সারাদেশে ৫০০ ভোটকেন্দ্রে আগুন এবং সিইসি কর্তৃক নির্বাচন স্থগিতের গুজব

গত ০৫ জানুয়ারি Media Cell 24 নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলে সারাদেশে ৫০০ ভোট কেন্দ্রে আগুন নির্বাচন স্থগিত করলেন সিইসি– শীর্ষক শিরোনামে এবং ৫০০ শত ভোট কেন্দ্রে আগুন জ্বালিয়ে দিল, এইমাত্র সারাদেশে ভোট স্থগিত করলেন সিইসি– শীর্ষক থাম্বনেইলে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়েছে। 

৫০০ ভোটকেন্দ্রে আগুন

ইউটিউবে প্রচারিত ভিডিও দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, সারাদেশে ভোটকেন্দ্রে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটলেও ৫০০টি ভোটকেন্দ্রে আগুন লাগার ঘটনা ঘটেনি এবং সিইসি নির্বাচন স্থগিত করেননি বরং আলোচিত ভিডিও প্রকাশের পূর্বে ভোটকেন্দ্রে আগুন লাগানোর ঘটনা না ঘটলেও গত ০৬ জানুয়ারি অন্তত ২১ ভোটকেন্দ্রে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে।

অনুসন্ধানের শুরুতে আলোচিত ভিডিওটি পর্যবেক্ষণ করে রিউমর স্ক্যানার টিম। ভিডিওটি পর্যবেক্ষণ করে দেখা যায়, শুরুতে সিইসি’র একটি বক্তব্য দেওয়ার ফুটেজ রয়েছে। পরবর্তীতে ‘সময় টিভি’র একটি সরাসরি সম্প্রচারিত ভিডিও রয়েছে। এরপর যমুনা টেলিভিশনের দুইটি সংবাদ প্রতিবেদন রয়েছে এবং চ্যানেল ২৪ এর একটি সংবাদ প্রতিবেদন এবং একটি সরাসরি সম্প্রচারিত ভিডিও রয়েছে। পরিশেষে বিএনপি’র নেতা গোলাম মাওলা রনি’র বক্তব্য দেওয়ার একটি ভিডিও রয়েছে।

ভিডিও যাচাই- ১

সিইসি’র বক্তব্য দেওয়ার ভিডিওটিতে ‘আরটিভি’র লোগো দেখা যায়। সেই লোগো’র সূত্র ধরে অনুসন্ধানে আরটিভি’র ইউটিউব চ্যানেলে গতবছরের ২৪ ডিসেম্বর “ভোট কেন্দ্রে কারচুপি ঘটনা ঘটলে, কেন্দ্র বন্ধ: সিইসি” শীর্ষক শিরোনামে প্রকাশিত একটি ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়।

উক্ত ভিডিওটির সাথে আলোচিত ভিডিওটির মিল রয়েছে। 

উক্ত ভিডিওটি পর্যবেক্ষণ করে জানা যায়, গত ২৩ ডিসেম্বর, (২০২৩) ময়মনসিংহ টাউন হলের অ্যাডভোকেট তারেক স্মৃতি অডিটোরিয়ামে ছয় জেলার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেন সিইসি।

সভায় তিনি বলেন, এখন কিছু অভিযোগ থাকলেও প্রচারণা ও ভোটের পরিবেশ স্বাভাবিক।

কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, ভোট এক জায়গায় দিলে আরেক জায়গায় চলে যাবে এটার কোনো সুযোগ নেই। এগুলো ভ্রান্ত প্রচারণা। ভোটের দিন একটি মাত্র কেন্দ্রে কারচুপি হলেও ভোটগ্রহণ বন্ধ করা হবে।

তিনি আরও বলেন, ভোটের আগের পনেরো দিন কি হলো না হলো সেটা কিছুদিন পর মানুষ ভুলে যাবে। কিন্তু ভোটের দিন রেজাল্টটা কী হলো, পোলিংয়ের মধ্যে কারচুপি হলো কি না, জবরদস্তি সিল মারা হলো কি না এ রকম কোনো ঘটনা ঘটলে নির্বাচন গ্রহণযোগ্য হবে না।

তবে, উক্ত মতবিনিময় সভায় সিইসি ৭ জানুয়ারির নির্বাচন স্থগিত করার বিষয়ে কিছু বলেননি।

ভিডিও যাচাই- ২

এই অংশে ‘সময় টিভি’র একটি সরাসরি সম্প্রচারিত ভিডিও দেখানো হয়। পরবর্তীতে অনুসন্ধানে সময় টিভি’র ইউটিউব চ্যানেলে গত ৫ জানুয়ারি “গাইবান্ধা-৫ আসনে ভোট বন্ধ হয়নি, ইসির বিজ্ঞপ্তি” শীর্ষক শিরোনামে প্রকাশিত সরাসরি সম্প্রচারের ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়।

উক্ত সরাসরি সম্প্রচারের ভিডিওটির সাথে আলোচিত ভিডিওটির মিল রয়েছে।

উক্ত ভিডিওটি পর্যবেক্ষণ করে জানা যায়, গাইবান্ধা-৫ আসনে ভোটগ্রহণ বন্ধ থাকবে বলে একটি তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। সেই তথ্যের প্রেক্ষিতে নির্বাচন কমিশন থেকে সরাসরি সম্প্রচার করে সময় টিভি।

এখানে, সারাদেশে ৫০০ ভোট কেন্দ্রে আগুন দেওয়া বা নির্বাচন স্থগিত করা সংক্রান্ত কোনো তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।

ভিডিও যাচাই- ৩

ভিডিওর এই অংশে একজন সংবাদ উপস্থাপককে সংবাদ পাঠ করতে দেখা যায় এবং ভিডিওটিতে যমুনা টেলিভিশনের লোগো দেখা যায়। লোগো’র সূত্র ধরে অনুসন্ধানে যমুনা টেলিভিশনের ইউটিউব চ্যানেলে গত ৫ জানুয়ারি “নির্বাচনপূর্ব সহিংসতার আগুনে পুড়ছে বিভিন্ন জেলার ভোট কেন্দ্র” শীর্ষক শিরোনামে প্রকাশিত একটি সংবাদ প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়।

উক্ত সংবাদ প্রতিবেদনে থাকা সংবাদ উপস্থাপক এবং পাঠ করা সংবাদের সাথে আলোচিত ভিডিওটিতে থাকা উপস্থাপক এবং পাঠ করা সংবাদের মিল রয়েছে।

উক্ত সংবাদ প্রতিবেদনটি পর্যবেক্ষণ করে জানা যায়, দেশের কয়েকটি ভোটকেন্দ্রে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে গত কয়েকদিনে। এর প্রেক্ষিতে সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করে যমুনা টেলিভিশন।

তবে, এই প্রতিবেদনে সারাদেশে ৫০০টি ভোটকেন্দ্রে আগুন দেওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়নি এবং নির্বাচন স্থগিতেরও কোনো তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।

ভিডিও যাচাই- ৪

ভিডিওর এই অংশেও একজন সংবাদ পাঠিকাকে সংবাদ পাঠ করতে দেখা যায় এবং ভিডিওটিতে যমুনা টেলিভিশনের লোগো দেখা যায়। লোগো’র সূত্র ধরে অনুসন্ধানে যমুনা টেলিভিশনের ইউটিউব চ্যানেলে গত ৫ জানুয়ারি “ভোটের আগেই রাজশাহী ও ফেনীতে ৪টি ভোটকেন্দ্রে আগুন” শীর্ষক শিরোনামে একটি সংবাদ প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়।

উক্ত সংবাদ প্রতিবেদনে থাকা সংবাদ পাঠিকা এবং পাঠ করা সংবাদের সাথে আলোচিত ভিডিওটিতে থাকা পাঠিকা এবং পাঠ করা সংবাদের মিল রয়েছে। 

উক্ত সংবাদ প্রতিবেদনটি পর্যবেক্ষণ করে জানা যায়, রাজশাহীতে ৪টি ভোটকেন্দ্রে আগুন এবং ফেনীর সোনাগাজীতে ভোটকেন্দ্রে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটেছে। সেই প্রেক্ষিতে সংবাদ প্রতিবেদন করে যমুনা টেলিভিশন।

তবে, এখানেও সারাদেশে ৫০০টি ভোটকেন্দ্রে আগুন দেওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়নি এবং নির্বাচন স্থগিতেরও কোনো তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।

ভিডিও যাচাই- ৫

ভিডিওর এই অংশে একজনকে সংবাদ পাঠ করতে শোনা যায়। পঠিত সংবাদের সূত্র ধরে প্রাসঙ্গিক কি-ওয়ার্ড সার্চ করে চ্যানেল ২৪ এর ইউটিউব চ্যানেলে ৬ জানুয়ারি “নির্বাচনের আগের রাতে দেশের বিভিন্ন স্থানে ভোটকেন্দ্রে আগুন!” শীর্ষক শিরোনামে প্রকাশিত একটি সংবাদ প্রতিবেদন খুঁজে পাওয়া যায়।

উক্ত সংবাদ প্রতিবেদনের সাথে আলোচিত ভিডিওটিতে থাকা সংবাদ প্রতিবেদনের  মিল রয়েছে।

উক্ত সংবাদ প্রতিবেদনটি পর্যবেক্ষণ করে জানা যায়, সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন জায়গার কয়েকটি ভোটকেন্দ্রে আগুন এবং যানবাহনে আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে। সেই প্রেক্ষিতে একটি সংবাদ প্রতিবেদন প্রকাশ করে চ্যানেল ২৪।

তবে, এই প্রতিবেদনেও সারাদেশে ৫০০টি ভোটকেন্দ্রে আগুন দেওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়নি এবং নির্বাচন স্থগিতেরও কোনো তথ্য উল্লেখ করা হয়নি।

ভিডিও যাচাই- ৬

এই অংশে সময় চ্যানেল ২৪ একটি সরাসরি সম্প্রচার দেখানো হয়। পরবর্তীতে অনুসন্ধানে চ্যানেল ২৪ ইউটিউব চ্যানেলে গত ৫ জানুয়ারি “ফেনীর চর শাহাধিকারী ভোটকেন্দ্রে আগুন” শীর্ষক শিরোনামে প্রকাশিত একটি সরাসরি সম্প্রচারের ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়।

উক্ত সরাসরি সম্প্রচারের ভিডিওটির সাথে আলোচিত ভিডিওটির মিল রয়েছে। 

উক্ত ভিডিওটি পর্যবেক্ষণ করে জানা যায়, ফেনীর সমুদ্র উপকূলীয় উপজেলা সোনাগাজীর চর সাহাভিখারী উচ্চ বিদ্যালয়ে পেট্রোল ঢেলে অগ্নিসংযোগ করেছে দুর্বৃত্তরা। বিদ্যালয়টি দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ফেনী-৩ আসনের একটি ভোট কেন্দ্র। শুক্রবার (৫ জানুয়ারি) সকাল সাতটার দিকে এ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।

তবে, এখানে রিপোর্টার এবং সঞ্চালককে সারাদেশে ৫০০টি ভোটকেন্দ্রে আগুন দেওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়নি এবং নির্বাচন স্থগিতেরও কোনো তথ্য উল্লেখ করতে শোনা যায়নি। 

ভিডিও যাচাই- ৭

আলোচিত ভিডিওটির এই অংশে বিএনপি’ট নেতা গোলাম মাওলা রনিকে বক্তব্য দিতে দেখা যায়৷ পরবর্তীতে অনুসন্ধানে Golam Maula Rony নামক একটি ইউটিউব চ্যানেলে গত ৪ জানুয়ারি “উভয় সংকটে পুলিশ! আ.লীগের গৃহযুদ্ধ চরমে! বিএনপি জামাত পেটানো পুলিশ ডামি মামিদের নিকট অসহায়!” শীর্ষক শিরোনামে প্রকাশিত একটি ভিডিও খুঁজে পাওয়া যায়।

উক্ত ভিডিওটির সাথে আলোচিত ভিডিওটির মিল রয়েছে। 

উক্ত ভিডিওটি পর্যবেক্ষণ করে জানা যায়, পুলিশের বর্তমান কার্যক্রম নিয়ে ইতিহাস টেনে ব্যাখ্যা দেন বিএনপি’র এই নেতা।

তবে, গোলাম মাওলা রনিকে সারাদেশে ৫০০টি ভোটকেন্দ্রে আগুন দেওয়ার তথ্য উল্লেখ করা হয়নি এবং নির্বাচন স্থগিতেরও কোনো তথ্য উল্লেখ করতে শোনা যায়নি।

এছাড়া, সারাদেশে ৫০০টি ভোটকেন্দ্রে আগুন এবং নির্বাচন স্থগিতের বিষয়ে অনুসন্ধানে গণমাধ্যমে এ সংক্রান্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।

তবে, প্রথম আলো’র ওয়েবসাইটে ৭ জানুয়ারি “ভোটের আগে ১৪ জেলায় ২১ কেন্দ্রে আগুন” শীর্ষক শিরোনামে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদন পাওয়া যায়। 

প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট গ্রহণ শুরুর আগে শনিবার (৬ জানুয়ারি) রাত ১০টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় দেশের অন্তত ২৩ জেলায় ৪২টি অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। এর মধ্যে ১৪ জেলার ২১টি ভোটকেন্দ্রে আগুন দিয়েছে দুর্বৃত্তরা।

মূলত, গত ০৫ জানুয়ারি Media Cell 24 নামের একটি ইউটিউব চ্যানেলে সারাদেশে ৫০০ ভোট কেন্দ্রে আগুন নির্বাচন স্থগিত করলেন সিইসি- শীর্ষক শিরোনামে এবং ৫০০ শত ভোট কেন্দ্রে আগুন জ্বালিয়ে দিল, এইমাত্র সারাদেশে ভোট স্থগিত করলেন সিইসি- শীর্ষক থাম্বনেইলে একটি ভিডিও প্রচার করা হয়। তবে রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে জানা যায়, উক্ত ভিডিও প্রকাশের সময় এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। গত ০৬ জানুয়ারি পর্যন্ত ২১ ভোটকেন্দ্রে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। প্রকৃতপক্ষে, অধিক ভিউ পাবার আশায় সিইসি’র দেওয়া একটি বক্তব্যের কিছু অংশ, ভিন্ন ভিন্ন ঘটনার কয়েকটি সংবাদ প্রতিবেদনও কয়েকটি সরাসরি সম্প্রচার এবং বিএনপি’র নেতা গোলাম মাওলা রনির ভিন্ন বিষয়ের ওপর দেওয়া একটি বক্তব্যকে কেটে ডিজিটাল প্রযুক্তির সহায়তায় সম্পাদনা করে চটকদার থাম্বনেইল ব্যবহার করে কোনোপ্রকার নির্ভরযোগ্য তথ্যসূত্র ছাড়াই আলোচিত দাবিটি প্রচার করা হয়েছে।

সুতরাং, সারাদেশে ৫০০ ভোটকেন্দ্রে আগুন দেওয়া হয়েছে এবং নির্বাচন স্থগিত করেছেন সিইসি- শীর্ষক দাবিতে প্রচারিত তথ্যগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা। 

তথ্যসূত্র

Share: