বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ওপর  ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞার গুজব 

সম্প্রতি, ‘একযোগে পোশাক শিল্পে নিষেধাঞ্জা দিলো ইইউ যুক্তরাষ্ট্র আবার হবে ওয়ান-ইলেভেন’ শীর্ষক থাম্বনেইল সম্বলিত একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে প্রচার করা হচ্ছে।

পোশাক শিল্পের

ফেসবুকে প্রচারিত এমন ভিডিও দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে দেখা যায়, ইউরোপীয় ইউনিয়ন কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর কোনো নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি। বরং, কয়েকটি ভিন্ন ভিন্ন ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সংবাদের স্ক্রিনশট নিয়ে তার সাথে উপস্থাপকের ভয়েস যুক্ত করে আলোচিত ভিডিওটি তৈরি করা হয়েছে।

অনুসন্ধানের শুরুতে আলোচিত দাবিতে প্রাচরিত ভিডিওটি পর্যালোচনা করে রিউমর স্ক্যানার টিম। এতে দেখা যায়, ভিডিওটির ইন্ট্রো এবং মূল অংশে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের নানা ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সংবাদের স্ক্রিনশট দেখানো হয়। এছাড়াও ভিডিওটির উপস্থাপক উক্ত সংবাদগুলো থেকে কিছু অংশ পাঠ করে শোনান। তবে ভিডিওটির কোথাও উপস্থাপককে আলোচিত দাবির প্রেক্ষিতে কোনো তথ্য উপস্থাপন করতে দেখা যায়না।

প্রতিবেদন যাচাই ১

আলোচিত ভিডিওর শুরুতে দেখানো প্রতিবেদনটির সূত্র অনুসন্ধানে প্রতিবেদনটির ‘তিন কারণে নতুন করে আশা দেখছে বিএনপি’ শীর্ষক শিরোনামের সূত্র ধরে কি-ওয়ার্ড সার্চের মাধ্যমে BANGLA INSIDER এর ওয়েবসাইটে একই শিরোনামে গত ২৮ ডিসেম্বর প্রকাশিত প্রতিবেদনটি খুঁজে পাওয়া যায়।

প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করে দেখা যায় এর সাথে আলোচিত দাবির কোনো সম্পর্ক নেই। প্রতিবেদনে আগামী নির্বাচন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের অবস্থান নিয়ে আলোচনা করা হলেও পোশাক শিল্পে নিষেধাজ্ঞার দাবি সম্পর্কিত কোনো তথ্য উল্লেখ নেই।

প্রতিবেদন যাচাই ২

পরবর্তী প্রতিবেদনের সূত্র অনুসন্ধানেও ভিডিওতে দেখানো প্রতিবেদনের ‘একতরফা নির্বাচনকে বর্জন করুন’ শীর্ষক শিরোনামের সূত্র ধরে কি-ওয়ার্ড সার্চের মাধ্যমে দৈনিক যুগান্তর-এর ওয়েবসাইটে গত ২৮ ডিসেম্বর একই শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি খুঁজে পাওয়া যায়।

উক্ত প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, প্রতিবেদনটি মূলত গত ২৮ ডিসেম্বর জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বিএনপি’র এক দলীয় কর্মসূচিতে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খানের আসন্ন জাতীয় নির্বাচন বিষয়ে দেওয়া বক্তব্য নিয়ে করা হয়েছে। যাতে ইইউ কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশী পোশাক শিল্পের ওপর নিষেধাজ্ঞা দেওয়ার বিষয়ে কিছু বলা হয়নি।

প্রতিবেদন যাচাই ৩

তৃতীয় প্রতিবেদনটি অনুসন্ধানে একই প্রক্রিয়ায় ভিডিওতে দেখানো শিরোনামের সূত্র ধরে কি-ওয়ার্ড সার্চের মাধ্যমে দৈনিক যুগান্তর-এর ওয়েবসাইটে গত ২৮ ডিসেম্বর কাশিমপুর কারাগারে অসুস্থ শ্রমিক দল নেতার মৃত্যু শীর্ষক শিরোনাম প্রকাশিত মূল প্রতিবেদনটি খুঁজে পাওয়া যায়। 

উক্ত প্রতিবেদনটি থেকেজানা যায়, রাজধানী মুগদা থানা শ্রমিক দলের যুগ্ম আহবায়ক মো. ফজলুর রহমান কাজল কাশিমপুর কারাগারে অসুস্থ হয়ে পরবর্তীতে চিকিৎধানী অবস্থায় মারা যান। এই প্রতিবেদন ঐ ঘটনা নিয়েই প্রকাশিত হয়েছে। এর সাথে আলোচিত দাবির কোনো সম্পর্ক নেই।

প্রতিবেদন যাচাই ৪

পরবর্তী প্রতিবেদনটি অনুসন্ধানে ভিডিওতে দেখানো শিরোনাম ও বাংলানিউজটোয়েন্টিফোর.কম লেখাটির সূত্র ধরে কি-ওয়ার্ড সার্চের মাধ্যমে BANGLA NEWS 24 এর ওয়েবসাইটে গত ২৮ ডিসেম্বর শুক্রবার মাঠে নামছে সব বাহিনী শীর্ষক শিরোনামে প্রকাশিত মূল প্রতিবেদনটি খুঁজে পাওয়া যায়।

প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করে জানা যায়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সিনিয়র সচিব মো. মোস্তাফিজুর রহমানের গত ২১ ডিসেম্বর জারি করা এক পরিপত্রের নির্দেশনার প্রেক্ষিতে ২৮ ডিসেম্বর মাঠে নামছে পুলিশ, বিজিবি, র‌্যাবসহ সকল সশস্ত্র বাহিনী। আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাহিনীগুলো মোবাইল ও স্ট্রাইকিং ফোর্স হিসেবে ১০ জানুয়ারি পর্যন্ত ১৩ দিন দায়িত্ব পালন করবে। যদিও পরবর্তীতে সশস্ত্র বাহিনী মোতায়েনের তারিখ ২৮ ডিসেম্বর থেকে পিছিয়ে ৩ জানুয়ারি করা হয়েছে।

প্রতিবেদন যাচাই ৫

পঞ্চম প্রতিবেদনটি অনুসন্ধানে ভিডিওতে দেখানো প্রতিবেদনটির ‘ভোট বর্জনে নেত্রকোনায় বিএনপির লিফলেট বিতরণ’ শীর্ষক শিরোনামটির সূত্র ধরে কি-ওয়ার্ড সার্চের মাধ্যমে দৈনিক ইনকিলাব-এর ওয়েবসাইটে গত ২৯ ডিসেম্বর একই শিরোনামে প্রকাশিত প্রতিবেদনটি খুঁজে পাওয়া যায়।

উক্ত প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করেও আলোচিত দাবির সাথে এর কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া যায়নি।

প্রতিবেদন যাচাই ৬

সর্বশেষে ভিডিওটির উপস্থাপক ‘ভোট না দিলে ভাতার কার্ড বন্ধের হুমকি, সংঘর্ষ’ শীর্ষক শিরোনামের একটি প্রতিবেদন দর্শকদের উদ্দেশ্যে দেখান। উক্ত প্রতিবেদনটির শিরোনামের সূত্র ধরে কি-ওয়ার্ড সার্চের মাধ্যমে DESH TV এর ওয়েবসাইটে গত ২৯ ডিসেম্বর একই শিরোনাম প্রকাশিত মূল প্রতিবেদনটি খুঁজে পাওয়া যায়।  

উক্ত প্রতিবেদন করে জানা যায়, টাঙ্গাইল-৩ (ঘাটাইল) আসনে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী ও সাবেক এমপির সমর্থকদের মধ্যকার সংঘর্ষের ঘটনা নিয়ে উক্ত সংবাদটি প্রকাশ করা হয়। যারা সাথে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্প কিংবা ইইউ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো সম্পর্ক নেই।

এছাড়াও পরবর্তীতে আলোচিত দাবিটির সত্যতা যাচাইয়ে প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চের মাধ্যমে দেশীয় কিংবা বিদেশী গণমাধ্যমে ইইউ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বাংলাদেশী তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের দাবির বিষয়ে কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

মূলত, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি নানা সময় নানা কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছে। অপরদিকে বিভিন্ন দলের মনোনীত প্রার্থীরা নিজ নিজ এলাকায় নির্বাচনী প্রচারণা চালাতেও বেশ সরব রয়েছেন। যাতে বেশকিছু সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটেছে। এমন সংঘর্ষের ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমের ওয়েবসাইটে সম্প্রতি প্রকাশিত সংবাদগুলোর স্ক্রিনশট নিয়ে তার সাথে ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় একজন উপস্থাপকের ভয়েস যুক্ত করে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটি তৈরি করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে, ইইউ কিংবা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কেউই বাংলাদেশের তৈরি পোশাক শিল্পের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেনি।

সুতরাং, বাংলাদেশের পোশাক শিল্পের ওপর ইউরোপীয় ইউনিয়ন ও যুক্তরাষ্ট্র একযোগে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে দাবিতে ইন্টারনেট প্রচারিত বিষয়টি সম্পূর্ণ মিথ্যা।

তথ্যসূত্র

Share: