গাজীপুরে মেলায় কট্টর ইসলামপন্থী ও জামাত-শিবিরের হামলার দাবিটি মিথ্যা

সম্প্রতি, ইসলাম ধর্মে গান-বাজনা নিষিদ্ধ বলে গাজীপুরে আয়োজিত একটি মেলায় কট্টর ইসলামপন্থীরা গানের মঞ্চ ভেঙে দিয়েছে দাবিতে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম এক্স (সাবেক টুইটার)-এ একটি ভিডিও প্রচার করা হয়েছে।

এক্সে প্রচারিত এমন ভিডিও দেখুন এখানে (আর্কাইভ)। একই দাবি দেখুন ইনস্টাগ্রামে

আলোচিত দাবিতে ভিডিওটি প্রচারকারী এক্স অ্যাকাউন্ট ‘বাংলাদেশি হিন্দুস কমিউনিটি’ থেকে একই ঘটনার ভিন্ন আরেকটি ভিডিও প্রচার করা হয়। প্রচারিত ভিডিওটিতে দাবি করা হয়, ঢাকার গাজীপুরে আয়োজিত এক বাণিজ্য মেলায় কট্টরপন্থী মুসলিমরা হামলা চালিয়ে সবকিছু লুট করে নিয়ে যায়। এমন দাবিতে প্রচারিত ভিডিওটি দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।

একই ভিডিওটি ফেসুবকে প্রচার করে দাবি করা হচ্ছে, মেলা থেকে চাঁদা না পাওয়ায় জামাত-বিএনপির সন্ত্রাসীরা মেলায় হামলা চালিয়েছে। উক্ত দাবিতে ফেসবুকে প্রচারিত পোস্ট দেখুন এখানে (আর্কাইভ)।

ফ্যাক্টচেক

রিউমর স্ক্যানার টিমের অনুসন্ধানে দেখা যায়, কট্টর ইসলামপন্থী কিংবা চাঁদাবাজির জন্যে বিএনপি-জামাতের নেতাকর্মীদের গাজীপুরের বাণিজ্য ও কুটিরশিল্প মেলায় হামলা করার দাবিটি সঠিক নয়। প্রকৃতপক্ষে, চা-সিগারেটের দাম দিয়ে বাকবিতন্ডার জেরে হওয়া ক্রেতাকে মারধরের ঘটনায় উক্ত মেলায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। উক্ত হামলার সাথে উল্লিখিত রাজনৈতিক দলগুলোর সংশ্লিষ্টতার তথ্য পাওয়া যায়নি।

আলোচিত দাবিটির বিষয়ে অনুসন্ধানের শুরুতে প্রচারিত ভিডিওগুলো পর্যালোচনা করে দেখে রিউমর স্ক্যানার। প্রচারিত ভিডিওগুলোর একটিতে ইলেকট্রনিক গণমাধ্যম মাছরাঙা টেলিভিশন এবং অপরটিতে দৈনিক জনকণ্ঠের লোগো দেখতে পাওয়া যায়। ‍

মাছরাঙা টেলিভিশনের ভিডিওটির বিষয়ে অনুসন্ধানে উক্ত গণমাধ্যমের ফেসবুক পেজে প্রচারিত মূল ভিডিওটি খুঁজে পাওয়া যায়।

প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, মেলার একটি দোকানে চায়ের দাম বেশি নেওয়াকে কেন্দ্র করে বাক-বিতণ্ডার এক পর্যায়ে দোকানদাররা ডুয়েটের কয়েকজন শিক্ষার্থীকে মারধর করে। পরবর্তীতে ডুয়েট শিক্ষার্থীদের একটি দল ও এলাকাবাসী মিলে মেলায় হামলা ও ভাঙচুর চালায়। এসময় মেলায় অংশ নেওয়া শিল্পীদের মই দিয়ে দেওয়াল টপকিয়ে পালাতে দেখা যায় বলেও প্রতিবেদনটি থেকে জানা যায়। তবে, প্রতিবেদনটির কোথাও উক্ত হামলার সাথে কট্টর ইসলামপন্থী কিংবা বিএনপি-জামাতের নেতাকর্মীদের সংশ্লিষ্টতার কথা বলা হয়নি।

পরবর্তীতে দৈনিক জনকণ্ঠের লোগো সংবলিত একই ঘটনার ভিডিওটির বিষয়ে অনুসন্ধানে গণমাধ্যমটির ফেসবুক পেজে গত ২৩ নভেম্বর প্রচারিত মূল ভিডিওটি খুঁজে পাওয়া যায়।

এঘটনায় একাধিক গণমাধ্যমে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। গণমাধ্যমে প্রকাশিত এমন কিছু প্রতিবেদন দেখনে এখানে, এখানে এবং এখানে। প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে প্রত্যক্ষদর্শীর বরাতে বলা হয়, মেলার ভেতরের দোকানে সিগারেটের নির্ধারিত বিক্রয়মূল্যের চেয়ে দাম বেশি নেওয়ায় এক ক্রেতা তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। এসময় দোকানদার ও মেলা কর্তৃপক্ষের লোকজন তার সাথে বাগ্‌বিতণ্ডার একপর্যায়ে ওই ক্রেতাকে মারধর করেন। এ খবর মেলার বাইরে স্থানীয়দের মাঝে ছড়িয়ে পড়লে এলাকাবাসী সংঘবদ্ধ হয়ে মেলায় হামলা করেন।

এছাড়াও প্রতিবেদনগুলোতে উল্লেখ করা হয়, মেলার লটারি–বাণিজ্য নিয়ে শুরু থেকেই স্থানীয়দের আপত্তি ছিল। কিন্তু তা আপত্তি উপেক্ষা করেই দীর্ঘদিন ধরে মেলা চলছিল। এতে স্থানীয়দের মাঝে ক্ষোভ বাড়তে থাকতে। যার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে উক্ত হামলার ঘটনা ঘটে। তবে প্রতিবেদনগুলোতে উক্ত হামলার সাথে কট্টর ইসলামপন্থীদের সংগীত বিরোধীতা কিংবা বিএনপি-জামাতের চাঁদাবাজির সংশ্লিষ্টার কথা উল্লেখ করা হয়নি। পাশাপাশি কোনো নির্ভরযোগ্য সূত্রে এমন কোনো তথ্যও পাওয়া যায়নি।

সুতরাং, চা-সিগারেটের দাম নিয়ে বাকবিতণ্ডার জেরে হওয়া হামলার ঘটনাকে গাজীপুরের মেলায় কট্টর ইসলামপন্থী ও বিএনপি-জামাতের হামলার দাবিতে প্রচার করা হয়েছে; যা সম্পূর্ণ মিথ্যা।

তথ্যসূত্র

Share: