নির্বাচন ও অপতথ্য: রিউমর স্ক্যানারের কনটেন্টে ২১ মিলিয়ন ভিউ 

নির্বাচন বাংলাদেশের রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ৷ ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনের সাত মাসের মাথায় যখন আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতাচ্যুত হলো, তারপর থেকেই নির্বাচনের ১৩তম সংস্করণ কবে হবে তা নিয়ে আলোচনা ছিল। অবশেষে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার ১৮ মাস পর আয়োজিত হলো এই নির্বাচন৷ ১২ ফেব্রুয়ারির এই নির্বাচনে ৫০টি দল অংশ নেয়, ভোট পড়ে ৫৯ শতাংশের বেশি। নির্বাচন ঘিরে দেড় বছরের বেশি সময় ধরে দলগুলো যেমন প্রস্তুতি নিচ্ছিল তেমনি প্রস্তুত হচ্ছিল রিউমর স্ক্যানারও। ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকেই এই নির্বাচন নিয়ে মনিটরিং শুরু করে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ এই ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠানটি। ১ হাজারের বেশি অপতথ্য শনাক্ত, তিনটি পরিসংখ্যান, তিনটি ফ্যাক্টস্টোরি, চারটি ফ্যাক্টফাইলসহ ওয়েবসাইট ও সামাজিক মাধ্যমে নির্বাচনের তিনদিনে প্রায় দুই কোটি ১২ লক্ষাধিক ভিউ পেয়েছে রিউমর স্ক্যানার।

২০২৫ সালের ০৮ জানুয়ারি আনুষ্ঠানিকভাবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সংক্রান্ত অপতথ্য শনাক্ত শুরু করে রিউমর স্ক্যানার। প্রথমদিকে স্বাভাবিকভাবেই অপতথ্যের প্রবাহ কম দেখা যাচ্ছিল। মে মাস পর্যন্ত ৩৯টি অপতথ্য শনাক্ত হয়। পরের মাসেই এ সংক্রান্ত একটি পরিসংখ্যান প্রকাশ করে রিউমর স্ক্যানার জানায়, আগের পাঁচ মাসে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও সরকারের উচ্চপদস্থ কর্তা-ব্যক্তিদের নামে ভুয়া এবং সম্পাদিত বক্তব্যের মাধ্যমে সিংহভাগ অপতথ্য প্রচার করা হয়েছে। জুন থেকে নভেম্বরের মধ্যে ১৬০টি অপতথ্য শনাক্ত হয়। এরপর এলো ১১ ডিসেম্বর। ঘোষণা করা হলো তফসিল, জানা গেল ১২ ফেব্রুয়ারি হবে নির্বাচন এবং একই দিনে গণভোটেও অংশ নেবেন ভোটাররা। এরপরই মূলত শুরু নির্বাচনী আনুষ্ঠানিকতা। অপতথ্যের প্রবাহও বাড়তে শুরু করেছিল সে সময় থেকেই৷ 

৩১ জানুয়ারি রিউমর স্ক্যানার এক প্রতিবেদনে জানায়, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে চলতি বছরের জানুয়ারি পর্যন্ত দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও নির্বাচন কেন্দ্রিক ভুয়া জরিপ সংক্রান্ত ১৮টি ফ্যাক্টচেক প্রকাশিত হয়েছে। ভুয়া এসব জরিপের জরিপকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়েছে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নাম। জড়ানো হয়েছে জাতিসংঘকেও। এছাড়া, একই প্রতিবেদনে রিউমর স্ক্যানার কর্তৃক দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিচালিত একটি জরিপের ফলাফলও উপস্থাপন করা হয়েছে। গত বছরের নভেম্বরের এই জরিপে শিক্ষার্থীদের ভোটদানে আগ্রহ, নির্বাচনে অপতথ্যের প্রবাহ সংক্রান্ত নানা প্রশ্ন করা হয়।

রিউমর স্ক্যানার এক পরিসংখ্যানে দেখিয়েছে, তফসিল ঘোষণা পরবর্তী সময় থেকে প্রার্থীদের আনুষ্ঠানিক প্রচারণাকালীন সময়ের মধ্যে অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে ৫৪৫টি। নির্বাচনের ৪৮ ঘন্টা পূর্বে, ৯ ফেব্রুয়ারি শেষ হয় প্রার্থীদের প্রচারণা। রিউমর স্ক্যানার জানায়, ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে নির্বাচন সংক্রান্ত অপতথ্যের ওপর নজরদারি শুরুর পর থেকে ৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সর্বমোট ৭৫৭টি অপতথ্য শনাক্ত হয়েছে।

