ঘন ঘন শেভ করলে কি দাড়ি গজায়?

দাড়ি এবং মাথার চুল আমাদের শরীরকে বিভিন্ন প্রতিকূলতা থেকেই শুধু বাঁচায় না বরং সৌন্দর্য বর্ধন এবং ফ্যাশনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ এটি। একে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছে বিশাল একটি অর্থনীতি।

তাই চুল পড়া, দাড়ি গজানো নিয়ে আমরা সবসময় উদ্বিগ্ন থাকি। নানান প্রসাধনী ব্যবহার থেকে শুরু করে নানা চেষ্টা, কত সাধনাই না চালিয়ে যাই মাথার চুল, দাড়ি ভালো রাখার জন্য। এসব করতে গিয়ে প্রাচীন কাল থেকে নানান ধরনের মিথ আমাদের মধ্যে প্রচলিত হয়ে আসছে। তবে এই প্রচলিত কথা গুলো আসলেই মিথ নাকি এর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে সেই প্রশ্নটি থেকে যায় সবসময়।

দাড়ির বিষয়ে যে তথ্য জানতে চায় মানুষ

দাড়ি গজানোর বিষয়ে প্রায়ই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে অসংখ্য ব্যবহারকারীকে জিজ্ঞাসামূলক একটি পোস্ট করতে দেখা যায়। পোস্টগুলোতে সাধারণত জানতে চাওয়া হয়, “ঘন ঘন দাড়ি শেভ করলে পরবর্তীতে তা আরো পুরু আর ঘন হয়ে গজায় কিনা।”

বিগত বছরগুলোতে ছড়িয়ে পড়া এমন কিছু পোস্ট দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে। আর্কাইভ ভার্সন দেখুন এখানে, এখানে এবং এখানে

দাড়ি কামানোর ইতিহাস কত পুরানো?

ধারণা করা হয় গুহায় বাস করার সময় থেকে দাড়ি ছেটে ফেলত মানুষ। প্রাচীন গুহাচিত্রে দাড়িহীন ছবিও পাওয়া যায়। খ্রিস্টপূর্ব ৪০০-৩০০ সালের দিকে প্রাপ্ত আলেক্সান্ডার দি গ্রেট এর ভাস্কর্য থেকে তাকে ক্লিন শেভ অবস্থায় দেখা যায়।

আইরিশ প্রতিষ্ঠান Almanac থেকে জানা যায়, আধুনিককালের দাড়ি শেভিং ইতিহাসের শুরুটা ছিলো মধ্যবয়ষ্কদের ফ্যাশন উপকরণ হিসেবে। যেমন ইংল্যান্ডের রাজা সপ্তম হেনরি ছিলেন দাড়িহীন অন্যদিকে অষ্টম হেনরির দাড়ি ছিল। দাড়ি কামানোর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঘটনা ছিলো ১৮৯৫ সালে কিং জিলেটের পরিবর্তন যোগ্য রেজার ব্লেডের আবিষ্কার।

আধুনিককালে শেভিং একটি শিল্পের পর্যায়ে চলে গেছে। প্রযুক্তির ব্যবহার এবং ফ্যাশন সচেতনতার কারণে গড়ে উঠেছে সেলুন। ফ্যাশন অনুষঙ্গ হিসেবেও নানা ভাবে দাড়ি রাখার প্রচলন চলে আসছে।

শেভ করা প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকে মানব সংস্কৃতির একটি অংশ। বর্তমানে বেশিরভাগ পুরুষই ব্যক্তিগত পছন্দের উপর ভিত্তি করে শেভ করবেন কি, করবেন না তার সিদ্ধান্ত নেন। কিন্তু শেভ করার সহজতা এবং সুবিধা পুরুষকে ক্লিন-শেভ করার জন্য আকৃষ্ট করে।

মার্কিন সংবাদমাধ্যম The Economist এর ২০০৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর প্রকাশিত “The Bare truth” শিরোনামের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০০২ সালে আমেরিকার জনগন ৮ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে শেভিং এর জন্য। যার ২ বিলিয়ন ডলার ব্যয় করে পুরুষ তার দাড়ি কামানোর জন্য।

প্রতিবেদনটি থেকে আরো জানা যায়, ১৫ বছরের বেশি বয়সী ৯০ শতাংশ আমেরিকান পুরুষ সপ্তাহে পাঁচ বার শেভ করে।

পুরুষের দাড়ি কেন হয়?

মূলত অ্যান্ড্রোজেন নামক একটি যৌন হরমোনের কারণে পুরুষদের মুখে দাড়ি গজায়। নারীদের এই হরমোন না থাকায় দাড়ি গজাতে পারে না। কিছু ক্ষেত্রে অ্যান্ড্রোজেন চুলের বৃদ্ধিকে উৎসাহিত করে। অন্যদের মধ্যে, তারা এটি হ্রাস করে এবং কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, একই যৌন হরমোনগুলো কয়েক দশক পর দাড়ি গজাতে সাহায্য করে।

নারী কিংবা পুরুষ প্রত্যেকের মুখেই চুল আছে। কিন্তু জৈবিক ভাবে পুরুষদের মুখের ফলিকলগুলো সাধারণত ঘন, গাঢ় লোম তৈরি করে যা নিয়মিতভাবে ছাঁটা না হলে অনেক বড় হয়ে বিড়ম্বনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

অষ্ট্রেলিয়ার সংবাদমাধ্যম Sbs এর প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, পুরুষের দাড়ি বাড়ার কারণ তাদের চোয়ালের লোমকূপগুলো টেস্টোস্টেরন থেকে উৎপন্ন হরমোন ডাইহাইড্রোটেস্টোস্টেরন (DHT) দ্বারা উদ্দীপিত হয়। এই হরমোনের পার্থক্যের কারণে, পুরুষের দাড়ি হয়। এটি লিঙ্গের পার্থক্য ও সৃষ্টি করে। তবে হরমোনটি প্রজননে সরাসরি অবদান রাখে না।

নারীদের কি দাড়ি হতে পারে?

পুরুষের ক্ষেত্রে দাড়ি যেখানে আধিপত্য এবং আভিজাত্যের প্রতীক সেখানে নারীদের জন্য সেটা লজ্জাকর, অনেকটা অভিশাপের মতো। প্রকৃতিগতভাবেই নারীদের পুরুষের মত দাড়ি হয় না।

মহিলাদের মুখে পুরুষের মতো একই সংখ্যক ফলিকল কোষ থাকে, তবে এগুলো DHT-এর প্রতি কম সংবেদনশীল এবং মহিলাদেরও শুরুতে টেস্টোস্টেরনের মাত্রা কম থাকে। তবে হিরসুটিজমে আক্রান্ত নারীদের মুখে দাড়ি দেখা যায়। হিরসুটিজম হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে “অতিরিক্ত” চুল এবং নারীর শরীরে পুরুষের প্যাটার্ন দেখা যায়।

প্রাকৃতিকভাবে দাড়ি গজানোর উপায়

দাড়ির বৃদ্ধি প্রায় সম্পূর্ণটাই জিনগত প্রভাবের কারণে হলেও প্রকৃতিগত ভাবেও দাড়ি গজানোর প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করা যায়।

খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে: চিকিৎসা বিষয়ক ওয়েবসাইট Medical News Today এর বরাতে ২০১৫ সালে সম্পাদিত একটি গবেষণা থেকে জানা যায়, কিছু ভিটামিন আছে যা মৃত ফলিকলকে পুনরায় সচল করে দাড়ি গজতে সাহায্য করে। মাছ, ডিম, দুধ এ ধরনের ভিটামিন-ডি যুক্ত খাবার খাওয়ার মাধ্যমে ফলিকলকে পুনরায় কার্যক্ষম করা যায়। এছাড়া, ভিটামিন-বি সমৃদ্ধ খাবার যেমনঃ বাদাম, রুটি, মাংস-মাছের বি১২, আয়রন সমৃদ্ধ খাবার, ফল, শাক-সবজি দাড়ি গজাতে সাহায্য করে।

পর্যাপ্ত ঘুম: National Library of Medicine এ ২০১৫ সালের ২৭ মে প্রকাশিত Effect of 1 Week of Sleep Restriction on Testosterone Levels in Young Healthy MenFREE শিরোনামের গবেষণা থেকে জানা যায় যে, পর্যাপ্ত ঘুমের সাথে দেহের টেস্টোস্টরেনের উৎপাদনের সাথে সম্পর্কযুক্ত। তাই দাড়ি গজানোর জন্য পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমাতে প্রয়োজন।

ত্বক পরিষ্কার রাখা: পরিষ্কার ত্বক দাড়ি গজাতে সাহায্য করে। তাই ত্বক পরিষ্কার এবং মশ্চারাইজড রাখতে হবে।

ধূমপান ত্যাগ: তামাকের ধোঁয়া রক্তনালীর প্রদাহ এবং ফলকলকে পুষ্টি সরবরাহকারী DNA এর ক্ষতি করে। তাই দাড়ি বৃদ্ধি করতে চাইলে ধূমপান পরিত্যাগ করতে হবে।

ঘন ঘন শেভ করলে কি দাড়ি গজায়?


১৯২৮ সালে মার্কিন ফরেনসিক নৃবিজ্ঞানী মিলড্রেড ট্রটার (Mildred Trotter) HAIR GROWTH AND SHAVING শিরোনামে একটি গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করেন। গবেষনার ফলাফল থেকে জানা যায়- চুলের বৃদ্ধির সাথে দিনের তাপমাত্রার তারতাম্যের কোন সম্পর্ক নেই। চুলের বৃদ্ধির পরিমান সময়ের সাথে সাথে বাড়ে। তবে, সময় বাড়ার সাথে সাথে প্রতি ইউনিট চুলের গড় বৃদ্ধি হ্রাস পায়। শেভ করার ফলে দাড়ির বৃদ্ধি প্রভাবিত হয় এমন কোন প্রমাণ গবেষণাটি থেকে পাওয়া যায় নি।

অন্যদিকে, ঘন ঘন শেভ করলে দাড়ি গজায় কিনা এ সম্পর্কে স্বাস্থ্য বিষয়ক ওয়েবসাইট healthline এর প্রকাশিত 5 Reasons Why You Can’t Grow a Beard শিরোনামের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, শেভিং ত্বকের কোন পরিবর্তন আনে না। এমনকি দাড়ি গজানোর সাথে ঘন ঘন শেভিং এর কোন সম্পর্কই নেই।

স্কিনকেয়ার পণ্য বিক্রয়কারী মার্কিন প্রতিষ্ঠান Stryx এর DOES SHAVING MAKE YOUR HAIR THICKER? MYTHS OR FACTS শিরোনামের প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, শেভ করার ফলে চুল দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এটি একটি পৌরাণিক কাহিনী। এর কোন সত্যতা নেই। প্রত্যেকেরই শারীরিক চুল বৃদ্ধির নিজস্ব হার রয়েছে এবং এটি আসলেই পরিবর্তন হয় না।

মার্কিন অলাভজনক একাডেমিক চিকিৎসক কেন্দ্র Mayoclinic এর ওয়েবসাইটের এক প্রতিবেদনে ঘন ঘন শেভিং এর ফলে দাড়ি গজানোর সম্পর্কে চর্মবিদ্যার অধ্যাপক ড. লরেন্স জিবসন বলেন, শেভিং চুলের ঘনত্ব বৃদ্ধি, রং পরিবর্তন কিংবা বৃদ্ধিতে কোন প্রভাব ফেলে না। শেভিং এর পর প্রথম দিকে কিছু কারণে দাড়ি ঘন বলে মনে হলেও কিছুদিন পর দেখা যায় তেমন পরিবর্তন হয় নি।

দাড়ি ঘন হয় কীভাবে?

দাড়ি পরিষ্কার এবং ময়েশ্চারাইজড রাখলে তা ঘন দেখাতে সাহায্য করতে পারে। যাইহোক, বৈজ্ঞানিক সমর্থন সহ এমন কোন নির্দিষ্ট রুটিন নেই যা ক্রমবর্ধমান দাড়িকে ঘন করতে পারে। Medical news today এর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, জলপাই তেল এবং অ্যাভোকাডো তেল দাড়ি ঘন করতে পারে। এটা সম্ভব যে এগুলি দাড়িকে পুষ্ট এবং ময়শ্চারাইজড রাখার মাধ্যমে লিভ-ইন কন্ডিশনারগুলির মতো কাজ করতে পারে।

স্বাস্থ্যকর দাড়ি গজাতে American Academy of Dermatology Association ছয়টি টিপস দিয়েছেনিয়মিত মুখ ধুতে হবে। হাত থেকে ময়লা বা জীবাণু ছড়ানো ঠেকাতে মুখ স্পর্শ করা যাবে না। শেভ করার পূর্বে শেভিং তেল, জেল বা ক্রিম ব্যবহার করা যেতে পারে। শেভের পর ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা উচিত। অতিবেগুনী রশ্মি থেকে বাঁচতে সানস্ক্রিন ব্যবহার করা যেতে পারে। দাড়িতে চিরুনী ব্যবহারের মাধ্যমে জট লাগা বন্ধ করা যেতে পারে।

অর্থাৎ, বহু বছর ধরেই শেভ করার সাথে দাড়ি গজানো কিংবা দাড়ি ঘন হওয়া বিষয়ে মিথের প্রচলন হয়ে আসছে। কিন্তু এ দাবির পক্ষে কোনো বৈজ্ঞানিক ভিত্তি পাওয়া যায় না। এ সম্পর্কিত গবেষণা ও বিশেষজ্ঞদের মতে, শেভিং চুলের ঘনত্ব বৃদ্ধি, রং পরিবর্তন কিংবা বৃদ্ধিতে কোন প্রভাব ফেলে না। শেভিংয়ের পর প্রথম দিকে কিছু কারণে দাড়ি ঘন বলে মনে হলেও কিছুদিন পর দেখা যায় তেমন পরিবর্তন হয়নি।

সুতরাং, বার বার শেভ করার সাথে দাড়ি গজানোর কোন সম্পর্ক নেই।

তথ্যসূত্র

Share: