যেভাবে ভুয়া স্ক্রিনশটের মাধ্যমে ছাত্রদল-শিবির সংঘাত লাগিয়ে উল্লাস করছে আ. লীগ সমর্থকরা

ঘটনার সূত্রপাত বৃহস্পতিবার (২৩ এপ্রিল) দুপুরে। সে সময় সামাজিক মাধ্যমে দাবি ছড়িয়ে পড়ে যে, ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্যানেল থেকে গত বছর ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা আবদুল্লাহ আল মাহমুদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার কন্যা জাইমা রহমানকে নিয়ে একটি কুরুচিপূর্ণ ফটোকার্ড পোস্ট করেছেন। দাবির সঙ্গে একটি কথিত পোস্টের স্ক্রিনশটও ব্যাপকভাবে প্রচার হতে থাকে। বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধানে নেমে রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিট নিশ্চিত হয়, স্ক্রিনশটটি সম্পূর্ণ ভুয়া; আবদুল্লাহ আল মাহমুদ এমন কোনো পোস্ট করেননি। তাৎক্ষণিকভাবে এ নিয়ে রিউমর স্ক্যানারের ফেসবুক পেজে একটি ফ্যাক্টচেক প্রকাশ করা হয়। তবে এরই মধ্যে ঘটনাটি অন্যদিকে মোড় নেয়। শাহবাগ থানার সামনে মুখোমুখি অবস্থান থেকে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা তর্ক-বিতর্কে জড়িয়ে পড়ে। ডাকসু নেতাদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটে এবং ছাত্রদলের বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের ওপর হামলারও অভিযোগ ওঠে। একইসঙ্গে সামাজিক মাধ্যমে ছড়াতে থাকে এ ঘটনার সঙ্গে সম্পর্কিত নানা অপতথ্য, এমনকি রিউমর স্ক্যানারের ফ্যাক্টচেকের সত্যতা নিয়েও প্রশ্ন তোলা শুরু হয়। এই প্রতিবেদনে পুরো ঘটনার প্রেক্ষাপট ও ছড়িয়ে পড়া বিভ্রান্তির বিষয়গুলো তুলে ধরছে রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিট।

যে দাবি ঘিরে উত্তাল হয়েছে রাজপথ

২৩ এপ্রিল দুপুরে ডাকসু নির্বাচনে অংশ নেওয়া শিবির নেতা আবদুল্লাহ আল মাহমুদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার কন্যা জাইমা রহমানকে জড়িয়ে ফেসবুকে অশালীন ছবি ও ক্যাপশন যুক্ত পোস্ট করেছেন দাবি করে এ সংক্রান্ত একটি স্ক্রিনশট প্রচার করে লীগপন্থী কিছু এক্টিভিস্ট।

LE O নামের বাংলাদেশ থেকেই পরিচালিত আওয়ামীপন্থী একটি অ্যাকাউন্টসহ Aronno Abir, Gazi Asraful Islam Srabon এর মতো আরো অনেকে সম্পাদিত স্ক্রিনশটটি আসল হিসেবে প্রচার করার সময় ছাত্রদলকে উস্কে দেওয়ার মতো ক্যাপশন ব্যবহার করেন।

যেমন, গাজী আশরাফুল লিখেছেন, “ছাত্রদলের যদি নুন্যতম আত্মমর্যাদা থাকে, তাহলে এই শিবির কে খুঁজে বের করে অবশ্যই শাস্তি দিবে। অন্যথায় এই নোংরামি মেনে নিয়ে হাততালি দিবে।” Aronno Abir নামের আরেক লীগ এক্টিভিস্ট লিখেছেন, “দেখা যাক বিএনপি এই শিবির কর্মীর বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিতে পারে কিনা।..” LE O নামের অ্যাকাউন্টটির ক্যাপশনে ছিল, “ছাত্রদলের রাজপথের সহযোদ্ধারা।.. ছাত্রদলের যদি নুন্যতম আত্মমর্যাদা থাকে, তাহলে এই শিবির কে খুঁজে বের করে অবশ্যই শাস্তি দিবে। অন্যথায় এই নোংরামি মেনে নিয়ে হাততালি দিবে।”

পরবর্তীতে ছাত্রদলের দায়িত্বশীল রাজনীতিবিদদের একই ভুয়া স্ক্রিনশট প্রচার (দেখুন এখানে, এখানে, এখানে, এখানে) করতে দেখা যায়।

কী ঘটেছে আসলে?

২৩ এপ্রিল দুপুর ২ টা ৩৪ মিনিটে ‘Eshan Chowdhury’ নামের একটি ভুয়া ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে (পূর্বে নাম ছিল Albert Garrison) প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার কন্যা জাইমা রহমানকে নিয়ে এআই দিয়ে তৈরি একটি ভুয়া ছবি কুরুচিপূর্ণ ক্যাপশন উল্লেখ করে প্রচার করা হয়।

Eshan Chowdhury এর সেই পোস্ট প্রকাশের ১২ মিনিট পর (দুপুর ২ টা ৪৬ মিনিটে) সেখানে Ahmed Habib নামের একজন একটি মন্তব্য করেন।

Ahmed Habib এর এই কমেন্টটির ৬ মিনিট পর, দুপুর ২টা ৫২ মিনিটে কুরুচিপূর্ণ ওই পোস্টটির স্ক্রিনশট নেওয়া হয়। অর্থাৎ, স্ক্রিনশট নেওয়ার সময় পোস্টটির বয়স ১৮ মিনিট এবং কমেন্টের বয়স ৬ মিনিট।

দুপুর ২ টা ৫৭ মিনিটে LE O নামের বাংলাদেশ থেকেই পরিচালিত আওয়ামী পন্থী একটি অ্যাকাউন্ট থেকে কুরুচিপূর্ণ ছবি সম্বলিত সম্পাদিত স্ক্রিনশটটি পোস্ট করা হয়।

পোস্টটিতে দাবি করা হয়, Abdullah Al Mahmud নামের এক ব্যক্তি একই কুরুচিপূর্ণ ছবিটি প্রচার করেছিলেন।

LE O নামের অ্যাকাউন্টটির পোস্টের দাবি অনুযায়ী, ১৮ মিনিটের মাথায় ৪ রিয়েকশন সংবলিত স্ক্রিনশট নেওয়া হয়েছে।

Eshan Chowdhury নামের অ্যাকাউন্টের ১৮ মিনিটের সময়কার স্ক্রিনশট নিয়ে সেখানে নাম ও ছবি মুছে Abdullah Al Mahmud এর নাম ও ছবি বসিয়ে ভুয়া স্ক্রিনশটটি তৈরি করা হয়। স্ক্রিনশটটি ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করলেও এই বিষয়টি বোঝা যায় যে এই পোস্টের ওপরই সম্পাদনা করা হয়েছে। যথাযথভাবে সম্পাদনা করতে না পারায় ক্যাপশনের ‘অতিরিক্ত’ বানানে ই-কার কিছুটা মুছে গেছে বা সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডের নিচে আংশিকভাবে ঢাকা পড়েছে।

তবে, ভুয়া স্ক্রিনশটে Ahmed Habib এর কমেন্টটি মুছে দিতে ভুল করে ভুয়া স্ক্রিনশট তৈরির কারিগররা। মূলত এই ভুল থেকেই রিউমর স্ক্যানার মূল সূত্র খুঁজে পায়। কারণ, Ahmed Habib কমেন্ট করেছিলেন Eshan এর পোস্টে, অন্য কারো পোস্টে নয়।

বিষয়টির ব্যাপারে আহমেদ হাবিবের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিটকে জানান যে, তিনি একটাই কমেন্ট করেছিলেন এবং সেটি ওসমান হাদীর প্রোফাইল ছবিযুক্ত অ্যাকাউন্টেই করেন। Abdullah Al Mahmud নামের কোনো অ্যাকাউন্টে তিনি এমন কোনো কমেন্ট করেননি। হাবিবের ফেসবুক প্রোফাইল পর্যালোচনা করে তিনি বিএনপি সমর্থক বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।

LE O নামের অ্যাকাউন্ট থেকে করা পোস্টে Eshan Chowdhury অ্যাকাউন্টটির পোস্টের ২৮ মিনিটের একটি স্ক্রিনশট শেয়ার করা হয়। পাশাপাশি, ‘Abdullah Al Sabah’ নামের একটি ফেসবুক অ্যাকাউন্টের ৭ মিনিটের শূন্য রিয়েক্ট সম্বলিত আরেকটি পোস্টের স্ক্রিনশট লিও’র পোস্টটিতে কমেন্ট করা হয়।

Eshan এবং Sabah নামের অ্যাকাউন্ট দু’টি নিয়ে অনুসন্ধান করতে গিয়ে রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিট দেখতে পায়, সেখানে জামাত-শিবির সমর্থনে বিভিন্ন সময়ে পোস্ট করে রাখা হয়েছে, তবে পোস্টগুলোর রিয়েকশন খুবই কম। যেমন, Sabah অ্যাকাউন্টে ১ থেকে ৫ রিয়েকশন এবং Eshan অ্যাকাউন্টে ৫ থেকে ২০ রিয়েকশন। তাছাড়া, অ্যাকাউন্টগুলোর পোস্টে যেসব অ্যাকাউন্ট থেকে রিয়েকশন দেওয়া হয়েছে তার অধিকাংশই আওয়ামী লীগ পন্থী। আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, Sabah নামের অ্যাকাউন্টে কুরুচিপূর্ণ পোস্টটি প্রচারের পরপরই সেখানে প্রোফাইল পিক হিসেবে দেলাওয়ার হোসাইন সাঈদীর ছবি আপলোড করা হয়।

মাহমুদের পোস্টে ভুয়া কমেন্টে বিভ্রান্তি

আবদুল্লাহ আল মাহমুদ ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্যানেল থেকে গত বছর ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছিলেন। তিনি গতকাল বিকেলে নিজের প্রোফাইলে এক ফেসবুক পোস্টে জানান, তার নামে সম্পাদিত ফটোকার্ড ছড়িয়ে দেওয়ার পর তিনি হত্যার হুমকি পাচ্ছেন।

তার পোস্ট পর্যালোচনা করে Imran Hossain Rokon, Shahadat H. Sourov এবং Abir Mahmud Pavel নামের কিছু অ্যাকাউন্টের কমেন্ট নজরে আসে রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিটের।

তারা দাবি করেন যে তারা নিজ চোখে মাহমুদের অ্যাকাউন্টে কথিত কুরুচিপূর্ণ পোস্টটি দেখেছেন। যেহেতু স্ক্রিনশটটিই ভুয়া প্রমাণ করেছে রিউমর স্ক্যানার, সেক্ষেত্রে এসব কমেন্টের বক্তব্য সত্য হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। তবে যেহেতু এই কমেন্টকারীদের মিথ্যা কমেন্ট প্রচারিত হচ্ছে তাই কমেন্টকারীদের পরিচয় সম্পর্কেও জানার চেষ্টা করে রিউমর স্ক্যানার ইনভেস্টিগেশন ইউনিট।

অনুসন্ধানে শাহাদাত এবং ইমরান আওয়ামী সমর্থক বলে প্রমাণ পেয়েছে রিউমর স্ক্যানার। ইমরানের কমেন্টটি বর্তমানে পোস্টে নেই এবং গতকাল তার অ্যাকাউন্ট খুঁজে পাওয়া যায়নি, তবে আজকে সচল দেখা গেছে। অ্যাকাউন্টের প্রোফাইল ছবি বদলানো হয়েছে। আবির মাহমুদ পাভেল নামের অ্যাকাউন্টের কমেন্টটিও বর্তমানে নেই এবং অ্যাকাউন্টটিও গতকাল বন্ধ ছিল।

আওয়ামী পন্থীরা হাজির ভুয়া ফ্যাক্টচেক নিয়ে

গতকাল রিউমর স্ক্যানার সম্পূর্ণ নিশ্চিত হয়ে পরিস্থিতির গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে তাৎক্ষণিক ফ্যাক্টচেক প্রকাশ করে এবং ফেসবুক গ্রুপে যাচাই পদ্ধতিও বিস্তারিত জানায়।

কিন্তু পরবর্তী সময়ে রিউমর স্ক্যানারের ফ্যাক্টচেক নিয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টির উদেশ্যে ভুয়া ফ্যাক্টচেক পোস্ট নিয়ে হাজির হয় আওয়ামী সমর্থক পরিচালিত ভুয়া ফ্যাক্টচেকিং পেজ Fact Detector Bangladesh। পোস্টে রিউমর স্ক্যানারের ফ্যাক্টচেক ভুল প্রমাণে দেখানো হয় আওয়ামী সমর্থকদেরই সেসব কমেন্টগুলোই। কোন ধরনের তথ্য ও প্রমাণ ছাড়াই কেবল কিছু অ্যাকাউন্টের ভুয়া কমেন্টের ভিত্তিতে ভুয়া ফ্যাক্টচেক বানিয়ে প্রচার করা হয়।

আওয়ামী সমর্থকদের ভুয়া কমেন্টগুলোকে আসল ধরে নিয়ে গতকাল রিউমর স্ক্যানারের ফ্যাক্টচেককে চ্যালেঞ্জ করেন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের সংরক্ষিত নারী আসনে সদস্য হতে যাওয়া ছাত্রদলের নেত্রী মানসুরা আলম। পরবর্তীতে তিনি পোস্টটি সরিয়ে নেন।

উল্লাসে মেতেছিল আওয়ামী সংশ্লিষ্ট প্রোফাইলগুলো

গতকাল সন্ধ্যায় আবদুল্লাহ আল মাহমুদ হত্যার হুমকি পেয়ে শাহবাগ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে যান। সে সময় ঢাবির ছাত্রদল নেতারাও থানায় উপস্থিত হন। থানায় আসেন ডাকসু নেতা এবি জুবায়ের, মোসাদ্দেক ইবনে আলী মোহাম্মদ, ফাতিমা তাসনিম জুমাসহ আরো অনেকে। জুবায়ের ও মোসাদ্দেক থানায় মারধরের শিকারও হন। এ সময় ফেসবুকে আওয়ামী পন্থী একাধিক প্রোফাইল থেকে বিষয়টি নিয়ে উল্লাস প্রকাশ করতে দেখা যায়। এর অংশ হিসেবে নতুন অপতথ্য ছড়াতে দেখা যায় চিহ্নিত কিছু প্রোফাইল থেকে, যেগুলো পূর্বেও নানা অপতথ্য ছড়াতে ভূমিকা রেখেছে।

জুবায়েরের দাঁত ভেঙে ফেলার দাবিতে এআই ছবি, জুমা বিএনপিকে দেখে নিবে দাবিতে কালের কণ্ঠের নামে সম্পাদিত ফটোকার্ড, তারও দাঁত ভেঙেছে দাবিতে আরেকটি সম্পাদিত ছবি, ঢাবি শিক্ষক শেহরীন আমিন ভূঁইয়া মোনামীর নামে সার্কাজম পেজ থেকে ছড়ানো ভুয়া মন্তব্য প্রচার করে ক্যাপশনে আনন্দ প্রকাশ করতে দেখা যায় এসব প্রোফাইল থেকে।

সব মিলিয়ে, একটি ভুয়া স্ক্রিনশট শুধু অনলাইন বিভ্রান্তিতেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, বরং তা বাস্তব জগতেও উত্তেজনা, বিভাজন ও সংঘাতের জন্ম দিয়েছে। ভিত্তিহীন একটি দাবিকে ঘিরে যেভাবে দ্রুত অপতথ্য ছড়িয়েছে এবং তা ঘিরে পাল্টাপাল্টি অবস্থান তৈরি হয়েছে, তা বর্তমান তথ্য-পরিবেশের ভঙ্গুরতাকেই সামনে এনে দেয়। এমনকি যাচাই করা তথ্যও যখন সন্দেহের মুখে পড়ে, তখন বিভ্রান্তির পরিধি আরও বিস্তৃত হয়। পুরো ঘটনাপ্রবাহ দেখায়, একটি অপতথ্য কত সহজে বাস্তব পরিস্থিতিকে প্রভাবিত করতে পারে এবং কীভাবে তথ্যের বিকৃতি সমাজে অস্থিরতা তৈরি করতে সক্ষম।

Share: