আওয়ামী লীগের ওপর থেকে ৬০ দিনের মধ্যে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতে জাতিসংঘের চিঠি পাঠানোর দাবিটি মিথ্যা

সম্প্রতি, কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের ওপর থেকে ৬০ দিনের মধ্যে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার জন্যে জাতিসংঘ বাংলাদেশ সরকারকে চিঠি পাঠিয়েছে দাবিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি ভিডিও প্রচার করা হয়েছে। 

ফেসবুকে প্রচারিত এমন ভিডিও দেখুন এখানে (আর্কাইভ) এবং এখানে (আর্কাইভ) এবং এখানে (আর্কাইভ)।

ইনস্টাগ্রামে প্রচারিত একই ভিডিও দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।

একই ভিডিওটি টিকটকেও প্রচারিত হতে দেখা যায়। প্রচারিত ভিডিওটি দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।

আওয়ামী লীগের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার জন্যে জাতিসংঘ থেকে তারেক রহমানকে চিঠি দিয়েছে দাবিতে আরেকটি ভিডিও প্রচারিত হতে দেখা যায়। টিকটকে প্রচারিত এই ভিডিওটি দেখুন এখানে (আর্কাইভ)

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে দেখা যায়, আওয়ামী লীগের ওপর থেকে ৬০ দিনের মধ্যে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার জন্যে জাতিসংঘ বাংলাদেশ সরকারকে চিঠি দেওয়ার দাবিতে প্রচারিত তথ্যটি সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করায় জনসাধারণের রাজনীতিতে অংশগ্রহণে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছে জানিয়ে জাতিসংঘের পাঠানো একটি চিঠিকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে আলোচিত দাবিটি প্রচার করা হয়েছে।

আলোচিত দাবিটির বিষয়ে অনুসন্ধানে গণমাধ্যম কিংবা অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রে জাতিসংঘ থেকে বাংলাদেশ সরকারকে বা তারেক রহমানকে এমন চিঠি পাঠানোর তথ্য পাওয়া যায়নি। এমনকি আলোচিত দাবিতে প্রচারিত প্রথম ভিডিওতে দেখতে পাওয়া সাংবাদিক কাজী রুনার মূল ভিডিওতেও ৬০ দিনের মধ্যে আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার দাবি করতে শোনা যায়নি। বরং, তিনি জানান, আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করায় অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে জাতিসংঘ থেকে গতবছরের ডিসেম্বরে একটি চিঠি দেওয়া হয়। যেখানে দলটিকে নিষিদ্ধ করায় জাতিসংঘ থেকে ১০ টি প্রশ্ন করা হয়। এছাড়াও এটি জনসাধারণের রাজনীতিতে অংশগ্রহণে অসামঞ্জস্যপূর্ণ সীমাবদ্ধতা তৈরি করবে বলেও চিঠিতে শঙ্কা প্রকাশ করা হয়।

পরবর্তীতে অনুসন্ধানে জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনের ওয়েবসাইটে মূল চিঠিটির সন্ধান পাওয়া যায়। চিঠিটি থেকে জানা যায়, এটি ২০২৫ সালের ২৯ ডিসেম্বর তৎকালীন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারকে পাঠানো হয়। চিঠিতে মূলত ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর নেওয়া পদক্ষেপ, বিশেষ করে আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধ করা, গণগ্রেপ্তার, এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে সরকারের কাছে তথ্য ও ব্যাখ্যা চাওয়া হয়েছে।

চিঠিতে বলা হয়, আওয়ামী লীগকে নিষিদ্ধ করা, দলটির রাজনৈতিক কার্যক্রম ও প্রচার কার্যক্রম বন্ধ করা, ব্যাপক গ্রেপ্তার অভিযান (“অপারেশন ডেভিল হান্ট”) পরিচালনা করা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচার কার্যক্রম শুরু করা- মানবাধিকার ও গণতান্ত্রিক অধিকারের ক্ষেত্রে গুরুতর উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে। এসব পদক্ষেপ মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, শান্তিপূর্ণ সমাবেশের অধিকার, সংগঠনের স্বাধীনতা এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণের অধিকারকে সীমিত করতে পারে, যা আন্তর্জাতিক নাগরিক ও রাজনৈতিক অধিকার সনদ (ICCPR)-এর সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি করে। একই সঙ্গে শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ নেতাদের বিচারপ্রক্রিয়ায় ন্যায্য বিচারের নিশ্চয়তা, আইনজীবীদের নিরাপত্তা, আটক ব্যক্তিদের প্রতি আচরণ এবং হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগ নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করা হয়েছে। এসব প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ বাংলাদেশের সরকারের কাছে ব্যাখ্যা চেয়ে জোর দিয়ে বলেছে যে সন্ত্রাসবিরোধী আইন বা অন্যান্য আইনি কাঠামো যেন রাজনৈতিক দল দমন বা গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ সীমিত করার জন্য ব্যবহার না করা হয় এবং মানবাধিকার, আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

তবে চিঠিটির কোনো অংশে ৬০ দিনের মধ্যে আওয়ামী লীগের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার বিষয়ে কিছু বলতে দেখা যায়নি। বরং লক্ষ্য করা যায়, চিঠিতে উল্লেখ করা হয় চিঠির বক্তব্য ও তৎকালীন সরকারের পক্ষ থেকে জানানো যেকোনো উত্তর ৬০ দিনের মধ্যে ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হবে।

অর্থাৎ, এ থেকে নিশ্চিত হওয়া যাচ্ছে, ৬০ দিন বিষয়ক এই কথাটিকেই ‍ভুলভাবে ব্যাখ্যা করে আলোচিত দাবিটি প্রচার করা হয়েছে।

সুতরাং, আওয়ামী লীগের ওপর থেকে ৬০ দিনের মধ্যে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার জন্যে জাতিসংঘ বাংলাদেশ সরকারকে চিঠি পাঠিয়েছে দাবিতে প্রচারিত তথ্যটি মিথ্যা।

তথ্যসূত্র

Share: