“হাদি হত্যার ১২৭ কোটি টাকা লেনদেন হয় জামায়াতের ইসলামি ব্যাংকে: সিআইডি” দাবিতে আমার দেশ ও নাগরিক টিভির নামে ভুয়া ফটোকার্ড প্রচার

গত ১২ ডিসেম্বর ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদি গুলিবিদ্ধ হন। সিঙ্গাপুরে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত ১৮ ডিসেম্বর তিনি মারা যান। হাদিকে গুলি করার ঘটনায় প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে একজনকে শনাক্ত করেছে পুলিশ। ওই ব্যক্তির নাম ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ খান। এরই প্রেক্ষিতে সম্প্রতি ফয়সাল করিমের ছবি সংযুক্ত করে “হাদি হত্যার ১২৭ কোটি টাকা লেনদেন করা হয় জামায়াতে ইসলামীর ইসলামি ব্যাংকে: সিআইডি” দাবিতে ইলেকট্রনিক সংবাদমাধ্যম ‘নাগরিক টিভি’ এবং দৈনিক আমার দেশের নামে পৃথক দুইটি ফটোকার্ড সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচার করা হয়েছে। 

নাগরিক টিভির নামে ‘হাদি হত্যার ১২৭ কোটি টাকা লেনদেন করা হয় জামায়াতে ইসলামীর ইসলামি ব্যাংকে: সিআইডি’ শিরোনামে প্রচারিত ফটোকার্ড দেখুন এখানে (আর্কাইভ) এবং এখানে (আর্কাইভ)।

দৈনিক আমার দেশের নামে ‘হাদি হত্যার ১২৭ কোটি টাকা লেনদেন করা হয় জামায়াতে ইসলামীর ইসলামি ব্যাংকে: সিআইডি’ শিরোনামে প্রচারিত ফটোকার্ড দেখুন এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ)।

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, ‘হাদি হত্যার ১২৭ কোটি টাকা লেনদেন করা হয় জামায়াতে ইসলামীর ইসলামি ব্যাংকে’ শীর্ষক দাবি করেনি সিআইডি এবং উক্ত দাবিতে নাগরিক টিভি ও আমার দেশ কোনো ফটোকার্ড প্রকাশ করেনি। প্রকৃতপক্ষে, নাগরিক টিভি এবং দৈনিক আমার দেশের ফটোকার্ডের ডিজাইন নকল করে ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় আলোচিত দাবি সংবলিত ফটোকার্ডগুলো তৈরি করে প্রচার করা হয়েছে।

নাগরিক টিভির ফটোকার্ড যাচাই

এ বিষয়ে অনুসন্ধানে নাগরিক টিভি’র অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ পর্যালোচনার মাধ্যমে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত কোনো ফটোকার্ড পাওয়া যায়নি। গণমাধ্যমটির ওয়েবসাইট এবং ইউটিউব চ্যানেল পর্যবেক্ষণেও আলোচিত দাবির সপক্ষে কোনো সংবাদ প্রচার হতে দেখা যায়নি। এছাড়া, আলোচিত ফটোকার্ডটির সাথে নাগরিক টিভির প্রচলিত ফটোকার্ডের শিরোনামের ফন্ট, ফন্টের আকার ও লাইনস্পেসে খানিকটা অমিল লক্ষ্য করা যায়। এছাড়াও, উক্ত গণমাধ্যমের ফটোকার্ডে সাধারণত শিরোনামের নিচে ‘বিস্তারিত কমেন্টে’ লেখা পাওয়া যায় কিন্তু আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ফটোকার্ডে তার অনুপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।

এ থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ফটোকার্ডটি নাগরিক টিভি প্রচার করেনি বরং, ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় নাগরিক টিভির ফটোকার্ডের আদলে তৈরি করা হয়েছে।

দৈনিক আমার দেশের ফটোকার্ড যাচাই

এ বিষয়ে অনুসন্ধানে, দৈনিক আমার দেশের অফিসিয়াল ফেসবুক পেজ পর্যালোচনার মাধ্যমে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত কোনো ফটোকার্ড পাওয়া যায়নি। গণমাধ্যমটির ওয়েবসাইট কিংবা ইউটিউব চ্যানেলেও আলোচিত দাবি সংবলিত কোনো সংবাদের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। আলোচিত ফটোকার্ডটির সাথে দৈনিক আমার দেশের প্রচলিত ফটোকার্ডের শিরোনামের ফন্টের মিল থাকলেও লাইনস্পেসে খানিকটা পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। পাশাপাশি, আমার দেশের আসল ফটোকার্ডে সাধারণত শিরোনামের নিচে লাল রঙে ‘বিস্তারিত কমেন্টে’ লেখা পাওয়া যায়, কিন্তু আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ফটোকার্ডে তার অনুপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।

এ থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ফটোকার্ডটি আমার দেশ প্রচার করেনি বরং, ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় তৈরি করা হয়েছে।

উল্লেখ্য, ‘হাদি হত্যার ১২৭ কোটি টাকা লেনদেন করা হয় জামায়াতে ইসলামীর ইসলামি ব্যাংকে’ শীর্ষক হুবহু দাবি সিআইডি না করলেও এ বিষয়ে অনুসন্ধানে প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চ করলে জাতীয় দৈনিক প্রথম আলো’র ওয়েবসাইটে গত ২১ ডিসেম্বরে প্রচারিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ওসমান হাদি হত্যা মামলার প্রধান আসামি ফয়সাল করিম মাসুদ ও তার স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যাংক হিসাবে ১২৭ কোটি টাকার বেশি অস্বাভাবিক লেনদেনের তথ্য পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

পরবর্তীতে আরো অনুসন্ধানে মূলধারার গণমাধ্যম সময় টিভির ইউটিউব চ্যানেলে গত ২৩ ডিসেম্বরে প্রচারিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। প্রতিবেদনে বলা হয়, ফয়সালকে গ্রেফতার চেষ্টার পাশাপাশি তার স্ত্রী সামিয়া ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবের অর্থের খোঁজে নামে সিআইডি। ১৪টি ব্যাংকে খোঁজ মিলে ৫৩টি অ্যাকাউন্টের যেখানে ২০১৭ থেকে ২০২৫ পর্যন্ত আট বছরে লেনদেন করা হয়েছে ১২৭ কোটি টাকারও বেশি। ব্যাংক এশিয়ার আদাবর রিংরোড শাখাতেই সন্ধান মেলে সবচেয়ে বেশি ১৯টি হিসাবের। সেখানে প্রায় ৫০ কোটি টাকার লেনদেন করেছে ফয়সাল ও তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান।

সময় টিভির প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, ৮ বছরে ১২৭ কোটি টাকার লেনদেন হলেও হাদিকে হত্যার ৩ মাস আগে গত ১৮ সেপ্টেম্বরে মিডল্যান্ড ব্যাংকের রূপনগর শাখার একটি ব্যাংক হিসাবে ১ কোটি ৭৬ লাখ টাকা আর ১ মাস আগে গত ৪ নভেম্বরে এনআরবিসি ব্যাংকের বেনারসিপল্লি উপশাখায় একটি ব্যাংক হিসাবে সাড়ে ৬৫ লাখ টাকা জমা দেয় ফয়সাল ও তার স্ত্রী। হাদি হত্যার ঘটনা ঘটার পূর্বে ৬৫ লাখ টাকা বাদে বাকী সব টাকাই তুলে নেয় তারা। এছাড়াও, সময় টিভির প্রতিবেদনে সিআইডির অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক মোঃ ছিবগাত উল্লাহর বক্তব্যের সংযুক্তি পাওয় যায় যেখানে তিনি জানান, ফয়সাল করিম মাসুদ ও অ্যাসোয়িয়েটদের বিভিন্ন ব্যাংকে ৫৩টি অ্যাকাউন্ট পাওয়া গেছে। এতে ১২৭ কোটি টাকার লেনদেনের তথ্য পাওয়া গেছে।

অর্থাৎ, এ থেকে নিশ্চিত হওয়া যায় যে ফয়সাল করিম, তার স্ত্রী সামিয়া ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লেনদেন করা ১২৭ কোটি টাকা কোনো একক ব্যাংকে নয় বরং বিভিন্ন ব্যাংকে রয়েছে। তার মধ্যে গত ৩ মাসে মিডল্যান্ড ব্যাংক ও এনআরবিসি ব্যাংকে ৪ কোটিরও অধিক টাকা লেনদেন করা হয়েছে। তাছাড়া, সময় টিভির প্রতিবেদন অনুযায়ী, ব্যাংক এশিয়ার আদাবর রিংরোড শাখাতেই সন্ধান মেলে সবচেয়ে বেশি ১৯টি হিসাবের। সেখানে প্রায় ৫০ কোটি টাকার লেনদেন করেছে ফয়সাল ও তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান। অর্থাৎ, মিডল্যান্ড, ব্যাংক এশিয়া ও এনআরবিসি এই তিন ব্যাংকে অন্তত প্রায় ৫৪ কোটি টাকা লেনদেন করা হয়েছে৷ সুতরাং, লেনদেন হওয়া মোট ১২৭ কোটি টাকার মধ্যে এই তিন ব্যাংক ব্যতীত লেনদেন হওয়া টাকার মধ্যে বাকী থাকে প্রায় ৭৩ কোটি টাকা যা লেনদেন হয়েছে আরো অন্তত ১১টি ব্যাংকের মাধ্যমে। তাই, এ থেকে স্পষ্ট যে কেবলমাত্র ইসলামী ব্যাংকেই ১২৭ কোটি টাকার সব টাকা লেনদেন হওয়ার দাবি অযৌক্তিক। তাছাড়া, ইসলামী ব্যাংকে আদৌ কোনো টাকা লেনদেন করা হয়েছে কি না তাও জানা যায়নি।

এদিকে ইসলামী ব্যাংক ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সম্ভাব্য যোগাযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিতর্ক রয়েছে। তবে গত ২৮ অক্টোবর এক বিবৃতিতে জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার স্পষ্টভাবে বলেন—“ইসলামী ব্যাংকের সঙ্গে জামায়াতে ইসলামের কোনও সাংগঠনিক বা প্রশাসনিক সম্পর্ক নেই।”

এর আগে ‘মির্জা আব্বাসের ঢাকা ব্যাংকে ওসমান হাদির খুনির ১২৭ কোটি টাকার লেনদেন’ শীর্ষক ভুয়া দাবি প্রচার করা হলে ফ্যাক্টচেক প্রতিবেদন প্রকাশ করে রিউমর স্ক্যানার টিম।

সুতরাং, ‘হাদি হত্যার ১২৭ কোটি টাকা লেনদেন করা হয় জামায়াতে ইসলামীর ইসলামি ব্যাংকে: সিআইডি’ শীর্ষক দাবিতে নাগরিক টিভি এবং দৈনিক আমার দেশের নামে প্রচারিত ফটোকার্ডগুলো ভুয়া।

তথ্যসূত্র

Share: