“ফ্যামেলি কার্ডের নামে,, চাদাবাজি শুরু হয়ে গেছে, বিভিন্ন যায়গায় ৩০ থেকে ৫০ হাজার টাকা করে, অগ্রিম চান্দা আদায় করা হচ্ছে, তারেক রহমানের নামে” – এমন শিরোনাম দিয়ে সাথে রুমিন ফারহানার ছবি এবং ইনডিপেনডেন্ট টিভির লোগো জুড়ে দিয়ে একটি ফটোকার্ড গত বছরের অন্তত ২২ ডিসেম্বর থেকে ছড়াতে শুরু করে৷ রুমিন ফারহানা তখনও বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির পদধারী নেত্রী। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য ৩০ ডিসেম্বর তাকে বহিষ্কার করে বিএনপি। যাচাই করে দেখা যায়, রুমিন ফারহানা আলোচিত মন্তব্যটি করেননি।
বিএনপির ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনার শুরু ২০২৪ সালে। সে বছরের সেপ্টেম্বরে কিশোরগঞ্জে জেলা বিএনপি আয়োজিত জনসভায় ভার্চুয়ালি যুক্ত হয়ে প্রধান অতিথির বক্তব্যেও দলটির সে সময়ের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান বলেন, বাংলাদেশের প্রতিটি পরিবারকে খাদ্য নিরাপত্তা ‘স্বপ্ন প্রকল্প ফ্যামিলি কার্ড’ প্রদান করা হবে। এরপর নানা সময়েই এই কার্ডের আলাপ এসেছে। এ নিয়ে জোর প্রচারণা শুরু হয় মূলত নির্বাচনের তফসিলের আগে। দলটির একাধিক নেতার বক্তব্যে এই কার্ড সংক্রান্ত প্রতিশ্রুতি পাওয়া যায়। এরপরই আসতে শুরু করে কার্ড নিয়ে অপতথ্য।
ভুয়া ফটোকার্ড, বিএনপি ও তার অঙ্গসংগঠনের বিভিন্ন নেতাকর্মীদের নামে ভুয়া মন্তব্য আর ভিন্ন ঘটনার ভিডিওকে ফ্যামিলি কার্ড সংক্রান্ত নির্যাতনের ভিডিও বলে প্রচার দেখা গেছে পরের মাসে।

১২ ফেব্রুয়ারি বহুল আকাঙ্ক্ষার নির্বাচনে ২১২ আসনে জয় পেয়ে সরকার গঠন করে বিএনপি, প্রধানমন্ত্রী হন তারেক রহমান। ফ্যামিলি কার্ড কবে কীভাবে কোন প্রক্রিয়ায় দেওয়া হবে তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয় এরপর। ২৪ ফেব্রুয়ারি সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ১০ মার্চ ‘ফ্যামিলি কার্ড’ বিতরণের পরীক্ষামূলক (পাইলটিং) কার্যক্রমের উদ্বোধন করবেন। ওইদিন দেশের ১৪টি উপজেলায় এ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক সূচনা করা হবে। এই কার্ডের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিটি পরিবার প্রতি মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা করে আর্থিক সহায়তা পাবে। তখন পর্যন্ত প্রকাশ করা হয়নি, ঠিক কোনো প্রক্রিয়ায় এই কার্ড পেতে আবেদন করবেন নাগরিকরা। কিন্তু এর অন্তত দিন পাঁচেক আগে, গত ১৯ ফেব্রুয়ারি অন্তত পাঁচটি ফেসবুক পেজের সন্ধান পায় রিউমর স্ক্যানার। মারিয়া মিম, Nusrat Media, Behind The Facts, Bd Jobs News, Media Times নামের পেজগুলো থেকে সেদিন ফ্যামিলি কার্ডের জন্য আবেদনের দুইটি পৃথক লিংক প্রচার করা হয়।

পর্যালোচনায় দেখা যায়, এই পাঁচ ফেসবুক পেজ থেকে ফ্যামিলি কার্ডের আবেদন সংক্রান্ত একই ধরনের কনটেন্ট নিয়মিতভাবে ছড়ানো হয়েছে। ‘মারিয়া মিম’ নামের পেজটি ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নিয়মিত এ–সংক্রান্ত পোস্ট করলেও এরপর কিছুটা অনিয়মিত হয়ে পড়ে; তবে ১০ মার্চ একদিনেই পেজটি থেকে ১৮টি পোস্ট করা হয়। পেজটিতে নিয়মিত এডাল্ট কনটেন্টও প্রচার করা হয়। ‘Nusrat Media’ নামের পেজটিও ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত এ বিষয়ে নিয়মিত পোস্ট করছিল, পরে বিরতির পর ১০ মার্চ একদিনেই ১৬টি পোস্ট করা হয় এবং এখানেও নিয়মিত এডাল্ট কনটেন্টের পোস্ট পাওয়া যায়। ‘Behind The Facts’ পেজটি ২৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নিয়মিত পোস্ট করার পর কিছুটা বিরতি নিয়ে ১০ মার্চ এ সংক্রান্ত ২টি পোস্ট করে। ‘Bd Jobs News’ পেজটিতে ২ মার্চ পর্যন্ত ফ্যামিলি কার্ডের আবেদন সংক্রান্ত পোস্ট নিয়মিত ছিল, এরপর ৯ মার্চ থেকে আবার পোস্ট শুরু করে এবং ১০ মার্চ একদিনেই ২০টি পোস্ট করে; পেজটিতেও এডাল্ট কনটেন্ট দেখা যায়। অন্যদিকে ‘Media Times’ পেজটি নিয়মিত পোস্ট করলেও ১০ মার্চ একদিনেই ৩২টি পোস্ট করে এবং এখানেও এডাল্ট কনটেন্ট প্রচারের বিষয়টি লক্ষ্য করা যায়।
পেজগুলোতে ফ্যামিলি কার্ডের জন্য আবেদনের লিংক হিসেবে শুরুর দিকে https://bddailynews.xyz/family-card/ ও https://prothom-alo.online/family-card/ এই দুই লিংক দেওয়া হয়। ইউআরএল আলাদা হলেও এই দুই ওয়েবসাইটের ইন্টারফেস অবশ্য একই রকম। উক্ত দুই লিংকে (১, ২) প্রবেশ করলে ‘ফ্যামিলি কার্ড অনলাইন পোর্টাল ২০২৬’ শিরোনামে একটি পেজ খুলে যায়। পেজটিতে ‘আবেদন করুন’ নামে একটি বাটন রয়েছে, যাতে ক্লিক করলে নগদ৮৮ নামে অনলাইনে জুয়া খেলার নিষিদ্ধ ওয়েবসাইটে নিয়ে যায়। এখন উক্ত লিংকগুলোর পরিবর্তে https://familycard.online/ ও https://amarportal.xyz/eid-vata/ এই দুই লিংকের মাধ্যমে প্রচারণা চালানো হচ্ছে।
সাইটগুলোর ডোমেইন যাচাই করতে গিয়ে দেখা যায়, গত বছরের ০১ অক্টোবর থেকে এ বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে সাইটগুলোর ডোমেইন রেজিষ্ট্রেশন হয়েছে।
দায়িত্বশীল অনেক ব্যক্তির মাধ্যমেও এই কার্ড সংক্রান্ত বিভ্রান্তি আরো ডালপালা মেলেছে৷ যুক্তরাজ্য বিএনপির সাবেক যুগ্ম সম্পাদক ও জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশন ইউরোপের কো-অর্ডিনেটর কামাল উদ্দিন তার ফেসবুক প্রোফাইলে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি Media Times নামের পেজটির একটি পোস্ট শেয়ার করেন যাতে একই ভুয়া লিংক দেওয়া ছিল। গত ২৩ ফেব্রুয়ারি AFR Technology 2.0 নামের একটি কনটেন্ট ক্রিয়েশন ফেসবুক পেজে ‘ফ্যামিলি কার্ড আবেদন করার নিয়ম’ শিরোনামে একটি ভিডিও প্রকাশ করা হয়। শিরোনাম এবং থাম্বনেইলে আলোচিত ফ্যামিলি কার্ডের বিষয়ে উল্লেখ থাকলেও ভিডিওটিতে মূলত দেখানো হয় টিসিবির স্মার্ট কার্ডের জন্য আবেদনের নিয়ম। এই ভিডিওটি এখন পর্যন্ত দেখা হয়েছে প্রায় ৬২ লক্ষাধিক বার।

মেটার এড লাইব্রেরিতে ‘ফ্যামিলি কার্ড’ লিখে সার্চ করলেও এমন একাধিক আবেদনের লিংক সংবলিত পোস্টের সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে। আজ (১১ মার্চ) সকালে এমন অন্তত আটটি ভিডিওর এড সক্রিয় অবস্থায় দেখা যায়। এসব ভিডিওতে ভিন্ন ভিন্ন ছয়টি ওয়েবসাইটের লিংক দিয়ে সেখানে ফ্যামিলি কার্ডের জন্য আবেদন করতে আহ্বান জানানো হচ্ছে।
ফ্যামিলি কার্ড নিয়ে ভুয়া এসব ওয়েবসাইটের বিষয়ে সতর্ক করেছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়। মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে দেওয়া এক সতর্কবার্তায় বলা হচ্ছে, “একটি অসাধু চক্র সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নামে একটি নকল ওয়েবসাইট তৈরি করে ফ্যামিলি কার্ড বিষয়ে প্রতারণার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। এ বিষয়ে সকলকে সর্তকতা অবলম্বন করার জন্য অনুরোধ করা হলো।” এই ওয়েবসাইটেই ফ্যামিলি কার্ড সংক্রান্ত সরকারি ওয়েবসাইটটি লিংক করা দেখা যায়। এটির ইউআরএল https://familycard.gov.bd/।

ওয়েবসাইটটিতে এই কার্ড সংক্রান্ত বিভিন্ন তথ্য দেওয়া হলেও আবেদনের কোনো লিংকের উল্লেখ পাওয়া যায়নি। ওয়েবসাইটে দেওয়া গাইডলাইন থেকে জানা যায়, কার্ড দেওয়ার ক্ষেত্রে সরকারি প্রতিনিধিরা নির্বাচিত ওয়ার্ডে বাড়ি বাড়ি গিয়ে যোগ্য পরিবার বাছাই করবেন। এটি গত ২৬ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হয়ে ০২ মার্চ শেষ হওয়ার কথা বলা হয়েছে। এরপর ০২ থেকে ০৪ মার্চ পর্যন্ত সংগৃহীত তথ্যগুলো সমাজসেবা অফিসের মাধ্যমে অনলাইনে এন্ট্রি দেওয়া হবে। এন্ট্রিকৃত পরিবারের তথ্যসমূহ পিএমটি (PMT) স্কোরিং ইঞ্জিনে যাচাই করা হবে। এর ভিত্তিতে পরের দুই দিন সমাজসেবা অধিদপ্তরের সমাজকর্মীরা সরেজমিনে নির্বাচিত পরিবারগুলোর বাড়িতে গিয়ে তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করবেন। ০৭-০৯ মার্চ উপজেলা বা শহর বাস্তবায়ন কমিটি ভেরিফাইড তালিকাটি চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়ে ডাটাবেজ ‘লক’ করে দিবে। এরপর দ্রুততম সময়ে কিউআর কোড যুক্ত স্মার্ট ফ্যামিলি কার্ড প্রিন্টিং সম্পন্ন করা হবে এবং সুবিধাভোগীদের মোবাইলে কার্ড সংগ্রহের এসএমএস পাঠানো হবে।
এসব ধাপ পেরোনোর পরই গতকাল ঢাকায় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ‘ফ্যামিলি কার্ড’ কর্মসূচির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন। সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, আপাতত ৩৭ হাজার ৫৬৭টি নারীপ্রধান পরিবারকে ভাতা দেওয়ার জন্য নির্বাচন করা হয়েছে।
অর্থাৎ, আবেদন প্রক্রিয়ায় প্রাথমিক ধাপে কোনো ওয়েবসাইটের মাধ্যমে আবেদনের সুযোগ রাখা হয়নি। কিন্তু ফেসবুক থেকে মেটা এড লাইব্রেরি — সর্বত্র আবেদনের ভুয়া ওয়েবসাইটের লিংকের ছড়াছড়ি।
শুধু ভুয়া ওয়েবসাইটই নয়, এআই এর মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান (১, ২, ৩), তার কন্যা জাইমা রহমানের নামে ভুয়া ভিডিও বানিয়েও ক্রমাগত কিছু ফেসবুক পেজে ফ্যামিলি কার্ড পেতে লাইক শেয়ারের আহ্বান জানানো হচ্ছে৷ এসব ভিডিওর কমেন্টে অসংখ্য মানুষকে তাদের বিকাশ/নগদ নাম্বার দিতে দেখা গেছে, যা ব্যক্তিগত নিরাপত্তার জন্য চরম ঝুঁকি তৈরি করছে।


