পোস্টাল ব্যালটের বিষয়ে জুলকারনাইন সায়েরের বক্তব্য দাবিতে আমার দেশের নামে ভুয়া ফটোকার্ড প্রচার

বাহরাইনে একটি বাসায় পোস্টাল ব্যালটের অনেকগুলো খাম গণনা করা হয়েছে দাবিতে  একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়েছে যা অনলাইনে বেশ আলোচনা-সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। এরই প্রেক্ষিতে সম্প্রতি প্রবাসী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়েরের ছবি সংযুক্ত করে জুলকারনাইন সায়েরের বক্তব্য দাবিতে সংবাদমাধ্যম আমার দেশের ডিজাইন সম্বলিত একটি ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে। দাবি করা হয়েছে, জুলকারনাইন সায়ের বলেছেন ‘প্রবাসীদের পোস্টাল ব্যালট পেপার কি করে জামায়াত নেতাদের বাড়িতে পাওয়া যায় আমার বুঝে আসেনা। নির্বাচন কমিশন কি জামায়াতকে জিতানোর জন্য এই ধরনের কাজ করে যাচ্ছে? তাহলে কি আমরা ধরে নিব, বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে ভোট ইঞ্জিনিয়ারিং এর মাধ্যমে ছাত্রশিবির জিতেছিল। আমরা জানতে চাই সরকার ও নির্বাচন কমিশনারের কাছে, কিভাবে কি করে জামায়াত নেতাদের কাছে প্রবাসীদের পোস্টাল ব্যালট পেপার গেল?’

এরূপ দাবিতে ফেসবুকে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ) এবং এখানে (আর্কাইভ)।

এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ হওয়া অবধি আলোচিত দাবিতে প্রচারিত সবচেয়ে ভাইরাল পোস্টটিতে এককভাবে ১২ হাজারেরও অধিক পৃথক অ্যাকাউন্ট থেকে প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে এবং ৬ হাজারেরও অধিক বার শেয়ার করা হয়েছে।

এরূপ দাবিতে এক্সে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ)

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, নির্বাচন কমিশন ও জামায়াতে ইসলামীকে জড়িয়ে আলোচিত মন্তব্য করেননি প্রবাসী সাংবাদিক জুলকারনাইন সায়ের এবং আমার দেশও এমন কোনো ফটোকার্ড বা সংবাদ প্রকাশ করেনি। প্রকৃতপক্ষে, ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় আমার দেশের ফটোকার্ড ডিজাইনের আদলে ফটোকার্ড তৈরি করে ভুয়া এই দাবিটি প্রচার করা হয়েছে।

এ বিষয়ে অনুসন্ধানে আলোচিত ফটোকার্ডে আমার দেশের লোগো থাকার সূত্রে সংবাদমাধ্যমটির ফেসবুক পেজওয়েবসাইট পর্যবেক্ষণ করে সাম্প্রতিক সময়ে উক্ত তথ্য সংবলিত কোনো ফটোকার্ড বা সংবাদ খুঁজে পাওয়া যায়নি। সংবাদমাধ্যমটির ইউটিউব চ্যানেলেও উক্ত দাবির বিষয়ে কোনো প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়নি।

ফটোকার্ডটি বিশ্লেষণে সংবাদমাধ্যমটির ফেসবুক পেজের ফটোকার্ডগুলোর সাথে আলোচিত ফটোকার্ডটির ডিজাইন, ফন্ট, ফন্টের গাঢ়ত্ব, লাইন স্পেসে পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়।

পাশাপাশি অন্য গণমাধ্যম এবং বিশ্বস্ত সূত্রগুলোর বরাতেও জুলকারনাইন সায়েরের উক্ত মন্তব্য সম্বলিত কোনো তথ্য বা সংবাদ পাওয়া যায়নি৷

পোস্টাল ব্যালটের বিষয়ে জুলকারনাইন সায়েরের বক্তব্যের বিষয়ে অনুসন্ধানে জুলকারনাইন সায়েরের ফেসবুক অ্যাকাউন্ট পর্যবেক্ষণ করলে এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ হওয়া অবধি দুইটি পোস্টে পোস্টাল ব্যালটের বিষয়ে জুলকারনাইন সায়েরকে মন্তব্য করতে দেখা যায়। একটি পোস্টে তিনি লিখেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের দেশ বাহরাইনে প্রবাসী বাংলাদেশি ভোটারদের পোস্টাল ব্যালট নিয়ে বিতর্কের মাঝেই মধ্যপ্রাচ্যের আরেক দেশ কুয়েতে শতাধিক পোস্টাল ব্যালট গ্রহণ করে সেসব নিজেদের মধ্যে বন্টন ও ভোটারদের সাথে যোগাযোগ করতে দেখা গেছে একদল প্রবাসী বাংলাদেশিকে। বিশেষ একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর সমর্থক কিছু ব্যক্তি তাদের নিজ ঠিকানায় এসব ব্যালট সংগ্রহ করে ভোটারদের সাথে যোগাযোগ করে তাঁদের কাছ থেকে অগ্রীম সীল মেরে রাখছেন এমন দাবি করেছেন কয়েকজন প্রবাসী। তাঁরা উল্লেখ করেছেন তাঁদের কাছ থেকে এখনই বিশেষ একটি মার্কায় সীল মেরে পোস্টাল ব‍্যালটটি নিজ জিম্মায় রেখে তাঁদের বলা হচ্ছে ২১ জানুয়ারি পরবর্তী সময়ে এখানে উপস্থিত হয়ে বারকোড স্ক্যান করে ভোট প্রদান প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার হবে। তাঁদের এই দাবি যদি সঠিক হয়ে থাকে, তাহলে পোস্টাল ব্যালটের মাধ‍্যমে ভোট গ্রহণের সমগ্র প্রক্রিয়া অত্যন্ত জরুরিভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। প্রবাসী শ্রমিকদের সরলতার সুযোগ নিয়ে কোন গোষ্ঠী যেন ফায়দা লুটতে না পারে, সে লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনের এ বিষয়ে দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।’

অপর আরেক ভিডিও পোস্টের ক্যাপশনে তিনি লিখেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওর মাধ্যমে জানতে পারলাম বাহরাইন ও কুয়েতের মতো সৌদি আরবেও হাজার হাজার পোস্টাল ব্যালট রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা রয়েছে এমন ব্যক্তিদের মাধ্যমে সংগ্রহ করে প্রবাসী ভোটারদের সাথে যোগাযোগ করা হচ্ছে। ভাইরাল ভিডিও (সংযুক্ত) মারফতে জানা যায় একজন প্রবাসী ভোটারের সম্মতি ছাড়াই জনৈক লিয়াকত তাঁর পোস্টাল ব্যালটটি সংগ্রহ করেন, এ নিয়ে তাঁদের মাঝে বেশ বাকবিতণ্ডা হয়, যা আপনারা ভিডিওতে দেখবেন। ভিডিওতে পাওয়া নম্বরের সূত্রধরে আমি জনাব লিয়াকত’কে সরাসরি ফোন করি। জনাব লিয়াকত ঐ কথোপকথনের সত‍্যতা নিশ্চিত করেন, এবং তিনি আমাকে জানান তিনি নিজেই ৪০০-৫০০টির মতো পোস্টাল ব্যালট গ্রহণ করেছেন, সম্পূর্ণ কথোপকথনটি এই ভিডিওতে যুক্ত করা হয়েছে, ধৈর্য্য সহকারে শোনার পরামর্শ রইলো। যাচাইয়ের সুবিধার জন্যে জনাব লিয়াকতের সম্মতিক্রমে কথোপকথনটি প্রকাশ করা হলো।’

তবে কোথাও জুলকারনাইন সায়েরকে উপরোক্ত আলোচিত হুবহু মন্তব্য করতে দেখা যায়নি।

সুতরাং, পোস্টাল ব্যালট ইস্যুতে নির্বাচন কমিশন জামায়াতকে জিতাতে চাচ্ছে কি না প্রশ্ন করে জুলকারনাইন সায়েরের মন্তব্য দাবিতে আমার দেশের নামে প্রচারিত ফটোকার্ডটি ভুয়া ও বানোয়াট।

তথ্যসূত্র

Share: