ভিডিওতে ব্যবহৃত ক্লিপগুলো ঘূর্ণিঝড় রিমালের তাণ্ডবের দৃশ্যের নয়

গত ২৬ মে রাতে ঘূর্ণিঝড় রিমাল বাংলাদেশের উপকূলে আঘাত হানে। পরের দিন সকালে এটি বাংলাদেশের স্থলভাগে উঠে আসে, যার ফলে দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এরই প্রেক্ষিতে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক ও ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম ইউটিউবে একটি ভিডিও প্রচার করে দাবি করা হচ্ছে, ভিডিওটি ঘূর্ণিঝড় রিমালের তাণ্ডবের দৃশ্যের।

ঘূর্ণিঝড় রিমালের

উক্ত দাবিতে ইউটিউবে প্রচারিত ভিডিও দেখুন এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ) এবং এখানে (আর্কাইভ)। 
উক্ত দাবিতে ফেসবুকে প্রচারিত ভিডিওটি দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।

এই প্রতিবেদনটি প্রকাশ হওয়া অবধি উক্ত দাবিতে সবচেয়ে ভাইরাল ইউটিউব ভিডিওটি প্রায় সাড়ে ছয় লক্ষ সাবস্ক্রাইবারের ইউটিউব চ্যানেল থেকে প্রচারিত হচ্ছে এবং ১৫ হাজারেরও অধিক বার ভিডিওটি দেখা হয়েছে। অপরদিকে ফেসবুক ভিডিওটি ১৬ হাজারেরও অধিক বার দেখা হয়েছে এবং প্রায় ৫ শত পৃথক অ্যাকাউন্ট থেকে ভিডিওটিতে প্রতিক্রিয়া জানানো হয়েছে।

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, ঘূর্ণিঝড় রিমালের তাণ্ডবের দৃশ্য দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটি ৪টি ভিন্ন ঘটনার ৭ টি আলাদা আলাদা ক্লিপ যুক্ত করে তৈরি করা হয়েছে। এর মধ্যে কোনোটাই ঘূর্ণিঝড় রিমালের দৃশ্য নয়। 

অনুসন্ধানের শুরুতে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটির প্রথম ফুটেজের কিছু কী-ফ্রেম রিভার্স ইমেজ সার্চ করে অরুণ বঠরা নামের একজন ব্যক্তির এক্স অ্যাকাউন্টে ২০২৩ সালের ৯ জুলাই তারিখে হিমাচলের দৃশ্য দাবিতে প্রচারিত একটি ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়। যার একটি অংশের সাথে আলোচিত ফুটেজটির হুবহু মিল রয়েছে।

উক্ত ভিডিওটিতে মূল ভিডিও সোর্স হিসেবে Go Himachal নামের আরেকটি এক্স অ্যাকাউন্টের উল্লেখ দেখতে পাওয়া যায়। অতঃপর ভারতের হিমাচল প্রদেশ থেকে পরিচালিত Go Himachal নামের অ্যাকাউন্টটি থেকে পোস্টকৃত উক্ত ভিডিওটিতে উক্ত দৃশ্যকে হিমাচলের দৃশ্য দাবি করা হয়। তাছাড়া, একই এক্স ভিডিওটির আরো দুইটি দৃশ্যের সাথে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটিতে ব্যবহৃত চতুর্থ ও সপ্তম ফুটেজের হুবহু মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

অতঃপর আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটির দ্বিতীয় ফুটেজের কিছু কী-ফ্রেম রিভার্স ইমেজ সার্চ করে জার্মান গণমাধ্যম ডয়চে ভেলের এক্স অ্যাকাউন্ট DW News এ ২০২৩ সালের ১৬ মে তারিখে “Cyclone Mocha, a category 5 storm, has wreaked havoc on coastal regions of Myanmar and Bangladesh.” শিরোনামে প্রচারিত একটি ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়। উক্ত ভিডিওর একটি অংশের সাথে আলোচিত ফুটেজটির হুবহু মিল রয়েছে। তাছাড়া, একই ভিডিও এর অন্য আরেকটি দৃশ্যের সাথে আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটির পঞ্চম ক্লিপের হুবহু মিল খুঁজে পাওয়া যায়।

ডয়চে ভেলের উক্ত ভিডিওতে দৃশ্যগুলোকে ২০২৩ সালে আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় মোখার দৃশ্য দাবি করা হয়েছে। ভিডিওটির শিরোনামে দৃশ্যের স্থান হিসেবে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের নাম উল্লেখ করা হয়৷ অর্থাৎ, নিশ্চিত হওয়া যায় যে এই দুইটি দৃশ্যও ঘূর্ণিঝড় রিমালের দৃশ্য নয়।

তারপর আলোচিত দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটির তৃতীয় ক্লিপের প্রসঙ্গে অনুসন্ধান করলে ২০২২ সালের ১৮ অক্টোবর তারিখে আমেরিকান আবহাওয়া বিষয়ক মিডিয়া ফক্স ওয়েদারের ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে “A massive waterspout swirled onto Ayia Napa Beach in Cyprus on Oct. 17. Local police say no major damage was done.” শিরোনামে প্রকাশিত একটি ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়। উক্ত ভিডিওর একটি অংশের সাথে আলোচিত ফুটেজটির হুবহু মিল রয়েছে।

অর্থাৎ, এ বিষয়েও নিশ্চিত হওয়া যায়, আলোচিত উক্ত ক্লিপটিও বাংলাদেশের কিংবা ঘূর্ণিঝড় রিমালের নয়, বরং দ্বীপ রাষ্ট্র সাইপ্রাসের একটি সৈকতের।

সবশেষে বাকী থাকা ষষ্ঠ ক্লিপের উৎসের অনুসন্ধান করলে Surrealvideos নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলে মূল ভিডিওটি খুঁজে পাওয়া যায়।

মূল ভিডিওটি ২০২৩ সালের ৪ সেপ্টেম্বর তারিখে “Tornado Damage in Coastal Town” শিরোনামে ভিডিও শেয়ারিং প্ল্যাটফর্ম ইউটিউবে শর্টস আকারে পোস্ট করা হয়৷ উক্ত ইউটিউব চ্যানেলটির বিবরণী পড়লে জানা যায়, উক্ত ইউটিউব চ্যানেলটি মূলত ডিজিটাল প্রযুক্তির সাহায্যে নানারকমের দুর্যোগের ভিডিও সম্পাদনা করে তৈরি করে পোস্ট করে থাকে৷ উক্ত ইউটিউব চ্যানেলটির অন্যান্য ভিডিও পর্যবেক্ষণ করলেও এ বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যায়। অর্থাৎ, ষষ্ঠ ক্লিপটিও সম্প্রতি আঘাত হানা ঘূর্ণিঝড় রিমালের দৃশ্য নয়।

মূলত, পুরনো ৪ টি ভিন্ন প্রসঙ্গের ৭টি ভিন্ন ভিন্ন দৃশ্য সম্পাদনার সাহায্যে একটি ভিডিওতে সংযুক্ত করে ঘূর্ণিঝড় রিমালের দৃশ্য দাবিতে প্রচারিত হচ্ছে যার একটি দৃশ্যও ঘূর্ণিঝড় রিমালের দৃশ্য নয়।

অর্থাৎ, ঘূর্ণিঝড় রিমালের দৃশ্য মর্মে ভিন্ন ভিন্ন ঘটনার পুরনো ভিডিও প্রচার করা হচ্ছে; যা  মিথ্যা।

তথ্যসূত্র

Share: