একটি ভুঁইফোড় প্ল্যাটফর্ম যেভাবে নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ালো

১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হলো বাংলাদেশের ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। বিকেল সাড়ে ৪টায় ভোটগ্রহণ শেষ হওয়ার পর শুরু হয় গণনা। নিজের পছন্দের প্রার্থীর জয়-পরাজয় নিয়ে উৎকণ্ঠায় প্রহর গুনছিলেন অগণিত ভোটার। সন্ধ্যা নাগাদ কেন্দ্রভিত্তিক ফলাফল আসতে শুরু করলে জনমনে কৌতূহল আরও ঘনীভূত হয়। এই সুযোগে ইন্টারনেটে বিশ্বস্ত প্ল্যাটফর্মের খোঁজ করতে থাকেন অনেকে। ঠিক এই সময়ে আবির্ভাব ঘটে ‘Election Watch Bangladesh’ নামের একটি কথিত প্ল্যাটফর্মের। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচিত কিছু ইনফ্লুয়েন্সার এবং প্রার্থীর প্রচার সেলের ফেসবুক পেজ থেকে এটিকে ‘সরকারি প্ল্যাটফর্ম’ হিসেবে দাবি করে নির্বাচনী ফলাফল প্রচার করা হয়। এমনকি একটি অনলাইন নিউজ পোর্টালও এই ওয়েবসাইটের বরাতে ফলাফলের সংবাদ প্রকাশ করে।

প্ল্যাটফর্মটিকে সরকারি দাবি করার সূত্র ধরে এ বিষয়ে অনুসন্ধানে নামে রিউমর স্ক্যানার। সত্যতা নিশ্চিত করতে নির্বাচন কমিশনে (ইসি) দায়িত্ব পালনরত একাধিক সাংবাদিকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে জানা যায়, ইসি অনলাইনে এভাবে সরাসরি কোনো ফলাফল প্রকাশ করছে না। পরবর্তীতে নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তাদের সাথে যোগাযোগ করা হলে তারা জানান, এই প্ল্যাটফর্মের সাথে ইসির কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই।

এটি ইসি সংশ্লিষ্ট নয় নিশ্চিত হওয়ার পর এই কথিত প্ল্যাটফর্মের আদ্যোপান্ত জানতে খোঁজ চালায় রিউমর স্ক্যানার। দেখা যায়, পেজটি থেকে নির্বাচনের ফলাফল কেন্দ্রিক প্রথম পোস্ট করা হয় সন্ধ্যা ৬টা ০৩ মিনিটে। ওই পোস্টে নীলফামারী-৩ আসনের একটি কেন্দ্রের ফলাফল দেখানো হয়, যেখানে জামায়াত জোটের প্রার্থীকে এগিয়ে থাকতে দেখা যায়। দ্বিতীয় পোস্টে চট্টগ্রাম-১১ আসনের দুটি কেন্দ্রে বিএনপি প্রার্থীর এগিয়ে থাকার তথ্য প্রকাশ করা হয়। এছাড়া, সামগ্রিকভাবে ৪০টি কেন্দ্রের ফলাফল প্রকাশ করা হয়, যেখানে জামায়াত জোটকে সামনে রাখা হয়েছে। এই পোস্টগুলোর মাধ্যমে প্ল্যাটফর্মটি দ্রুত আলোচনায় চলে আসে এবং এটিকে সরকারি ওয়েবসাইট বলে দাবি করা হয়।

পেজটির ট্রান্সপারেন্সি সেকশন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এটি খোলা হয়েছে ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বরে ‘BD Election Watch’ নামে। এরপর চলতি বছরের ২৮ জানুয়ারি নাম পরিবর্তন করে বর্তমান নামকরণ করা হয়। ফেসবুক পেজের পাশাপাশি তাদের একটি ওয়েবসাইটও ছিল (বর্তমানে যা নিষ্ক্রিয়)। ওয়েবসাইটের ডোমেইনটি যাচাই করে দেখা যায়, এটি চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি নিবন্ধিত হয়েছে। মেটা অ্যাড লাইব্রেরি বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রতিবেদনটি তৈরির সময় পেজটিতে একটি বিজ্ঞাপন সচল রয়েছে। তথ্য অনুযায়ী, পেজটি থেকে এর আগে আরও ৯টি বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয়েছিল, যা এখন বন্ধ। সবগুলো বিজ্ঞাপন পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এর মধ্যে ৩টি ছিল নির্বাচনী প্রেডিকশনের ভিত্তিতে পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি, ৩টি ওয়েবসাইটের প্রচারণা এবং ১টি পেজ ফলো করার আহ্বান। বাকি বিজ্ঞাপনগুলোর মধ্যে দুটি ছিল সরাসরি রাজনৈতিক দল বিএনপিকে ঘিরে নেতিবাচক প্রচারণামূলক।

এই কথিত প্ল্যাটফর্মের প্রচারিত ফলাফলের ভিত্তিতে দাবি করা হয় যে, সরকারি ওয়েবসাইট থেকে নির্বাচনী তথ্য সরিয়ে ফেলা হচ্ছে। এর সূত্র ধরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ বা নির্বাচন কারচুপির অভিযোগ তোলেন কেউ কেউ। আলোচিত ফেসবুক অ্যাকটিভিস্ট পিনাকী ভট্টাচার্যও এই প্ল্যাটফর্মেরতথ্যের ভিত্তিতেে একই অভিযোগ তোলেন। এর মধ্যেই পেজটি থেকে এক পোস্টে জানানো হয়, ‘বট অ্যাটাকের’ কারণে তাদের ওয়েবসাইটে রেজাল্ট দেখা যাচ্ছে না এবং সাইটটি মেইনটেন্যান্সে আছে। এসব আলোচনা-সমালোচনার প ওয়েবসাইটটিতে নতুন একটি ডিসক্লেমার যুক্ত করা হয়। সেখানে বলা হয়, “এই তথ্য কাল্পনিক এবং শুধুমাত্র প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে; এটি প্রকৃত নির্বাচন ফলাফল নয়।” অথচ পেজটির বিজ্ঞাপনগুলোতে এমন কোনো তথ্য উল্লেখ নেই; বরং তারা ‘তাৎক্ষণিক ও সত্য তথ্য’ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে প্রচারণা চালিয়ে আসছিল।

এই প্ল্যাটফর্মের নেপথ্যে কারা রয়েছে তা অনুসন্ধানে ‘MSI Shafin’ নামের একটি ফেসবুক প্রোফাইলের সন্ধান মেলে। গত ৪ ফেব্রুয়ারি আইডিটি থেকে এক পোস্টে বলা হয়েছিল, ‘খুব শীঘ্রই সবার মোবাইলে মোবাইলে “Election Watch Bangladesh” চলে আসবে ইনশাআল্লাহ।’ ৮ ফেব্রুয়ারি ওই ওয়েবসাইটের ঘোষণা দেওয়া হয় তার আইডি থেকেই। প্রোফাইলটি পর্যালোচনা করে দেখা যায়, এতে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবির-সংশ্লিষ্ট একাধিক পোস্ট রয়েছে। দুটি পোস্টে (,) সংগঠনের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে তার ছবি পাওয়া যায়। এছাড়া, সবুজবাগ সরকারি কলেজ শিবিরের আয়োজিত নববর্ষ প্রকাশনা উৎসব ২০২৬-এ সবাইকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছে একটি পোস্টের মাধ্যমে।

‘Election Watch Bangladesh’ প্ল্যাটফর্মকে সরকারি ভেবে প্রচারণার পর রিউমর স্ক্যানারের পেজ থেকে একটি পোস্ট করে জানানো হয় যে, এটি কোনো সরকারি ওয়েবসাইট নয়। এর বিপরীতে পেজটি থেকে এক পোস্টে দাবি করা হয় যে, তারা কোনো সরকারি ওয়েবসাইট নয় এবং শাফিন এর মালিকও নন। তাদের দাবি অনুযায়ী, এটি একটি ‘যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক অলাভজনক সংস্থা’ এবং শাফিন কেবল একজন ফ্রিল্যান্স ডাটা এন্ট্রি অপারেটর। তবে এই দাবির সপক্ষে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোনো সংস্থার নাম ও পরিচয় দিতে ব্যর্থ হয় তারা।

Share: