ভুয়া পেজ-অ্যাকাউন্টের বরাতে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন: ফজলুর রহমানের নামে বানোয়াট মন্তব্যে সয়লাব ইন্টারনেট

গত ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হয় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে সরকার গঠন করে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটির কিশোরগঞ্জ-৪ (ইটনা-মিঠামইন-অষ্টগ্রাম) আসনের প্রার্থী বীর মুক্তিযোদ্ধা এডভোকেট মোঃ ফজলুর রহমান প্রায় ৭৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে জামায়াতের প্রার্থী মোঃ রোকন রেজা শেখকে পরাজিত করে জয় লাভ করেন।
নির্বাচনে জয়লাভের পর ফজলুর রহমান ‘আমার এই বিজয় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এবং প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানসহ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি উৎসর্গ করতে চাই’ শীর্ষক মন্তব্য করেছেন দাবিতে ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম চ্যানেল ২৪-এর ফেসবুক পেজে প্রচারিত একটি পোস্ট রিউমর স্ক্যানারের নজরে আসে। তবে পোস্টটিতে তিনি এমন মন্তব্য কোথায় করেছেন সেবিষয়ক কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। অনুসন্ধানেও কোনো মাধ্যমেই ফজলুর রহমানকে কোনো ভিডিওবার্তায় এমন কথা বলতে দেখা যায়নি।
পরবর্তীতে দাবিটির বিষয়ে অধিকতর অনুসন্ধানে এডভোকেট ফজলুর রহমান নামের একটি ফেসবুক পেজে (বর্তমানে পেজটি সক্রিয় নয়) গত ১১ ফেব্রুয়ারি রাতে করা এমন একটি পোস্টের সন্ধান পাওয়া যায়। পোস্টটিতে সেসময় প্রায় ১ লাখ ৫৬ হাজার প্রতিক্রিয়া জানানো হয় এবং প্রায় ৩১ হাজার বার পোস্টটি শেয়ার হয়। অর্থাৎ, উক্ত ফেসবুক পেজের ভাইরাল এই পোস্টটির বরাতেই চ্যানেল ২৪ সেসময় আলোচিত ফটোকার্ড প্রকাশ করে।

বিএনপির এই নেতা ২৪-এর জুলাই পরবর্তী সময়ে মুক্তিযুদ্ধ ও শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে নানা সময় বিভিন্ন মন্তব্য করে প্রায়ই আলোচনা-সমালোচনার শিকার হয়েছেন। জুলাই গণ-অভ্যুত্থান নিয়ে ‘কুরুচিপূর্ণ ও বিভ্রান্তিকর বক্তব্য’ দেওয়ার অভিযোগে তাকে গ্রেপ্তারের দাবিতে বিক্ষোভও করা হয়। শোকজের পাশাপাশি তার দলীয় পদও স্থগিত করা হয়। পদ স্থগিতের মধ্যেই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে কিশোরগঞ্জ-৪ তাকে দলীয় মনোনয়ন দেয় বিএনপি। নির্বাচনী প্রচারণায়ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে সরব ছিলেন এই বিএনপি নেতা।
জয়ের পর তিনি শেখ মুজিবুর রহমানকে নিয়ে নিজের ফেসবুকে আরেকটি পোস্ট করেছেন দাবিতে চ্যানেল ২৪-এ একটি প্রতিবেদনও প্রকাশ করতে দেখা যায়। প্রতিবেদনটিতে দাবি করা হয়, তিনি জয়ের পর লেখেন, ‘স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযোদ্ধা, বঙ্গবন্ধু। স্বাধীন বাংলার অস্তিত্ব।’
এছাড়াও প্রতিবেদনটিতে ফজলুর রহমানের ফেসবুকে আরও একটি পোস্টের কথা উল্লেখ করা হয়। সেটিতে তিনি “সমস্ত রাজাকার ও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির বিরুদ্ধে নির্বাচনি বিজয় নিশ্চিত করে প্রথম প্রহরের ফজরের নামাজের পর মহান আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া জ্ঞাপন করেছি। এ বিজয় ব্যক্তির নয়- এটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও স্বাধীনতার পক্ষে জনতার স্পষ্ট রায়। দেশ-বিদেশের অসংখ্য শুভাকাঙ্ক্ষী খোঁজ নিয়েছেন; টানা চাপ ও দায়িত্বে নিমগ্ন থাকায় সবার সঙ্গে যথাযথ যোগাযোগ সম্ভব হয়নি। বহু অনুরোধে বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেল, পত্রিকা, ইউটিউব প্ল্যাটফর্ম ও সামাজিক মাধ্যমে বার্তা দিয়েছি। তবু আপনাদের অব্যাহত আহ্বানের প্রেক্ষিতে সবার জ্ঞাতার্থে এই বার্তা প্রদান করছি। ইনশাআল্লাহ, সংসদে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে এক অটল প্রদীপ জ্বলবে- আপনাদের মর্যাদা, আস্থা ও ত্যাগকে কখনোই ক্ষুণ্ণ হতে দেব না।” কথাগুলো লিখেছেন বলে দাবি করা হয়।
তবে অনুসন্ধানে দেখা যায়, আগের ঘটনার মতো এবারও চ্যানেল ২৪ ফজলুর রহমানের নামে পরিচালিত আরেকটি অ্যাকাউন্ট থেকে করা পোস্টের ভিত্তিতে প্রতিবেদন প্রকাশ করে। অর্থাৎ, একই গণমাধ্যম একই দিনে ফজলুর রহমানের নামে পরিচালিত পৃথক দুটি পেজ-অ্যাকাউন্টকে তার আসল পেজ-অ্যাকাউন্ট দাবি করে সেগুলোর তথ্যের ভিত্তিতে প্রতিবেদন তৈরি করেছে।
একই ঘটনা দেখা যায় সংবাদভিত্তিক ফেসবুক পেজ কথাcom-এর ক্ষেত্রেও। পেজটিতে গত ২৩ ফেব্রুয়ারি ফজলুর রহমানের মন্তব্য দাবিতে দুটি ফটোকার্ড পোস্ট করা হয়। যার একটি দাবি করা হয় ফজলুর রহমান বলেছেন, ‘শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ড. ইউনূস যে মিথ্যা মামলা করেছে তার মধ্যে ১০০৬টি মামলা প্রত্যাহার করা হয়েছে’। অপরটিতে দাবি করা হয় তিনি ‘আওয়ামী লীগের সকল কার্যালয় খুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে সরকার’ শীর্ষক মন্তব্য করেছেন। তবে উভয় পোস্ট-ই তার নামে পরিচালিত উল্লেখিত পেজগুলোতে করা পোস্টের বরাতে করা হয়েছে।

রিউমর স্ক্যানারের অনুসন্ধানে ফজলুর রহমানের নামে পরিচালিত এমন ২৫ টি ফেসবুক পেজ ও অ্যাকাউন্টের সন্ধান পাওয়া গিয়েছে। যার অর্ধেকই খোলা হয়েছে ২০২৪ সালের জুলাই মাসের পরবর্তী সময়ে। এর আগে যে পেজ-অ্যাকাউন্টগুলো খোলা হয়েছে সেগুলোর ক্ষেত্রে দেখা যায়, এর প্রায় প্রতিটি পেজ-অ্যাকাউন্টই শুরুতে ভিন্ন নামে খোলা হয়েছিল। সাম্প্রতিক সময়ে ফজলুর রহমান তার বক্তব্যের কারণে আলোচনায় আসার পর এসব পেজ-অ্যাকাউন্টের নাম পরিবর্তন করে তার নামে করা হয়। পর্যালোচনায় দেখা যায়, এসব পেজ-অ্যাকাউন্টগুলোতে সম্মিলিতভাবে ফলোয়ার রয়েছে প্রায় ২ লাখ ৮৮ হাজার ৮২৯ জন।
এসব পেজ-অ্যাকাউন্টগুলোর বিষয়ে জানতে কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের নব-নির্বাচিত সংসদ সদস্য ফজলুর রহমানের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি রিউমর স্ক্যানারকে জানান, এই পেজ-অ্যাকাউন্টগুলো ভুয়া। তিনি বলেন, ‘আমার রাজনৈতিক জীবন ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে এসব করা হচ্ছে। আমি বহু চেষ্টা করেও এগুলো বন্ধ করতে পারছি না। ‘আমি টিভি’ নামে আমার একটি পেজ আছে, এটি ছাড়া আমার আর কোনো পেজ-অ্যাকাউন্ট নেই।’
পরবর্তীতে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে AMI TV নামের পেজটি পর্যালোচনা করেও সেখানে ভুয়া পেজগুলোর ব্যাপারে সর্তক করে ফজলুর রহমানের দেওয়া একটি ভিডিওবার্তার সন্ধান পাওয়া যায়।

ভিডিও বার্তাটিতেও তিনি একই তথ্য দেন। তবে আমি টিভির একই প্রসঙ্গে করা আরেকটি পোস্টে একজন ফলোয়ারের করা মন্তব্যের প্রেক্ষিতে পেজের এডমিনের করা কমেন্ট থেকে জানা যায়, উক্ত পেজটি ব্যতিতও ফজলুর রহমানের নামে দুটি পেজ সচল রয়েছে। সেগুলো তারা পরিচালনা করে থাকেন। এছাড়াও তিনি নিশ্চিত করেন, উল্লিখিত পেজগুলোর বিষয়ে ফজলুর রহমান অবগত আছেন।

পাশাপাশি ফজলুর রহমানের নামে পরিচালিত এসব ভুয়া পেজগুলোর বিষয়ে সচেতন করে আমি টিভি নামের পেজটি থেকে বিভিন্ন সময় পোস্ট করতে দেখা যায়।

অনুসন্ধানে আরও দেখা যায়, এই পেজগুলোতে করা পোস্টে প্রায়শই বিভ্রান্ত হচ্ছেন মানুষজন। প্রচারিত পোস্টগুলোকে ফজলুর রহমানের ব্যক্তিগত মতামত ভেবে পোস্টগুলোতে মন্তব্য করছে অনেকে; যা প্রচারিত পোস্টগুলোর মন্তব্যের ঘর পর্যালোচনা করলে সহজেই প্রতীয়মান হয়।

এছাড়া অনেককে নিজেদের প্রোফাইলেও পোস্টগুলো শেয়ার করতে দেখা যায়।

অর্থাৎ, ফজলুর রহমানের নামে প্রচারিত ভাইরাল এই মন্তব্যগুলো কোনোটিই তার অফিসিয়াল পেজ-অ্যাকাউন্ট বা নির্ভরযোগ্য সূত্রে পাওয়া যায়নি; বরং পরিকল্পিতভাবে তৈরি করা ভুয়া পেজ-অ্যাকাউন্টগুলোই এসব তথ্যের উৎস। ফলে এ ধরনের প্রচারণা শুধু একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধির ভাবমূর্তিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না, একই সঙ্গে গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতাকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে এবং জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে।