১১ ফেব্রুয়ারি দুইটি ফ্যাক্ট ফাইল প্রকাশ করে রিউমর স্ক্যানার। এগুলোতে নির্বাচনকালীন সময়ের দুই মাসে গণমাধ্যমের ফটোকার্ড সম্পাদনা করে অপতথ্যের নিয়মিত প্রচার করেছে এমন একটি ফেসবুক পেজ ও একটি অ্যাকাউন্ট শনাক্তের কথা জানানো হয়। এর মধ্যে ‘বালবেলা নিউজ’ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে গণমাধ্যমের সম্পাদিত ফটোকার্ডের মাধ্যমে তারেক রহমানের নামে ৪৫টি ভুয়া মন্তব্য প্রচারের প্রমাণ পায় রিউমর স্ক্যানার। এছাড়া, ‘লাইভ টিভি’ নামের একটি ফেসবুক পেজ থেকে বিএনপির চার নেতার নামে মোট ২০টি সম্পাদিত ফটোকার্ড প্রচারের প্রমাণ মেলে। 

নির্বাচনের দিনে, ১২ ফেব্রুয়ারিতেও অপতথ্য ছিল এই মহাযজ্ঞের নীরব সঙ্গী। সেদিন ২৪ ঘন্টায় রিউমর স্ক্যানার ১০৪টি অপতথ্যের খোঁজ পায়। সেদিন সন্ধ্যায় একটি ভুঁইফোড় প্ল্যাটফর্মের সন্ধান পায় রিউমর স্ক্যানার। ‘Election Watch Bangladesh’ নামের প্ল্যাটফর্মটি থেকে নির্বাচনের দিন সন্ধ্যা থেকেই ফলাফল সংক্রান্ত বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার হচ্ছিল। এটির সাথে নির্বাচন কমিশনের কোনো সংশ্লিষ্টতা ছিল না, তবু ‘সরকারি’ বলে বিভ্রান্তি ছড়াচ্ছিল।

সবমিলিয়ে, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে এই প্রতিবেদন প্রকাশ পর্যন্ত অন্তত ১০৫৪টি অপতথ্য শনাক্ত করেছে রিউমর স্ক্যানার৷

নির্বাচনকে সামনে রেখে নানা পরিকল্পনা নিয়েছিল রিউমর স্ক্যানার। এক্ষেত্রে ২০২৪ সালের পূর্ববর্তী নির্বাচনের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়েছে দেশের সম্মুখ সারির এই ফ্যাক্টচেকিং প্রতিষ্ঠানের সদস্যরা। ২০২৫ সালের শুরু থেকেই নানা সময়ে পূর্ব অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে নানা বিষয়ে পরিকল্পনা এবং তার বাস্তবায়নের কাজ এগোচ্ছিল। রাজনৈতিক নানা ঘটনাপ্রবাহ নিবিড়ভাবে নজর রাখার পাশাপাশি সময়ে সময়ে প্রযুক্তির পরিবর্তিত ধরণের সাথে খাপ খাওয়াতে হয়েছে ফ্যাক্টচেকারদের। বড় চ্যালেন্জ ছিল এআই কনটেন্ট নিয়েই৷ নির্বাচন কমিশনের কর্তাদের কণ্ঠেও এ নিয়ে শঙ্কার বাণী শোনা গিয়েছিল। বাস্তবতাও একই পথ দেখাচ্ছিল। এক বছরে আমরা প্রায় সাড়ে সাত শতাধিক এআই কনটেন্ট শনাক্ত করি যেগুলোর সিংহভাগই ছিল রাজনৈতিক অপপ্রচারের উদ্দেশ্যে তৈরি। জানুয়ারিতে আমরা এমন একটি ফেসবুক পেজের খোঁজ দেই, যেটি থেকে ভোটের লড়াইয়ে বিএনপি জামায়াতের পক্ষে বিপক্ষে মন্তব্য নিয়ে এআই ভিডিও বানিয়ে প্রচার করা হচ্ছিল। এসব ভিডিও দেখা হয়েছে প্রায় ১০ মিলিয়নের বেশি বার। সে মাসেই নির্বাচনকালীন সময়ের চারটি অপতথ্যের ধরণ জানিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করে রিউমর স্ক্যানার, যাতে বলা হয়, এআই কনটেন্ট, সাম্প্রদায়িক প্রোপাগাণ্ডা, ভুয়া ফটোকার্ড আর নারী প্রার্থীদের নিয়ে অপতথ্যের প্রবাহ বাড়তে পারে৷ এর মধ্যে পরবর্তী দিনগুলোয় এআই কনটেন্ট এবং ভুয়া ফটোকার্ডের ব্যবহার আশঙ্কাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছিল। 

নির্বাচনের সবচেয়ে চ্যালেন্জিং সময় ধরা হয় তিনদিনকে। নির্বাচনের আগের দিন, নির্বাচনের দিন এবং নির্বাচনের পরদিন। এই সময়সূচিকে লক্ষ্য করে ০৯ ফেব্রুয়ারি থেকেই প্রস্তুতি শুরু করে রিউমর স্ক্যানার। সেদিন থেকেই ওয়েবসাইটে লাইভ আপডেট ফিড চালু করা হয়। ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রতিদিনই এই সেবার মাধ্যমে অপতথ্যের বিপরীতে সঠিক তথ্য তাৎক্ষণিকভাবে তুলে ধরা হয়। পাঁচদিনে লাইভ আপডেটের মাধ্যমে ১৭০টি অপতথ্য শনাক্ত করে প্রচার করা হয়। ০৯ ফেব্রুয়ারি থেকেই নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়া অপতথ্য দ্রুত মোকাবেলার লক্ষ্যে ওয়েবসাইটের প্রতিবদেনগুলো সংক্ষিপ্ত ফরমেটে প্রকাশ করা শুরু হয় যা ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অব্যাহত ছিল। ১১ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি এই তিনদিন ওয়েবসাইটে ইউনিক ভিজিটর ছিল প্রায় ১ লক্ষাধিক। একই সময়ে সাইটের পেজগুলো ভিউ হয়েছে ১ লক্ষ ৬০ হাজারের বেশি বার। এর মধ্যে ১২ ফেব্রুয়ারির লাইভ আপডেট পাতাই সবচেয়ে বেশিবার (প্রায় ৪৩ হাজার) দেখা হয়েছে।

অপতথ্যের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক সাড়াদান এবং মানুষের সাথে সরাসরি যোগাযোগ রাখতে নির্বাচনকালীন প্রায় পুরো সময়েই হোয়াটসঅ্যাপে হটলাইন নাম্বারটিকে সক্রিয় রাখা হয়। ফেব্রুয়ারির প্রথম ১৩ দিনে হোয়াটসঅ্যাপে মানুষের নানা জিজ্ঞাসার প্রেক্ষিতে প্রায় সাড়ে তিন শতাধিক মেসেজের উত্তর প্রদান করা হয়েছে৷ নির্বাচনের রাতে রিউমর স্ক্যানারের ফেসবুক পেজে এই হটলাইন নাম্বার নিয়ে পোস্ট করার পর মেসেজ আসার হার কয়েক গুণ বেড়ে যায়। নির্বাচনের দিনই প্রায় পাঁচ শতাধিক মেসেজ আসে হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বারটিতে।


শুধু অপতথ্য শনাক্তই নয়, নির্বাচনকালীন সময়ে অপতথ্যের বিপরীতে সঠিক তথ্য পৌঁছে দিতে নানা উদ্যোগ নেয় রিউমর স্ক্যানার। কাজে লাগানো হয় সামাজিক যোগাযোগের প্রায় সকল প্ল্যাটফর্ম। খোলা হয় ফেসবুকে নির্বাচন সংক্রান্ত আলাদা একটি পেজও

১১ থেকে ১৩ ফেব্রুয়ারি ফেসবুকে রিউমর স্ক্যানারের মূল পেজ, নির্বাচন সংক্রান্ত পেজ, বাংলাইংরেজি নামের দুই গ্রুপের কনটেন্টে সবমিলিয়ে সর্বমোট ২১ মিলিয়ন ভিউজ এসেছে। এর মধ্যে মূল পেজের আটটি ভিডিওই দেখা হয়েছে প্রায় পাঁচ মিলিয়ন বার।

এসব কনটেন্ট নিয়মিত পুনরায় প্রকাশ ও প্রচার করেছে দেশের মূল ধারার গণমাধ্যমগুলো। নির্বাচনের তিনদিনেই ৩২টি এমন খবর প্রচারিত হয়েছে গণমাধ্যমগুলোতে। এর মধ্যে জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো ১৩ ফেব্রুয়ারি প্রিন্ট সংস্করণে ‘উৎসবের ভোটের মধ্যেও ছিল অপতথ্যের বিস্তার’ শিরোনামে এবং এর আগের দিন দ্য ডেইলি স্টার ‘Disinformation spreads on the eve of election’ শিরোনামে রিউমর স্ক্যানারের তথ্য তুলে ধরে। রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা ‘বাসস’ ১২ ফেব্রুয়ারি রিউমর স্ক্যানারের পরিসংখ্যানের সূত্র ধরে জানায়, তারেক রহমান সর্বোচ্চ গুজবের শিকার হয়েছেন৷ মূল ধারার গণমাধ্যম একাত্তর টিভি এক বছরের বেশি সময় ধরে ‘Fake News Scanner’ নামে প্রতিদিন একটি অনুষ্ঠান করে আসছে, যাতে নিয়মিতই রিউমর স্ক্যানারের কনটেন্টগুলো দেখানো হয়। নির্বাচনের আগে পরে ১০১৪ ফেব্রুয়ারির অনুষ্ঠান দুইটিতেও রিউমর স্ক্যানারের ফ্যাক্টচেক দেখানো হয় যেগুলোতে ভিউ এসেছে প্রায় দুই লক্ষ ৪২ হাজারের বেশি৷ এর বাইরে নির্বাচনের পরদিন গণমাধ্যমটি রিউমর স্ক্যানারের একটি পরিসংখ্যান নিয়ে ভিডিও প্রতিবেদন প্রচার করে যা ফেসবুকে দেখা হয়েছে প্রায় এক লক্ষ ২৮ হাজার বার। তিনদিনে অফিশিয়াল পেজে ফলোয়ার যুক্ত হয়েছে প্রায় ২৪ হাজার।

গত ০৯ ফেব্রুয়ারি দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগ এনে এনসিপি মনোনীত প্রার্থী নাহিদ ইসলামের প্রার্থিতা স্থগিত চেয়ে রিট করেন ঢাকা-১১ আসনের জাপা প্রার্থী শামীম আহমেদ। আবেদনে বলা হয়, নাহিদ ইসলাম ২০২৫ সালের ২০ এপ্রিল ক্যারিবিয়ান দ্বীপ রাষ্ট্র ডোমিনিকার নাগরিকত্ব নেন। তবে রিউমর স্ক্যানার গত ২০ জানুয়ারি এ সংক্রান্ত একটি ফ্যাক্টচেকে জানায়, নাহিদ ডোমিনিকার নাগরিকত্ব নিয়েছেন দাবিতে প্রচারিত পাসপোর্টের ছবিটি আসল নয়। প্রকৃতপক্ষে, ইন্টারনেট থেকে ডোমিনিকান পাসপোর্টের একটি নমুনা বা টেম্পলেট সংগ্রহ করে তাতে নাহিদ ইসলামের ছবি ও স্বাক্ষর ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় যুক্ত করে এই ভুয়া পাসপোর্টটি তৈরি করা হয়েছে। অর্থাৎ, ভুয়া তথ্যের ওপর নির্ভর করে আদালতে রিট হয়৷ সেদিন নাহিদ ইসলামএনসিপির পেজ থেকে এ সংক্রান্ত রিউমর স্ক্যানারের পূর্বের পোস্ট শেয়ার করার পর তা আলোচিত হয়। প্রচার হয় গণমাধ্যমেও। যমুনা টিভির এ সংক্রান্ত ফেসবুক পোস্টে প্রায় ৬১ হাজার রিয়েকশন এসেছে।

নির্বাচনের বৈতরণী পার হয়ে সামনের দিনগুলোতে মানুষের আস্থার প্রতিদান দিতে নিরপেক্ষ ভূমিকায় দৃঢ় প্রতিজ্ঞ থাকবে রিউমর স্ক্যানার বাংলাদেশ।

Share: