শেখ হাসিনাকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলায় নাহিদ ইসলামকে স্পিকারের থামিয়ে দেওয়ার দাবিতে সম্পাদিত ভিডিও প্রচার 

সম্প্রতি, জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ঢাকা-১১ আসনের সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলাম শেখ হাসিনাকে ফ্যাসিস্ট বলায় স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ রেগে গিয়ে তাকে থামিয়ে দেন দাবিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও প্রচারিত হতে দেখা যায়।

ভিডিওটিতে সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলামকে বলতে শোনা যায়, “মাননীয় স্পিকার, আমরা হয়তো ভুলে যাচ্ছি যে আমরা এই সংসদটা কীভাবে গঠিত হয়েছে। ছাত্রজনতাকে সাথে নিয়ে ফ্যাসিস্ট মুক্ত করেছিলাম এই জাতি, মহান জাতীয় সংসদ।”

এমন পরিস্থিতিতে তার কথার মাঝেই স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিনকে বলতে শোনা যায়, “কার্যপ্রণালী বিধি অনুসারে, গ্যালারিতে উপবিষ্ট কোনো মন্তব্য সংসদে রাখতে পারেন না।” তারপর নাহিদ ইসলামকে “মাননীয় স্পিকার, তাহলে আর আমরা এখানে না থাকি।” শীর্ষক এবং স্পিকারকে “পার্লামেন্টের রীতি আছে যেটা আমরা ভঙ্গ করতে চাই না।” শীর্ষক কথা বলতে শোনা যায়।

ফেসবুকে প্রচারিত এমন ভিডিও দেখুন এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ) এবং এখানে (আর্কাইভ)।

ইউটিউবে প্রচারিত একই ভিডিও দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে দেখা যায়, সংসদের অধিবেশনে শেখ হাসিনাকে ‘ফ্যাসিস্ট’ বলায় নাহিদ ইসলামকে স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ রেগে থামিয়ে দেওয়ার দাবি সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে, একাধিক সংসদ অধিবেশনের ভিন্ন ভিন্ন ফুটেজ ও বক্তব্য ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় জোড়া লাগিয়ে আলোচিত ভিডিওটি তৈরি করা হয়েছে।

বর্তমান রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে শেখ হাসিনাকে ফ্যাসিস্ট বলায় এনসিপির আহ্বায়ক ও বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলামকে স্পিকার থামিয়ে দিলে সেটি জাতীয় রাজনীতির অন্যতম একটি আলোচ্য বিষয়ে পরিণত হতো। যা প্রতিটি গণমাধ্যমেই গুরুত্ব সহকারে প্রচার হওয়াটাও স্বাভাবিক। তবে আলোচিত এই দাবিটির বিষয়ে অনুসন্ধানে গণমাধ্যম কিংবা কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রে সংসদের কোনো অধিবেশনে এমন ঘটনা ঘটার তথ্য পাওয়া যায়নি।

তাই পরবর্তীতে অনুসন্ধানে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটির প্রতিটি ফুটেজ এবং বক্তব্য সূক্ষ্মভাবে পর্যালোচনা ও বিশ্লেষণ করে দেখে রিউমর স্ক্যানার। অনুসন্ধানে দেখা যায়, আলোচিত ভিডিওতে শুনতে পাওয়া নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে ফুটেজে একদিনের সংসদ অধিবেশনের ভিন্ন ভিন্ন সময়ের ফুটেজ ব্যবহার করা হয়েছে। অপরদিকে তার বক্তব্যের ক্ষেত্রে দুটি ভিন্ন অধিবেশনের আলাদা আলাদা সময়ে দেওয়া বক্তব্যের অংশবিশেষ যুক্ত করা হয়েছে।

আলোচিত ভিডিওর শুরুতে নাহিদ ইসলামের দেওয়া “মাননীয় স্পিকার, আমরা হয়তো ভুলে যাচ্ছি যে আমরা এই সংসদটা কীভাবে গঠিত হয়েছে।” শীর্ষক বক্তব্যের দিন অধিবেশনে স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেন সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল। তবে তার বক্তব্যের দ্বিতীয় অংশ “ছাত্রজনতাকে সাথে নিয়ে ফ্যাসিস্ট মুক্ত করেছিলাম এই জাতি, মহান জাতীয় সংসদ।” নেওয়া হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন থেকে। সেদিন মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ-ই স্পিকারের দায়িত্ব পালন করেন। কিন্তু সেদিন শেখ হাসিনাকে ফ্যাসিস্ট বলায় স্পিকারকে আলোচিত মন্তব্যটি করতে শোনা যায়নি। সর্বশেষ নাহিদ ইসলামকে “মাননীয় স্পিকার, তাহলে আর আমরা এখানে না থাকি।” শীর্ষক যে মন্তব্যটি করতে শোনা যায় রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে দেখা যায় সেটি তিনি গণভোটের বিষয়ে কথা বলতে গিয়ে সরকার দলীয় সদস্যের দ্বারা বাঁধাপ্রাপ্ত হলে করেন।

অর্থাৎ, এসবের সাথে আলোচিত দাবির কোনো সম্পর্ক নেই।

পরবর্তীতে স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিনের বক্তব্যের বিষয়ে অনুসন্ধানে দেখা যায়, তার বক্তব্যটিও দুটি ভিন্ন ভিন্ন অধিবেশন ও ভিন্ন ভিন্ন সংসদ সদস্যদের আলোচনার প্রেক্ষিতে করা মন্তব্যের অংশবিশেষ যুক্ত করে তৈরি করা হয়েছে। যার মধ্যে “কার্যপ্রণালী বিধি” ও “পার্লামেন্টের রীতি ভঙ্গ” করার প্রসঙ্গে করা তার মন্তব্যগুলো তিনি মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আহমেদ আযম খানের বক্তব্যের প্রেক্ষিতে করেছিলেন। অপরদিকে গ্যালারিতে উপবিষ্ট ব্যক্তিদের উদ্দেশ্য করে বক্তব্য প্রদানের বিষয়ে সতর্ক করে দেওয়া বক্তব্যটি ছিল নোয়াখালী-৬ (হাতিয়া) আসনের সংসদ সদস্য হান্নান মাসুদের উদ্দেশ্যে।

প্রাপ্ত তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, আলোচিত দাবিটি সম্পূর্ণ ভুয়া। সংসদ অধিবেশনের ভিন্ন ভিন্ন ভিডিও ও বক্তব্যের অংশ কাটছাট করে আলোচিত ভিডিওটি তৈরি করা হয়েছে।

সুতরাং, শেখ হাসিনাকে সংসদ অধিবেশনে ফ্যাসিস্ট বলায় নাহিদ ইসলামের ওপর স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিনের ক্ষিপ্ত হয়ে তাকে থামিয়ে দেওয়ার দাবিটি সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং উক্ত দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটি সম্পাদিত।

তথ্যসূত্র

Share: