ম্যাচশেষে রিজওয়ানকে নিয়ে লিটনের বক্তব্য দাবিতে ভারতীয় গণমাধ্যমে বানোয়াট তথ্য প্রচার

গত ১৯ মে পাকিস্তানের বিপক্ষে সিলেট টেস্টের চতুর্থ দিনের শেষ সেশনে বারবার খেলা থামানো নিয়ে পাকিস্তানি ক্রিকেটার মোহাম্মদ রিজওয়ানের সাথে বাকবিতণ্ডা হয় লিটন দাসের। এরই প্রেক্ষিতে কাল (২০ মে) বাংলাদেশ টেস্ট ম্যাচ জেতার পর এ বিষয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ‘রিপাবলিক ওয়ার্ল্ড’ এর ওয়েবসাইটে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে লিটন দাস বলেছেন ‘এই ৪-০ ব্যবধানে সিরিজ জয় নিশ্চিত করতে পারাটা অবিশ্বাস্য অনুভূতি। তাদের বিপক্ষে টানা চারটি টেস্ট জয় প্রমাণ করে যে এটি কোনো আকস্মিক সাফল্য ছিল না। আমরা একটি দল হিসেবে খেলেছি। আর মোহাম্মদ রিজওয়ানের কথা যদি বলি, আমার মনে হয় সাইটস্ক্রিন নিয়ে অভিযোগ করা বা উইকেটের পেছনে নাটুকেপনা করার চেয়ে তার নিজের ব্যাটিংয়ে আরও বেশি মনোযোগ দেওয়া উচিত। তাহলে হয়তো দর্শকরাও তার ওপর এতটা ক্ষুব্ধ হতো না’। (অনূদিত)

আলোচিত দাবিতে রিপাবলিক ওয়ার্ল্ডে প্রচারিত প্রতিবেদনটি দেখুন এখানে

আলোচিত দাবিটি এক্সেও প্রচার করা হয়েছে৷ দেখুন এখানে (আর্কাইভ)। উল্লেখ্য, এক্সে প্রচারিত পোস্টটিতে লিটনের মন্তব্য দাবিতে প্রচার হলেও তাতে বাংলাদেশি টেস্ট অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্তর ছবি সংযুক্ত করা হয়েছে।

এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ হওয়া অবধি আলোচিত দাবিতে প্রচারিত উপরোল্লিখিত এক্স পোস্টটি এককভাবে প্রায় আড়াই লক্ষ বার দেখা হয়েছে এবং প্রায় ২ হাজারটি পৃথক অ্যাকাউন্ট থেকে পোস্টটিতে লাইক দেওয়া হয়েছে।

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, সিলেট টেস্ট জিতে লিটন দাস মোহাম্মদ রিজওয়ানকে নাটুকেপনার পরিবর্তে ব্যাটিংয়ে মনোযোগ দেওয়ার বিষয়ে আলোচিত মন্তব্য করেছেন বলে প্রচারিত দাবি সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে, ম্যাচ চলাকালে রিজওয়ানের সময়ক্ষেপণকে ইঙ্গিত করে কিছু মন্তব্য করলেও ম্যাচ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলনে তিনি এ ধরনের কোনো বক্তব্য দেননি।

এ বিষয়ে অনুসন্ধানে প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চ করলে লিটন দাসের এরূপ কোনো মন্তব্য করার সপক্ষে কোনো ভিডিও প্রমাণ পাওয়া যায়নি। বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের ইউটিউব চ্যানেলে গত ২০ মে ম্যাচশেষের প্রেজেন্টেশনের ভিডিও পাওয়া যায়। ভিডিওতে লিটন দাসকে ম্যাচসেরার পুরষ্কার পেতে দেখা যায়। এবং পুরষ্কার পেয়ে লিটন দাস প্রথম ইনিংসে করা সেঞ্চুরির বিষয়ে কথা বলেন। ইনিংসে তার পরিকল্পনা ও টেলেন্ডার (নিচের দিকের) ব্যাটারদের সাথে জুটির বিষয়ে কথা বলেন তিনি। তিনি তার সেঞ্চুরির বিষয়ে বলেন, ‘সত্যি বলতে, গত দুটি ইনিংসে আমি রান পাইনি, তাই যখন উইকেটে গেলাম তখন বড় স্কোর করার মতো কোনো চাপ আমার ওপর ছিল না। কিন্তু হঠাৎ করেই কয়েকটি উইকেট পড়ে গেল এবং আমি কিছুটা অনিশ্চিত হয়ে পড়েছিলাম যে আমার কী করা উচিত। আমি আমার অধিনায়ককে জিজ্ঞেস করলাম আমার কী করা উচিত। সে বলল, “আক্রমণাত্মক খেলো, আমাদের রান দরকার।” তাই আমি গেলাম এবং নিজের ওপর ভরসা করার চেষ্টা করলাম৷ দুইটি বাউন্ডারি মারার পর আমার মনে হলো যে, না, এটা টেস্ট ক্রিকেট, আমাকে আরও কয়েক ওভার খেলতে হবে কারণ যেকোনো দিন বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। তাই আমি ভাবলাম যদি আমি আরও ১০ থেকে ১৫ ওভার ব্যাটিং করতে পারি, তাহলে পাঁচ দিনের ম্যাচে এটি একটি ভিন্ন পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে।’

লিটন দাস তার বক্তব্যে নিচের দিকের ব্যাটারদের সাথে ব্যাটিং করার সময় সিঙ্গেল নিতে অস্বীকৃতি জানানো প্রসঙ্গে বলেন, ‘আমি যদি তাদের (নিচের দিকের ব্যাটসম্যানদের) সুযোগ দিতাম, তাহলে সম্ভবত আমার রান ৫০-এই আটকে থাকত। তাই আমি নিজেকে মনে করিয়ে দিচ্ছিলাম যে আমাকে আরও বেশি বল খেলতে হবে এবং তাদের সুরক্ষিত রাখতে হবে, কারণ যখনই তারা নিরাপদ থাকবে, আমিও নিরাপদ থাকব।’ এরপর লিটন দাস এটি তার ক্যারিয়ারের সেরা সেঞ্চুরি কি না তা নিয়ে জিজ্ঞেস করলে বলেন, ‘সম্ভবত আপনি তা বলতে পারেন, কারণ নিচের দিকের ব্যাটারদের নিয়ে ব্যাটিং করা সহজ নয় এবং সমস্ত ফিল্ডাররা সীমানার কাছে বাইরে থাকে। প্রথম দিনের উইকেটও ততটা সহজ ছিল না এবং আউটফিল্ডও ধীরগতির ছিল।’

লিটন দাসের একইরকম বক্তব্য ক্রিকেট বিষয়ক প্ল্যাটফর্ম ক্রিকবাজ ও ক্রিকইনফোর ওয়েবসাইটেও পাওয়া যায়। তবে লিটন দাসের বক্তব্যের কোথাও রিজওয়ানের নামের বা রিজওয়ানের সাথে হওয়া বাকবিতণ্ডার কোনো উল্লেখ পাওয়া যায়নি।

প্রসঙ্গত, গণমাধ্যম সূত্রে জানা যায়, গত ১৯ মে সিলেট টেস্টের চতুর্থ দিনের শেষ সেশনে পাকিস্তানের ব্যাটিংয়ের সময় রিজওয়ান নানাভাবেই বারবার চেষ্টা করছিলেন সময়ক্ষেপণ করতে। এক পর্যায়ে বোলার তাইজুলকে থামিয়ে সাইটস্ক্রিনের ওপরের দিকে কিছু ইশারা করে দেখান রিজওয়ান। স্টাম্প মাইকে শোনা যায়, কিপার লিটন তখন হিন্দি-উর্দুর মিশেলে বলছিলেন, “কি হলো? কি করছেন? প্রতি বলে এমন করছেন। সেদিকে কী দেখছেন, এদিকে ব্যাটিং করেন।” রিজওয়ান ইশারা দিয়ে তখন সাইটস্ক্রিনে থাকা সমস্যার বিষয়ে ইঙ্গিত করেন। তারপর খানিকক্ষণ দুজনের মধ্যে বাকবিতণ্ডা হয় এবং আম্পায়ারের মধ্যস্থতায় খেলা আবার চালু হয়। তবে বাংলাদেশের ফিল্ডাররা স্লেজিং চালিয়ে যান। “কিছু রান করেছে (রিজওয়ান), এখন অভিনয় শুরু করে দেবে”, “অনেক বেশি অভিনয় চলছে রে ভাই, অনেক বেশি…”, “এক সপ্তাহ পর বলিউডে ট্রেনিং আছে…”, “অতি অভিনয়ের জন্য পঞ্চাশ পয়সা কেটে রাখব আমরা…” এই ধরনের নানা কথা বলতে থাকেন বাংলাদেশি ক্রিকেটাররা।

সুতরাং, সিলেট টেস্ট জিতে লিটন দাস মোহাম্মদ রিজওয়ানকে নাটুকেপনার পরিবর্তে ব্যাটিংয়ে মনোযোগ দেওয়ার বিষয়ে আলোচিত মন্তব্য করেছেন বলে প্রচারিত দাবি মিথ্যা।

তথ্যসূত্র

Share: