ভুয়া শিক্ষাবৃত্তি নিয়ে সংবাদ করেছে প্রথম আলো, আবেদন করে প্রতারিত শিক্ষার্থীরা

গত ৫ নভেম্বর “সেবা ফাউন্ডেশনের শিক্ষাবৃত্তি, প্রতি মাসে পাবে ৩ হাজার টাকা” শিরোনামে একটি সংবাদ প্রকাশ করে প্রথম আলো।
প্রতিবেদনে প্রথম আলো লিখেছে, “সেবা ফাউন্ডেশন শিক্ষাবৃত্তি কর্মসূচির আওতায় ২০২৫ সালে দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে এইচএসসি বা সমমান পরীক্ষায় উত্তীর্ণ মেধাবী ও আর্থিকভাবে অসচ্ছল ছাত্রছাত্রীদের বৃত্তি প্রদান করবে।”
এছাড়াও, বৃত্তির আবেদনের যোগ্যতা, বৃত্তির পরিমাণ ও সময়, আবেদনের শর্তাবলি ইত্যাদি তারা ধাপে ধাপে ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছে। সবার শেষে বিস্তারিত তথ্যের জন্য https://shebafoundation.help/ ওয়েবসাইট লিংক উল্লেখ করে দেয়া হয়েছে।
প্রথম আলো তাদের প্রতিবেদনে লিখেছে, এই বৃত্তির আওতায় স্নাতক শিক্ষার্থীদের এককালীন ৫ হাজার টাকা এবং চার বছরের জন্য ৩ হাজার টাকা করে মাসিক বৃত্তি দেয়া হবে। আবেদনের যোগ্যতা জিপিএ ৩.০০ এবং জিপিএ ৩.৫০। আবেদনের শেষ তারিখ ১০ নভেম্বর এবং আবেদনের ফলাফল প্রকাশের তারিখ ১৫ নভেম্বর বলে প্রথম আলোর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ফ্যাক্টচেক
রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রথম আলো প্রকাশিত আলোচিত এই শিক্ষাবৃত্তির বিষয়টি সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে, প্রতারক চক্রের ভুয়া বিজ্ঞপ্তিকে আসল হিসেবে প্রচার করেছে সংবাদমাধ্যমটি, যা দেখে আবেদন করে প্রতারিত হয়েছেন শিক্ষার্থীরা।
এ বিষয়ে অনুসন্ধানে দেখা যায়, প্রথম আলোর সংবাদ প্রকাশের আগে অন্তত ৩০ অক্টোবর থেকে এই বৃত্তি সংক্রান্ত ফেসবুক পোস্ট খুঁজে পাওয়া যায়। যেখানেই একই তথ্য বিভিন্ন পোস্টে একটি সার্কুলার ব্যানারে পাওয়া যায়। ব্যানারটি কথিত সেবা ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইটে সার্কুলার হিসেবে ছিল।
এসব ফেসবুক পোস্টের মন্তব্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রথম আলোর সংবাদ প্রকাশের আগে অনেকেই বৃত্তির বিজ্ঞাপনটির সত্যতা নিয়ে সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন। তবে প্রথম আলোর সংবাদের পর শিক্ষার্থীরা এটিকে নির্ভরযোগ্য বলে মনে করে আবেদন করেন। প্রথম আলোর প্রতিবেদন প্রকাশের পর বৃত্তি–সংক্রান্ত আপডেট দেয় এমন পেজ ও গ্রুপে সার্কুলারটি আরও বেশি করে শেয়ার হতে থাকে।

প্রথম আলো তাদের প্রতিবেদনে একটি ছবিও যুক্ত করেছিল। ওই ছবি নিয়ে অনুসন্ধানে একই নামে সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলা ভিত্তিক একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের খোঁজ পাওয়া যায়। গোয়াইনঘাট ভিত্তিক ‘Seba Foundation’ এর ফেসবুক গ্রুপে চলতি বছরের ১২ এপ্রিলের একটি পোস্টে ছবিটি খুঁজে পাওয়া যায়। ছবিটি সংগঠনটির আয়োজনে অনুষ্ঠিত মেধাবৃত্তি পরীক্ষার পুরস্কার বিতরনী অনুষ্ঠানে তোলা হয়েছিল।
পরবর্তীতে ওই ফেসবুক গ্রুপে সংগঠনটির সভাপতি এবং গ্রুপ এডমিন আরিফুজ্জামান আবীরের একটি ফেসবুক পোস্ট পাওয়া যায়। ওই পোস্টে প্রথম আলোর সংবাদের স্ক্রিনশটসহ কথিত সেবা ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইটে বেশকিছু স্ক্রিনশট যুক্ত করে তিনি লেখেন, “সাম্প্রতিক সময়ে লক্ষ্য করা যাচ্ছে যে উত্তরবঙ্গ অঞ্চলে সেবা ফাউন্ডেশন নাম ব্যবহার করে একটি ভুয়া সংগঠন ওয়েবসাইট খুলে বিভিন্ন বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার করছে। বিশেষ করে তারা দাবি করছে এইচএসসি উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীরা নাকি বৃত্তি পেয়েছে।
এককালীন ৫,০০০ টাকা পাওয়ার কথা বলে প্রতি মাসে ৩,০০০ টাকা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ২০০ টাকা সেন্ড মানি পাঠাতে বলছে। এগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা, প্রতারণামূলক এবং সেবা ফাউন্ডেশনের সঙ্গে কোনোভাবে সম্পৃক্ত নয়। গোয়াইনঘাট উপজেলা কেন্দ্রিক আমাদের সেবা ফাউন্ডেশন কোনো ধরনের সেন্ড মনির মাধ্যমে রেজিস্ট্রেশন ফি অথবা অর্থনৈতিক লেনদেনভিত্তিক বৃত্তি কার্যক্রম পরিচালনা করতেছে না।”
আরিফুজ্জামান আবীর বিষয়টি নিয়ে গোয়াইনঘাট থানায় একটি জিডিও করেছেন। তার একটি কমেন্ট থেকে জিডির একটি ছবি পাওয়া যায়, যেখানে তিনি লিখেছেন, “আমি আরিফুজ্জামান আবীর.. এই মর্মে সাধারণ ডায়রী করিতেছি যে, আমি গোয়াইনঘাট উপজেলার সেবা ফাউন্ডেশন মেধা বৃত্তি প্রতিষ্ঠানের সভাপতি। প্রতিবছর উপজেলা এলাকাধীন সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ৬ষ্ঠ শ্রেণি হতে দশম শ্রেনীর ছাত্রছাত্রীদের পরিক্ষার মাধ্যমে উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের শিক্ষাসনদ ও শিক্ষা সামগ্রী প্রদান করি। গত ০৫/১১/২০২৫খ্রিঃ প্রথম আলো পত্রিকায় আমাদেরকে অবগত না করে আমার প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করে আমাদের বিগত বছরের বৃত্তি প্রদানের ছবি দিয়ে একটি শিরোনাম আসে। এককালীন পাঁচ হাজার টাকা পাওয়ার কথা বলে প্রতি মাসে তিন হাজার টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে শিক্ষার্থীদের তাদের ০১৭১৬-৭৫৭৫৩৩ নাম্বারে ২০০ টাকা বিকাশ করিতে বলে। উক্ত শিরোনামটি পেয়ে গোয়াইনঘাট উপজেলার অনেক শিক্ষার্থী উক্ত বিকাশ নাম্বারে টাকা পাঠিয়েছে এবং পরবর্তীতে উক্ত নাম্বারে যোগাযোগ করার চেষ্টা করিলে নাম্বারটি বন্ধ পেয়ে আমার সাথে সরাসরি যোগাযোগ করিলে আমি উক্ত বিষয়টি ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীদের নিকট হতে জানতে পেয়ে তাৎক্ষনিক আমাদের সেবা ফাউন্ডেশন মেধা বৃত্তি প্রতিষ্ঠানের পেইজ হইতে একটি সর্তকবার্তা দেই যাতে কোন শিক্ষার্থী ফেইক ওয়েবসাইটের ধোকায় না পড়ে।..”
কথিত সেবা ফাউন্ডেশনের ওয়েবসাইট https://shebafoundation.help/ বর্তমানে সচল নেই। উল্লেখিত এডমিনের পোস্ট থেকে প্রাপ্ত স্ক্রিনশটে দেখা যায়, কথিত এই সেবা ফাউন্ডেশন “Bill & Melinda Gates Foundation (USA) ও Islamic Relief Worldwide (UK)-এর সহায়তায় শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দারিদ্র্য বিমোচন ও বিশুদ্ধ পানির মতো মৌলিক উন্নয়ন কার্যক্রমে কাজ করে যাচ্ছে” বলে ওয়েবসাইটে উল্লেখ করেছে।
উল্লেখিত প্রতিষ্ঠান দুটির বিভিন্ন কার্যক্রমের ছবিও এটি নিজেদের কার্যক্রমের মুহূর্ত হিসেবে ওয়েবসাইটে যুক্ত করেছে, যেখানে একটি ছবিতে বিল গেটসকেও দেখা যাচ্ছে।

উপবৃত্তির জন্য আবেদন করলে ওয়েবসাইটে “অভিনন্দন! আপনি সেবা ফাউন্ডেশন এর শিক্ষা বৃত্তির জন্য নির্বাচিত হয়েছেন। এবং আপনার ওয়ালেটে পাঠ্য উপাদানের ৫০০০ টাকা জমা হয়েছে। উক্ত টাকা আপনার বিকাশে পাওয়ার জন্য বিকাশ নাম্বার নিশ্চিত করুন।” লেখা দেখানো হয় বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে। এর পরের ধাপে ওয়েবসাইটে দেখানো 01716757533 নাম্বারে ২০০ টাকা বিকাশে পাঠাতে বলা হয়।
এই নাম্বারটি ট্রু কলারে প্রতারক হিসেবে দেখানো হচ্ছে।

গত ১৫ নভেম্বর এই কথিত শিক্ষাবৃত্তির ফলাফল ওয়েবসাইটে প্রকাশের তারিখ ছিল। তবে ওয়েবসাইটটি আর সচল নেই। রিউমর স্ক্যানারের একজন সদস্য গতকাল ১৬ নভেম্বর থেকে ১৭ নভেম্বর প্রতিবেদন প্রকাশ অবধি বেশ কয়েকবার ওয়েবসাইটে প্রবেশের চেষ্টা করেও প্রবেশ করতে পারেনি। বিভিন্ন পোস্টের কমেন্টেও একই চিত্র দেখা গেছে, অনেকে ১৬ নভেম্বর থেকে আর ওই ওয়েবসাইটে ঢুকতে পারেননি বলে জানিয়েছেন। এই প্রতিবেদন লেখা অবধি প্রথম আলোর ওয়েবসাইটে কথিত এই বৃত্তির ওপর প্রকাশিত বিজ্ঞাপন কিংবা সংবাদটি এখনো রয়েছে।
কথিত ওয়েবসাইটটি গত মাসের ১৬ অক্টোবর নিবন্ধন করা হয়েছিল। এই ওয়েবসাইটের লিংক উল্লেখ করেই প্রথম আলো বৃত্তির সংবাদটি প্রকাশ করে। প্রতারক চক্রের ভুয়া বিজ্ঞপ্তি প্রথম আলোতে কাভারেজ পাওয়ায় অসংখ্য শিক্ষার্থী এটিকে বিশ্বাস করে আবেদন করেছে। আবেদনের সময় নিজেদের ছবি ও ডকুমেন্ট প্রদান করেছে। অনেক শিক্ষার্থী ২০০ টাকা করে পাঠিয়ে প্রতারিত হয়েছে।

প্রতারক চক্ররা বৃত্তি ও চাকরির নামে নানাভাবে ভুয়া সার্কুলার ছড়িয়ে সাধারণ মানুষকে প্রতারিত করে থাকে। এই ঘটনাটিও তারই একটি উদাহরণ। ভুয়া সার্কুলারটি সন্দেহজনক বোঝার মতো বেশ কিছু লক্ষণ ছিল এবং অনেকেই তা বুঝেছিলেন। তবে প্রথম আলোর প্রতিবেদন প্রকাশের পর অনেকে প্রতারক চক্রের এই ভুয়া বিজ্ঞপ্তিটিকে সত্য মনে করে আবেদন করেছেন এবং প্রতারণার শিকার হয়েছেন। উপবৃত্তির খবর পোস্ট করা পেজ-গ্রুপগুলোও বিপাকে পড়েছেন। কেউ কেউ মন্তব্য করেছেন— “প্রথম আলোর মতো পত্রিকা যদি এই ধরনের ভুয়া বিজ্ঞাপন প্রচার করে, তবে কাকে বিশ্বাস করব?”
সুতরাং, সেবা ফাউন্ডেশনের শিক্ষাবৃত্তি, প্রতি মাসে পাবে ৩ হাজার টাকা শীর্ষক শিরোনামে প্রথম আলোয় প্রকাশিত সংবাদটি ভুয়া।
তথ্যসূত্র
- Sheba Foundation-সেবা-ফাউন্ডেশন: Facebook Post
- Rumor Scanner analysis

