলাভিশন, আরটিভি, একুশে টিভি, নিউজ২৪, ভোরের কাগজ, দেশ রূপান্তর, সংবাদ, যায়যায়দিন, প্রতিদিনের বাংলাদেশ, এশিয়ান টিভি, বাংলা ইনসাইডার, আমার সংবাদ, শেয়ার বিজ, বাংলাদেশ জার্নাল, নিউজজি২৪, রাইজিং বিডি, বিবার্তা২৪, নয়া শতাব্দী, স্টার সংবাদ, বাংলাদেশ বুলেটিন, বিডি২৪ লাইভ, বায়ান্ন টিভি, সময়ের আলো, গ্লোবাল টিভি (ইউটিউব), বাহান্ন নিউজ, অর্থ সংবাদ, বহুমাত্রিক, এবিনিউজ২৪, দ্য রিপোর্ট লাইভ, ডেইলি মেসেঞ্জার, জুম বাংলা, সোনালি নিউজ, আজকের সংবাদপত্র, বাংলাদেশ টাইমস, বিজনেস বাংলাদেশ, সংবাদ সারাবেলা, বিজনেস ইনসাইডার বিডি, রেডিও টুডে, ঢাকা টুডে, নতুন সময়, মত ও পথ, সান বিডি, নিউজ নাউ বাংলা

সুতরাং, ব্রিটিশ সাপ্তাহিক পত্রিকা ‘দ্য ইকোনমিস্ট’ কর্তৃক সম্প্রতি “Sheikh Hasina is Asia’s iron lady” শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সাক্ষাৎকার এবং প্রাসঙ্গিক নানা ইস্যুতে পত্রিকাটির নিজস্ব বিশ্লেষণ স্থান পায়। উক্ত প্রতিবেদনে শেখ হাসিনার যেমন প্রশংসা করা হয় ঠিক তেমনি নানা ইস্যুতে তার বিরুদ্ধে সমালোচনা মুখর ছিল পত্রিকাটি। প্রতিবেদনটির প্রায় পুরো অংশ কতিপয় গণমাধ্যমে স্থান পেলেও অধিকাংশ গণমাধ্যমই শেখ হাসিনার বিষয়ে ইকোনমিস্টের প্রশংসামূলক বাক্যগুলোই শুধু রেখেছে। এতে করে গণমাধ্যমের দর্শক এবং পাঠকদের কাছে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে নিয়ে করা ইকোনমিস্টের প্রতিবেদনের  বিভ্রান্তিকর একটি বার্তাই গিয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়। 

তথ্যসূত্র

Share: