‘ডিজিটাল শিল্পকর্মকে’ এপস্টিন ফাইলের বাস্তব দৃশ্য হিসেবে প্রচার

জেফরি এপস্টিন ছিলেন একজন ধনী আমেরিকান বিনিয়োগকারী এবং দোষী সাব্যস্ত যৌন অপরাধী। প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে গড়ে তোলা উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগকে কাজে লাগিয়ে তিনি কিশোরী মেয়েদের যৌন নির্যাতন ও পাচারের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। ২০১৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল যৌন পাচারের অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে বিচারপ্রক্রিয়া শুরু হওয়ার আগেই নিউইয়র্কের একটি কারাগারে তার ঝুলন্ত মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এপস্টিনের মৃত্যু আত্মহত্যা নাকি হত্যাকাণ্ড তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে ব্যাপক বিতর্ক এবং নানা ষড়যন্ত্র তত্ত্বের জন্ম হয়। পরবর্তীতে যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ আনুষ্ঠানিকভাবে জানায়, এপস্টিন আত্মহত্যা করেছেন।

এপস্টিন-সংক্রান্ত নথি আগেও বিভিন্ন সময়ে সীমিত পরিসরে প্রকাশিত হয়েছিল। তবে ২০২৬ সালে ‘এপস্টিনফাইলস ট্রান্সপারেন্সি অ্যাক্ট’-এর আওতায় যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগ এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় পরিসরের নথি প্রকাশ করে। এতে প্রায় ৩৫ লাখ পৃষ্ঠার নথি, দুই হাজারেরও বেশি ভিডিও এবং প্রায় এক লাখ আশি হাজার ছবি অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। এপস্টিন-সংক্রান্ত এই বিশাল তথ্যভাণ্ডারই পরিচিত ‘এপস্টিনফাইলস’ নামে। এসব নথি প্রকাশের পর বিশ্বব্যাপী তা নিয়ে আলোচনা ও সমালোচনা শুরু হয়।

এপস্টিন ফাইলকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ছবি নিয়ে একটি দাবি ছড়িয়ে পড়ে। দাবিতে বলা হয়, ছবিটিতে দুটি ভাজা মুরগির মাঝখানে একটি শিশুর রোস্ট দেখানো হয়েছে।

উক্ত দাবিতে ফেসবুকে প্রচারিত কিছু পোস্ট দেখুন: এখানে, এখানে, এখানে, এখানে

একই দাবিতে ইন্সটাগ্রামে প্রচারিত পোস্ট দেখুন: এখানে

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, আলোচিত ছবিটিতে দুটি ভাজা মুরগির মাঝখানে কোনো শিশুর রোস্ট দেখানো হয়নি। ছবিটি কোনো বাস্তব ঘটনার দৃশ্য নয় এবং এটি জেফরি এপস্টিনের তোলা কোনো ছবিও নয়। প্রকৃতপক্ষে, ছবিটি হেরাল্ড সাইওয়ার্ট নামের এক শিল্পীর তৈরি একটি ‘ডিজিটাল শিল্পকর্ম’।

অনুসন্ধানে লেবানিজ-অস্ট্রেলিয়ান উদ্যোক্তা মারিও নওফালের একটি এক্স পোস্ট পাওয়া যায়। সেখানে তিনি জানান, ‘মুরগি ও মানুষের পায়ের আলোচিত ছবিটি এপস্টিন ফাইলসে থাকলেও বিষয়টি যেভাবে দাবি করা হচ্ছে, তা সঠিক নয়। এটি হেরাল্ড সাইওয়ার্টের তৈরি একটি শিল্পকর্ম, যেখানে মাঝখানের ব্যক্তিকে ডিজিটাল এডিটের মাধ্যমে যুক্ত করা হয়েছে। ছবিটি এপস্টিনের গুগল ড্রাইভে অন্যান্য এলোমেলোভাবে সংরক্ষিত ছবির সঙ্গে পাওয়া যায়। বিভ্রান্তি ছড়ানোর উদ্দেশ্যে ছবিটির ওয়াটারমার্ক কেটে দেওয়া হচ্ছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।’


যুক্তরাষ্ট্রের বিচার বিভাগের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত এপস্টিন ফাইলসে ছবিটির অস্তিত্ব পাওয়া যায়। তবে ছবি ও ভিডিও সংরক্ষণকারী ওয়েবসাইট ফ্লিকারে ‘চিকেনম্যান’ শিরোনামে ২০০৯ সাল থেকেই একই ছবির উপস্থিতি দেখা যায়।

পরবর্তীতে ছবিটির শিরোনাম ও শিল্পীর নাম অনুসরণ করে জানা যায়, এটি হেরাল্ড সাইওয়ার্টের ২০০৪ সালে প্রকাশিত ‘কামরেডস’ নামের একটি বইয়ে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। পাশাপাশি, কামরেডস বইয়ের নিজস্ব ওয়েবসাইটেও ছবিটির উপস্থিতি পাওয়া যায়। এছাড়া ‘মার্কটপ্লাটস’ নামের একটি ওয়েবসাইটে কামরেডস বইয়ের কিছু ছবি পাওয়া যায়, যেখানে বইটির ভেতরে আলোচিত ছবিটির উপস্থিতিও দেখা যায়।

‘ফোর্সড পার্সপেকটিভ’ নামের একটি ব্লগে ২০০৩ সালের ৯ নভেম্বর প্রকাশিত এক নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়, ‘শিল্পী হেরাল্ড সাইওয়ার্ট নিজেই নিশ্চিত করেছেন যে তার ‘চিকেন’ শিরোনামের কাজটি ফটোশপের (ছবি সম্পাদনার সফটওয়্যার) সহায়তায় তৈরি। তিনি জানান, ছবিটির রঙের সামঞ্জস্য বজায় রাখতে ওই সফটওয়্যার ব্যবহার করা প্রয়োজন ছিল। যদিও তিনি চাইলে অতিরিক্ত গভীরতা (এক্সট্রিম ডেপথ অব ফিল্ড) নিয়ে আরও কাজ করতে পারতেন, তবে বই প্রকাশের সময়সীমা ঘনিয়ে আসায় সে সময় তা করা সম্ভব হয়নি।’

হেরাল্ড সাইওয়ার্ট সম্পর্কে অনুসন্ধানে জানা যায়, তিনি ১৯৫৭ সালে জার্মানিতে জন্মগ্রহণ করেন। শিল্পকলা ও শিল্প ইতিহাসে পড়াশোনা শেষে তিনি বিভিন্ন বিজ্ঞাপন সংস্থায় গ্রাফিক ডিজাইনার ও শিল্প নির্দেশক হিসেবে কাজ করেছেন। ১৯৯৫ সাল থেকে তিনি আমস্টারডামে বসবাস করছেন এবং ফ্রিল্যান্স শিল্পী হিসেবে ত্রিমাত্রিক শিল্পকর্ম ও আলোকচিত্র নিয়ে কাজ করছেন। তার কাজের প্রধান ক্ষেত্র পুরুষ ইরোটিক আলোকচিত্র শিল্প।

অর্থাৎ, আলোচিত ছবিটি এপস্টিন ফাইলে সংরক্ষিত থাকলেও এটি এপস্টিনের তোলা কোনো ছবি নয়, বরং একটি ‘ডিজিটাল শিল্পকর্ম’।

সুতরাং, একটি ‘ডিজিটাল শিল্পকর্মকে’ এপস্টিন ফাইলে থাকা বাস্তব দৃশ্য হিসেবে দাবি করে প্রচার করা হচ্ছে; যা সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর।

তথ্যসূত্র

Share: