ভারতে কথিত বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গা তাড়ানোর দৃশ্য দাবিতে ভিন্ন ঘটনার ভিডিও প্রচার

ভারতের নির্বাচন কমিশনের ঘোষণা অনুযায়ী দেশটির ১২টি রাজ্যে ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোতে গত ২৮ অক্টোবর থেকে শুরু হয় ভোটার তালিকায় ‘নিবিড় সংশোধনের’ প্রক্রিয়া। যা এসআইআর বা স্পেশাল ইনটেন্সিভ রিভিশন নামে অধিক পরিচিত। এরই অংশ হিসেবে গত ৪ নভেম্বর থেকে পশ্চিমবঙ্গেও শুরু হয় ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধন কর্মসূচি। জানা যায়, এই প্রক্রিয়ায় প্রয়োজনীয় নথি না দেখাতে পারলে বহু মানুষের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ক্ষমতাসীন বিজেপির কেন্দ্রীয় নেতারা দাবি করে আসছেন, পশ্চিমবঙ্গের মতো কিছু রাজ্যে বহু কথিত বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী ভোটার তালিকায় নাম তুলে ফেলেছেন। ‘নিবিড় সংশোধন’ হলেই বাদ পড়বে ‘অবৈধ বাংলাদেশি’ ও ‘রোহিঙ্গারা’। এর প্রেক্ষিতে সম্প্রতি কয়েকটি ভারতীয় ফেসবুক অ্যাকাউন্ট থেকে একটি ভিডিও প্রচার করে দাবি করা হয়, সেখানে বসবাসরত বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দেওয়া হচ্ছে। উক্ত দাবিতে প্রচারিত ভিডিওগুলোতে দেখা যায়, একজন যুবক কয়েকজন ব্যক্তিকে জোরপূর্বক কান ধরিয়ে সেখান থেকে চলে যেতে বাধ্য করছে। এছাড়াও ভিডিওটিতে ওই যুবককে বাংলা ভাষায় কথা বলতেও শোনা যায়। যা থেকে ধারণা করা যাচ্ছে, ভিডিওটি পশ্চিমবঙ্গ অথবা আসাম রাজ্য থেকে কথিত বাংলাদেশি সেটেলারদের তাড়িয়ে দেওয়ার ভিডিও হিসেবে দাবি করা হয়েছে।

ফেসবুকে প্রচারিত এমন ভিডিও দেখুন এখানে (আর্কাইভ), এখানে (আর্কাইভ) এবং এখানে (আর্কাইভ)।
ইনস্টাগ্রামে প্রচারিত একই ভিডিও দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।
ফ্যাক্টচেক
রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে দেখা যায়, আলোচিত ভিডিওটি ভারতের সাম্প্রতিক ভোটার তালিকা সংশোধন বা দেশটিতে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর সাথে সম্পর্কিত নয়। প্রকৃতপক্ষে, ভারতের পশ্চিমবঙ্গের দুর্গাপুরে অবৈধ গরু পাচারকারী সন্দেহে কয়েকজন মুসলিম ব্যক্তিকে বিজেপি নেতার নির্যাতনের ভিডিওকে আলোচিত দাবিতে প্রচার করা হয়েছে।
আলোচিত ভিডিওটির বিষয়ে অনুসন্ধানে ভারতীয় গণমাধ্যম TV9 Bangla-এর ইউটিউব চ্যানেলে গত ২ আগস্ট Durgapur Cow Smuggling: ‘দুর্গাপুর থেকে একটা গরুও পাচার করতে দেব না’ শিরোনামে প্রচারিত একটি ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়।

ভিডিওটি পর্যালোচনা করে এর ৩৫ সেকেন্ড থেকে ৪৮ সেকেন্ড পর্যন্ত সময়ের ফুটেজের সাথে আলোচিত ভিডিওর ঘটনার মিল পাওয়া যায়। প্রাপ্ত ভিডিওটি আলোচিত ভিডিওটির হুবহু ফুটেজ না হলেও উভয় ভিডিওতে একই ব্যক্তিদের ওই যুবক দ্বারা হেনস্তার শিকার হতে দেখা যায়। ভিডিওটি থেকে জানা যায়, ওই ব্যক্তিদের জোরপূর্বক কান ধরিয়ে সেখান থেকে চলে যেতে বাধ্য করা যুবকের নাম পারিজাত গঙ্গোপাধ্যায়। তিনি বিজেপির যুব মোর্চার একজন নেতা। এছাড়াও জানা যায়, নির্যাতনের শিকার ওই ব্যক্তিদের অবৈধ গরু পাচারকারী সন্দেহে পারিজাত গঙ্গোপাধ্যায় নামের ওই বিজেপি নেতা ও তার সমর্থকরা তাদের আটক করে। তবে গরু পাচারকারী সন্দেহে নির্যাতনের শিকার ওই ব্যক্তিদের কাছে বৈধ কাগজ ছিল বলেও প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়।
অনুসন্ধানে আরেক ভারতীয় গণমাধ্যম News18 Bangla-এর ইউটিউব চ্যানেলেও একই ঘটনায় প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনের সন্ধান পাওয়া যায়। প্রতিবেদনটিতেও পারিতাজ গঙ্গোপাধ্যায় ও তার সমর্থকদের ওই ব্যক্তিদের মারধর করতে দেখা যায়। পরবর্তীতে অনুসন্ধানে জানা যায়, গরু পাচারের অভিযোগে নির্যাতনের শিকার ওই ব্যক্তিরা মুসলিম ধর্মাবলম্বী।
পরবর্তীতে জানা যায়, দুর্গাপুরের ওই ঘটনায় জেলা তৃণমূল সভাপতি ও পাণ্ডবেশ্বরের বিধায়ক নরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী কোক-ওভেন থানায় অভিযোগ দায়ের করেন। তার অভিযোগের প্রেক্ষিতে পারিজাত গঙ্গোপাধ্যায়সহ এ ঘটনায় জড়িত আরও সাতজনকে গ্রেফতার করে পুলিশ।
অর্থাৎ, আলোচিত ভিডিওটির সাথে ভারতের ভোটার তালিকায় নিবিড় সংশোধন বা এসআইআর কর্মসূচি অথবা দেশটিতে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীর কোনো সম্পর্ক নেই।
সুতরাং, অবৈধ গরু পাচারকারী অভিযোগে নির্যাতনের ভিডিওকে ভারতে বসবাসরত বাংলাদেশি ও রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দেওয়ার ভিডিও দাবিতে প্রচার করা হয়েছে; যা সম্পূর্ণ মিথ্যা।
তথ্যসূত্র
- TV9 Bangla: Durgapur Cow Smuggling: ‘দুর্গাপুর থেকে একটা গরুও পাচার করতে দেব না’ | #TV9D
- News18 Bangla: Durgapur News : দুর্গাপুরে গো-রক্ষকদের তাণ্ডব! গরু বোঝাই গাড়ি আটকে হামলা | Bangla News
- Kolkata24x7: Durgapur Cattle Smuggling: বিজেপি নেতার দাদাগিরি! দুর্গাপুরে প্রবীণ ব্যক্তিদের ‘গরু পাচারকারী’ সন্দেহে নির্যাতন
- Eisamay: প্রবীণকে হেনস্থার অভিযোগ, গ্রেপ্তার বিজেপি নেতা পারিজাত

